- পাহাড়ে ভারী বৃষ্টিপাতে তিস্তায় বন্যা
- পানিতে ডুবেছে চরাঞ্চলের ফসল
- খুলে দেয়া হয়েছে ব্যারাজের ১১ গেট
পেঁয়াজক্ষেত নষ্ট হওয়ায় মহাবিপাকে শতশত কৃষক পরিবার। তিস্তার চরে যে দিকে চোখ যায় শুধু ভেজা পেঁয়াজ শুকনোর দৃশ্য
উজানের ঢলে তিস্তা নদীর চরের ফসল ডুবে গেছে। আর তিস্তার সেচ কমান্ড এলাকার বোরো ধান দুলছে। উজানের দেশের পাহাড়ে ভারী বৃষ্টিপাতের কারণে চৈত্র মাসে তিস্তায় বান দেখা দিয়েছে। গত পাঁচদিন থেকে অসময়ে উজানে ভারী বৃষ্টিপাতে হু হু করে পানি বাড়ায় কয়েক হাজার বিঘা জমির মরিচ, পেঁয়াজ, রসুন, ভুট্টা, গম ও মিষ্টিকুমড়ার ক্ষেত তলিয়ে গেছে। চোখেমুখে অন্ধকার দেখছে নীলফামারী ও লালমনিরহাটের তিস্তাচরের হাজারো কৃষক।
কৃষকরা বলছেন, প্রতিবছর শীতকালে পানি কমে যাওয়ার পর তারা তিস্তার বালুচরে ফসল চাষ করেন। চলতি সময়ে তিস্তার বুকে যে চাষাবাদ হয় তা দিয়ে চরবাসীর চলে ১২ মাস। হঠাৎ তিস্তার পানি বাড়ায় কৃষকদের ফসলের ক্ষতি হয়েছে। অপরদিকে, তিস্তার পানিতে পরিপূর্ণ দেশের সর্ববৃহৎ তিস্তা সেচ প্রকল্পের কমান্ড এলাকার বোরোচাষীরা। তিস্তার চরের কৃষকরা ফসলহানির ক্ষতিপূরণ দাবি করেছে।
বিগত ৩৫ বছরে ঠিক এই সময় এমন পানি তিস্তায় দেখেননি চরবাসীরা। বর্তমানে ২৫ থেকে ৩০ হাজার কিউসেক পানি প্রবাহ চলছে। অথচ প্রতিবছর মার্চ ও এপ্রিল মাসজুড়ে তিস্তার নদী হয়ে যায় ধু ধু বালুচর। প্রখর রোদে বালুময় তিস্তা হেঁটে পার হন চরাঞ্চলবাসী। এবার হঠাৎ সেই চিত্র পাল্টে গেছে। বিকেল ৩টায় তিস্তা ব্যারাজ পয়েন্টে পানি ছিল ৫১ দশমিক ৭৫ মিটার। এই পয়েন্টে বিপদসীমা ৫২.৬০ মিটার। চলমান প্রবাহে তিস্তার চরের ফসলী জমিগুলো এখন পানির নিচে।
তিস্তা ব্যারাজ কর্তৃপক্ষ সূত্রে জানা গেছে, ব্যারাজের ১১টি গেট খুলে দেয়া হয়েছে। মার্চের শেষ সপ্তাহে তিস্তা ব্যারাজ পয়েন্টে মাত্র তিন হাজার কিউসেক পানি ছিল। এক সপ্তাহের ব্যবধানে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৫ থেকে ৩০ হাজার কিউসেকে।
নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার চরখড়িবাড়ি, বাঘের চর, টেপুর চর এলাকার গফুর মিয়া, মফিজ উদ্দিনসহ আনোয়ার হোসেন বলেন, প্রতিবছর শুকিয়ে যাওয়া তিস্তা নদীতে ভুট্টা, পিঁয়াজ, রসুন, আলু ও পাটচাষ করি। এবারও করছি। কিন্তু হঠাৎ নদীর পানি বাড়ায় সব ডুবে গেছে।
