- ঘাটতি ছাড়া দাম বাড়ায় বিনাশুল্কে আমদানি
- চাহিদা ৩ কোটি ৫৩ লাখ টন
- উৎপাদন ৩ কোটি ৭৮ লাখ টন
দেশে ধানের উৎপাদন বেড়েছে। সেসব ধানের চালেই চাহিদা মেটানো সম্ভব বলে চাল আমদানি বন্ধ করে কৃষকদের ন্যায্যমূল্য দিতে চেয়েছিল সরকার। এর কারণে ২০২১ সালের আগস্ট থেকে চাল আমদানি বন্ধ করে দেয়া হয়। সিলেটে দুই দফা বন্যার কারণে সেদিক থেকে সরে এসেছে সরকার। খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আবার চাল আমদানির অনুমতি দেয়া হয়েছে। তবে জুড়ে দেয়া হয়েছে কিছু শর্তও।
প্রতিবছর দেশে রেকর্ড পরিমাণ ধান উৎপাদন হলেও সরকারকে খাদ্যসামগ্রী বা চাল কিনতেই হয়।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্যমতে, দেশে বছরে চালের চাহিদা দুই কোটি ৮০ লাখ টনের বেশি। এর সঙ্গে ১২ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থীকে যুক্ত করে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) হিসেব অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে চালের চাহিদা ৩ কোটি ৫৩ লাখ টনের কাছাকাছি। চাহিদার বিপরীতে উৎপাদনের দিকে তাকালে দেখা যায়, গত ২০২০-২১ অর্থবছরে চাল উৎপাদন হয়েছে ৩ কোটি ৭৮ লাখ টন। যেখানে ৩৪ লাখ টন চাল উদ্বৃত্ত। তা ছাড়া ২০১৯ সালে দেশে চাল উৎপাদন হয় ৩ কোটি ৬৫ লাখ টন। ২০২০ সালে ৩ কোটি ৭৪ লাখ টন।
খাদ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ঘাটতি থেকেই দেশে বছরে চাল আমদানির পরিমাণ ৩৯ লাখ টনের কাছাকাছি। সেখানে প্রায় ৭০ লাখ টন চালেল গন্তব্য জানা যায় না।
তবে বৈরী আবহাওয়া ও প্রাকৃতিক দুর্যোগে মাঝে মধ্যে দেশে চাল আমদানির প্রয়োজন হয়। কিন্তু কিছু আমদানিকারকেরা সারা বছর ধরে চাল আমদানি করে। এতে ভরা মৌসুমে চাল আমদানির কারণে চাষিরা ন্যায্যমূল্য না পেয়ে আর্থিক ক্ষতির শিকার হয়। এতে সরকার চাষিদের বাঁচাতে চাহিদা মতো চাল আমদানিতে আমদানিকারকদের তালিকা ও চাল আমদানির পরিমাণ নির্ধারণের সিদ্ধান্ত নেন।
এদিকে ৩০ জুন খাদ্য মন্ত্রণালয়ের বৈদেশিক সংগ্রহ শাখার সিনিয়র সহকারী সচিব মোহাম্মদ মাহাবুবুর রহমান ও অতিরিক্ত সচিব মুজিবর রহমান স্বাক্ষরিত চিঠিতে চাল আমদানির অনুমতি দেওয়া হয়। তাতে প্রথম দফায় ভারত থেকে বেসরকারিভাবে ৪ লাখ ৯ হাজার টন চাল আমদানি করতে ৯৫ প্রতিষ্ঠানকে অনুমতি দেয় খাদ্য মন্ত্রণালয়। আগামী ৩০ জুনের মধ্যে প্রতিষ্ঠানগুলোকে চাল আমদানির অনুমতি দিতে অনুরোধ জানিয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে চিঠি দিয়েছে খাদ্য মন্ত্রণালয়।
