মধ্যবিত্ত প্রবীণ নারীর চ্যালেঞ্জ--

(পূর্ব প্রকাশের পর)
ছয় বছর বাবার চিকিৎসা ব্যয়ে ব্যাংক ব্যালেন্স শেষ হয়ে গেল। শেষ অবধি বাবা মারা গেলেন। শূন্য হাতে শুরু হয়েছিল আমাকে নিয়ে মায়ের একাকি জীবন যুদ্ধ। বাড়িটা মা বানিয়েছিলেন বাবার পাঠানো টাকায়। সেটুকুই আমাদের মাথার উপর ছাউনি। ক্ষণিক অবসরে নিরিবিলি একাকিত্বে বিছানার পাশে দেয়ালে টানানো বাবার ছবিটার দিকে তাঁকিয়ে মা ডুকরে কেঁদে ভাসায় তপ্ত অশ্রুজলে। নিয়মিত বাবার ছবিটাতে সজীব ফুলের মালা দিয়ে রাখেন। এটা তার রুটিন কাজের একটা অংশ।
পরিবারের অমতে মা-বাবা নিজেরা পছন্দ করে বিয়ে করেছিলেন। যে কারণে বিধবা দাদী ও আত্মীয় স্বজন বাড়ি থেকে কেউ তেমন সহযোগিতা বা সাহায্যের হাত বাড়ায়নি। মা নিজেও কারও কাছে সাহায্যের হাত বাড়াতে চাইতেন না। ব্যক্তিত্বসম্পন্ন মা আমার বাবার প্রতি ভালোবাসা শ্রদ্ধায় অবনত ছিলেন। আমাকে আগলে মা নতুন করে সংসার পাতার কথা ভাবেননি। কতজনকে মায়ের পেছনে ঘুরতে দেখেছি। মা এড়িয়ে চলেছেন। জটিল জীবনে কাউকে জড়াতে চাননি। প্রয়োজনে সাহসের সঙ্গে প্রত্যাখান করেছেন।
আজ আমার মাস্টার্সের রেজাল্ট হয়ে গেল। সেকেন্ড ক্লাস পেয়েছি। মা ভীষণ খুশি। উজ্জ্বল প্রশান্তি মুখে আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরে বললেন, এবার তোকে আমি বিয়ে দেব। বুকটা ধক্ করে উঠলো। আমাকে বিয়ে দিলে তুমি একা কী করে থাকবে মা? ও সব বাদ দাও। বিয়ে থা পরে হবে, আমি আগে চাকরি খুঁজবো। সব দায়িত্ব পালন করবো। এবার তোমাকে ছুটি দিতে চাই। তুমি ঘুরে বেড়াবে আনন্দ করবে। তোমার পুরোনো বন্ধুদের খুঁজে বের করবে। তুমি আবার গান গাইবে।
মা হেসে বলেন, পাগলী মেয়ে, আমার কি আর সে বয়স আছে? তোকে বিয়ে দিয়ে আমি চিন্তামুক্ত হতে চাই। আমার একা থাকার কথা ভাবছিস? এতদূর পথ হেঁটেছি তোকে নিয়ে। এখন তোর সুখী সংসার দেখতে পেলে আমি নিশ্চিন্ত হবো। এই দায়িত্ব পালন করার পর মোটামুটি আমার দায়িত্ব শেষ করতে চাই। তোর পাশে পাশে ছায়া হয়ে থাকবো চিরকাল। বিপদ আপদে আমি তো আছি।
মায়ের গলা জড়িয়ে ধরে বলি, মা, আমি তো তোমারই মেয়ে। তোমার জন্য আমার কোনো দায়িত্ব থাকবে না, এটা কী করে ভাবলে? তুমি তো আমার যুদ্ধজয়ী সফল মা। এবার যা করার আমাকে করতে দাও। তোমার আর কিছু ভাবতে হবে না। সব দায়িত্ব আমার।
মা কাছে এসে পূণ্যিকে জড়িয়ে ধরে কপালে চুমু দিয়ে বললেন, ও রে আমার লক্ষ্মী মেয়ে। এবার যা ফ্রেশ হয়ে আয়। আমি চা করছি। পূণ্যি বলে, না মা আজ আমি চা বানাবো। তুমি ফ্রেশ হয়ে সুন্দর একটা শাড়ি পরে সেজে এসো। চা খেয়ে বাইরে বেরুবো তোমাকে নিয়ে। আমার কয়েকজন বন্ধু আজ একটা পার্টির আয়োজন করেছে। সবাই একসঙ্গে ডিনার করবো। তুমি হবে আমাদের চিফ গেস্ট। বন্ধুরা বলেছে আমার যুদ্ধজয়ী মাকে নিয়ে যেতে। আমার সাহসী মাকে ওরা ভীষণ অনার করে। পূণ্যির মোবাইল বেজে উঠলো। বন্ধু সোহেল ফোন করেছে, পূণ্যি মোবাইল কানে, হ্যাঁ সোহেল তোরা এসেছিস? বস তাহলে। সিহাব ও রিপনকে ফোন দে, ওরা আসুক আমি মাকে নিয়ে আধা ঘণ্টার মধ্যে চলে আসবো।