কিছামত ছাতনাই গ্রামের কৃষক আছির উদ্দিন বলেন, ৫ দিন ধরে উজানের পানি প্রবেশ করায় এলাকায় অনেক কৃষকের বোরো ধান, পেঁয়াজ, গমক্ষেত পানিতে তলিয়ে গেছে। চরে আমার দুই বিঘা পেঁয়াজক্ষেত নষ্ট হয়েছে। বিগত ৩৫ বছরেও এই সময়ে তিস্তায় এত পানি দেখিনি। তিস্তার চরে ২৫ বিঘা জমিতে গম চাষ করেছিলেন দোয়ানী গ্রামের কৃষক হবিবর রহমান। এর মধ্যে ১৮ বিঘা জমির গম ঘরে তুললেও। বাকিগুলো নদীতে ভেসে গেছে। এ ছাড়া ১৫ বিঘা পেঁয়াজের মধ্যে ১০ বিঘা ও ১০ বিঘা বোরো ধান নদীতে তলিয়ে গেছে।
বাইশপুকুর চরের পেঁয়াজ চাষি দেলোয়ার হোসেন বলেন, জীবনেও দেখিনি চৈত্র-বৈশাখ মাসে তিস্তার পানি বাড়ে। পানি বাড়ার কারণে আমার ছয় বিঘা পেঁয়াজখেত ডুবে নষ্ট হয়েছে। এতে আমার ৩০ হাজার টাকা লোকসান হয়েছে। এমন অনেক কৃষক জানান, লালমনিরহাট ও রংপুরের গঙ্গাচরা উপজেলার তিস্তা চরের কৃষকরা একই পরিস্থিতির শিকার। তারা সকলেই ক্ষতিপূরণ দাবি করেছে কৃষিবিভাগের কাছে।
নীলফামারী কৃষি অধিদফতরের উপ-পরিচালক আবু বক্কর সিদ্দিক বলেন, তিস্তায় পানি বাড়ায় নদীর বুকে কৃষিজমির বিভিন্ন ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে জেলায় কী ধরনের ক্ষতি হয়েছে তার তালিকা করতে বলা হয়েছে ডিমলা উপজেলা কৃষি অফিসকে।
তিস্তা ব্যারাজ সেচ প্রকল্পের সম্প্রসারণ কর্মকর্তা রাফিউল বারী জানান, তিস্তার চরের কৃষকরা উজানের ঢলে ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছে। অপরদিকে, আমরা তিন জেলার ১২ উপজেলায় ৭০ হাজার ১০০ হেক্টর জমিতে রোটেশন পদ্ধতিতে সম্পূরক সেচ দিচ্ছি। ফলে সেচ প্রকল্পের কমান্ড এলাকায় প্রায় তিন লাখ ১৮ হাজার টন বোরো ধান উৎপাদনের আশা করা হচ্ছে, যা এই অঞ্চলের কৃষি অর্থনীতিতে বিশেষ ভূমিকা রাখতে পারবে।
এদিকে, রংপুর, কুড়িগ্রাম ও লালমনিরহাটের তিস্তার চরে হাজার হাজার হেক্টর জমিতে পেঁয়াজের চাষ করে কৃষক বিপাকে পড়েছে। চৈত্র মাসে অসময়ে তিস্তার উপকূলে অস্বাভাবিক পানি বৃদ্ধি পেয়ে তলিয়ে গেছে পেঁয়াজখেত। মসলাজাতীয় পেঁয়াজক্ষেত নষ্ট হয়ে যাওয়ায় মহাবিপাকে পড়েছে শতশত কৃষক পরিবার। তিস্তার চরে যে দিকে চোখ যায় শুধু ভেজা পেঁয়াজ শুকনোর দৃশ্য চোখে পড়বে।