চিঠির শর্ত অনুযায়ী, ২১ জুলাইয়ের মধ্যে চালের এলসি (ঋণপত্র) খুলতে হবে এবং ১১ আগস্টের মধ্যে আমদানিকৃত চাল দেশে বাজারজাত শেষ করতে হবে। আমদানিকৃত চালের মধ্যে ৩ লাখ ৭৯ হাজার টন সিদ্ধ চাল ও ৩০ হাজার টন আতপ। সময়মতো এলসি খুলতে বা আমদানি করতে ব্যর্থ হলে সেসব ব্যবসায়ীদের চাল আমদানির অনুমতি বাতিল হবে।
বর্তমানে দেশে উৎপাদিত চালের ন্যায্য বাজারমূল্য নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ সরকারের নিষেধাজ্ঞায় ২০২১ সালের ৩১ আগস্ট থেকে ভারতীয় চাল আমদানি বন্ধ রয়েছে। বর্তমানে দেশের বিভিন্ন জায়গায় বন্যায় মাঠের ফসল ও গোলার শস্যের ব্যাপক ক্ষতিতে চালের বাজারে ঊর্ধ্বগতি রুখতে সরকার চাল আমদানির অনুমতি দেয়া হয়।
সরকারি হিসাবে দেশে চালের সরবরাহ ও মজুতের মধ্যে কোনো ঘাটতি নেই। তারপরও চালের দাম বেড়ে চলেছে। সরকারি সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ-টিসিবির হিসাবে গত এক বছরে সরু চালের দাম বেড়েছে ১৯ শতাংশ এবং মোটা চালের দাম বেড়েছে প্রায় ৯ শতাংশ। এর মধ্যে সরু চালের দাম এক মাসেই বেড়েছে ৯ শতাংশ। টিসিবির হিসাবে এক বছর আগে এই সময়ে দেশে সরু চাল বিক্রি হতো কেজিপ্রতি ৫৬ থেকে ৬৫ টাকায়। এখন তা ৬৪ থেকে ৮০ টাকা। এক বছর আগে মাঝারি চালের দাম ছিল ৫০ থেকে ৫৬ টাকা কেজি, যেটি এখন হয়েছে ৫২ থেকে ৬০ টাকা। এক বছর আগে মোটা চালের দাম ছিল কেজিপ্রতি ৪ থেকে ৪৮ টাকা, এখন তা বেড়ে হয়েছে ৪৮ থেকে ৫২ টাকা।
চালের দাম এভাবে বেড়ে যাওয়ার বিষয়টি সরকারও অস্বাভাবিক হিসেবেই দেখছে। সম্প্রতি বিভিন্ন চালকল ও বাজারে সরকার অভিযানও চালাচ্ছে। বৈধ মাত্রার চেয়ে বেশি মজুত করায় মামলাও হয়েছে স্কয়ার গ্রুপের বিরুদ্ধে। তবে এসব অভিযানের সুফল বাজারে কমই মিলছে। তবে নিয়ন্ত্রণমূক শুল্ক, অগ্রিম আয়কর, অ্যাডভান্সড ট্রেড ভ্যাট বা এটিভি এখনও কিছু বহাল আছে, যদিও এর হার কমানো হয়েছে অনেকটাই।
এতদিন চাল আমদানিতে ২৫ শতাংশ শুল্ক দিতে হতো সরকারকে। অর্থাৎ আমদানিতে ১০০ টাকা খরচ হলে সরকারকে দিতে হতো ২৫ টাকা। এই খাতে এখন কোনো টাকা দিতে হবে না। যদিও নিয়ন্ত্রণমূলক যে ২৫ শতাংশ শুল্ক ছিল, সেটি পুরোপুরি প্রত্যাহার হয়নি, তবে কমানো হয়েছে অনেকটাই। এতদিন এই শুল্ক ছিল ২৫ শতাংশ, সেটি কমিয়ে করা হয়েছে ১০ শতাংশ। এর বাইরে অগ্রিম আয়কর, এটিভি মিলিয়ে শুল্ক দিতে হবে ২৫ শতাংশ। এতদিন আমদানি শুল্কের সঙ্গে এগুলো মিলিয়ে শুল্ক ছিল ৬২ শতাংশ। অর্থাৎ ১০০ টাকার পণ্য আনতে সরকারকে দিতে হতো ৬২ টাকা। এখন কম দিতে হবে ৩৭ টাকা। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ব্যাংকে এলসি খুলতে ব্যর্থ হলে বরাদ্দ বাতিল হয়ে যাবে বলেও শর্ত দেয়া হয়েছে।
আনন্দবাজার/শহক