পূণ্যি মোবাইালে কথা শেষ করে চা বানিয়ে নিয়ে এলো মায়ের ঘরে। নাও মা পাকুড়া আর চা নিয়ে এসেছি। চা শেষ করে ঝট্পট রেডি হয়ে নাও। আমিও রেডি হয়ে আসছি। জিনাত চায়ের কাপে দিয়ে চুমুক দিয়ে পূণ্যির দিকে মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে আছে। আজ খুব হালকা লাগছে মা জিনাতের মনটা। যেন মাথা থেকে বিশাল চিন্তার ভারমুক্ত হলো। ভাবছে এখন পূণ্যির বিয়েটা দিতে পারলেই একদম ফ্রি। পর মুহূর্তে মনের এক কোণে কুয়াশায় ছেয়ে গেল। মেয়েটার বিয়ে দেবো, তারপর কি নিয়ে শূন্য ঘরে একাকিত্বে কাটবে? নিষ্প্রাণ হয়ে যাবে না তো মনটা। হাহাকার ঘিরে আসে মনের চারপাশে।
মুখ-হাত ধুয়ে ফ্রেশ হয়ে, চা নিয়ে বসেছিল পূণ্যির মা জিনাত। পূণ্যির তাগিদে সুন্দর একটা শাড়ি চটজলদি পরে নিয়ে বেরিয়ে এলো। পূণ্যি দেখেই বললো, ওয়াও! মা তোমাকে আজ দারুণ লাগছে! এত সিম্পল সাজ গোজেও আমার মা অপরূপা।
একটা ট্যাক্সি ডেকে মা মেয়ে দুজনে চলে গেল যমুনা ফিউচার পার্কের ফুড কোর্টে। বন্ধুরা অপেক্ষা করছিল। মায়ের কাছে এসে সব বন্ধুই সম্মান জানালো। নির্দিষ্ট টেবিলে মাকে নিয়ে সবাই বসলো। পরিচয় পর্ব শেষ করে মেনু দেখে আগে চিকেন স্যুপ আর পরে পছন্দমতো ডিনার অর্ডার করলো পূণ্যি।
আজকের ডিনার পার্টির হোস্ট সিহাব। ডিনার টেবিলে সবাই বেশ প্রাণবন্ত ছিল। জিনাত সবাইকে স্নেহ-মমতায় আপন করে নিয়েছিল বলে খোলামেলা অনেক কথা হলো। সামাজিক-রাজনৈতিক নানা প্রসঙ্গে অনেক সময় পেরিয়ে গেল। সিহাব, সোহেল, রিপনকে বললো, তোদের বাসা তো বেশ দূরে। তোরা আগেই চলে যা। আমি পূণ্যি আর খালাম্মাকে ট্যাক্সি করে দিয়ে চলে যাবো।
বাসায় ফিরে পূণ্যি মাকে জিজ্ঞেস করলো, মা তোমার কেমন লাগলো আজকের দিনটি? জিনাত নির্দ্বিধায় বললো, এমন নিশ্চিন্তে বহুদিন ঘোরা হয়নি। গল্প আড্ডা হয়নি। তাই খুব ভালো লেগেছে। সিহাব, রিপন, সোহেল ছেলেগুলিও বেশ ভালো। আপন আপন করে কথা বলে। ওদের বাবা মায়েদের নিয়ে বাসায় আসতে বলেছি। ওরা এলে আমার ভালো সময় কাটবে। ঠিক আছে আমিও বলবো, ওরা যেন আসে। ওদের বাবা মায়ের সঙ্গে তোমার পরিচয় করে দিতে।
পূণ্যির বন্ধুরা তোড়জোরে চাকরির চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। বেশ কয়েক জায়গায় এপ্লিকেশন জমা দিয়েছে। সিহাবের ইন্টারভিউ কার্ড এসেছে। আগামী মাসের ৪ তারিখে ইন্টারভিউ কল করেছে। পরে সিহাবের চাকরি হয় একটা প্রমিনেন্ট প্রাইভেট ফার্মে। পূণ্যিকে চাকরির সুসংবাদ জানানোর সঙ্গে সঙ্গেই জানিয়ে দিল আর দেরি নয়, বিয়েটা সেরে ফেলতে চায়। পূণ্যির বাড়িতে প্রস্তাব পাঠাতে ওর সমর্থন চায়। (চলবে)
লেখক: কবি কথাসাহিত্যিক, প্রবন্ধকার ও গল্পকার। বিটিভির তালিকাভুক্ত গীতিকার। সাবেক উপপরিচালক, মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তর, ঢাকা।







