এক কোটি ৬২ লাখ কৃষকের ডিজিটাল প্রোফাইল
- এক কোটি ৯ লাখ কৃষকের ‘স্মার্ট কৃষি কার্ড’
- এলাকা ও চাহিদাভিত্তিক তথ্য-সেবা
- স্মার্টকার্ডে প্রকৃত কৃষক পাবেন ভর্তুকি-ঋণ
কৃষি যান্ত্রিকীকরণে বিভিন্ন ঋণ দেয়া হচ্ছে। সেজন্য কৃষক সম্পর্কে জানা খুবই প্রয়োজন। স্মার্ট কৃষি কার্ডের মাধ্যমে তারাও সরকারি সুযোগ-সুবিধা-সহায়তা সম্পর্কে জানতে পারবে: পরিকল্পনামন্ত্রী এমএ মান্নান
বিশ্বের ১১৮ দেশে ৫০ জাতের সবজি রপ্তানি করছে বাংলাদেশ। সে হিসেবে সবজি উৎপাদনে বিশ্বে তৃতীয়, চা উৎপাদনে তৃতীয়, কাঁঠাল উৎপাদনে দ্বিতীয়, আম উৎপাদনে সপ্তম, পেয়ারা উৎপাদনে অষ্টম এবং আলু উৎপাদনে ষষ্ঠ অবস্থানে দেশ। অভ্যন্তরীণ মুক্ত জলাশয়ে মাছ আহরণে তৃতীয় এবং মাছ চাষে পঞ্চম। পাট রপ্তানিতে প্রথম ও উৎপাদনে দ্বিতীয়।
নানামুখী চ্যালেঞ্জের মধ্যে দিন দিন উৎপাদন বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে দেশের কৃষিখাত বিশ্বমঞ্চেও আলোচিত। কৃষিভিত্তিক বাংলাদেশ বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম ধান উৎপাদনকারী দেশ। জাতীয় অর্থনীতিও দাঁড়িয়ে আছে কৃষির ওপর। অন্য দুই বৃহৎখাত তৈরি পোশাকশিল্প এবং রেমিট্যান্সের প্রবাহে উঠানামা করলেও কৃষিখাত অনেকটাই স্থায়ী অবস্থান তৈরি করেছে অর্থনীতিতে। আবহাওয়ার প্রতিকূলতাসহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ সত্ত্বেও কৃষিখাতের উৎপাদনের ধারাবাহিকতা কোনো না কোনোভাবে অব্যাহত থাকছে।
করোনা মহামারির ধাক্কায় দেশের সব শিল্পখাত, সেবাখাত, পোশাকখাত সর্বোপরি রপ্তানিখাতের টালমাটাল অবস্থার মধ্যেও ভরসার প্রতীক হয়ে আছে কৃষিখাত। এ খাতের শক্ত অবস্থানের কারণেই বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা তেমন প্রভাব ফেলতে পারেনি। বরং এ সময়ের মধ্যেই কৃষিতে উত্পাদন যেমন বেড়েছে, তেমনি প্রযুক্তিভিত্তিক কৃষি ব্যবস্থাপনার সম্প্রসারণও অব্যাহত রয়েছে।
দেশের দ্রুত অর্থনৈতিক সম্প্রসারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে কৃষিখাত। বিগত অর্থবছরে জিডিপিতে এই খাতের অবদান ছিল প্রায় ১৪ ভাগ। ২০১৬-১৭ সালের শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী, শ্রমশক্তির ৪০ দশমিক ৬২ শতাংশ এখনো কৃষিতে নিয়োজিত। অর্থাৎ কৃষি এখনো কর্মসংস্থানের একটি বড় ক্ষেত্র হিসেবে ভূমিকা রাখছে।
আন্তর্জাতিক খাদ্যনীতি গবেষণা প্রতিষ্ঠান (ইফপ্রি) ও বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৯-২০ সালে দেশের চরম দারিদ্র্য ১০ শতাংশ নিরসনে কৃষি উৎপাদন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। তবে সবসময়ই নেপথ্যের কারিগর এসব কৃষকের সমস্যা আড়ালেই থেকে যাচ্ছে। সারাদেশে পাঁচ কোটির বেশি কৃষক থাকলেও তাদের সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য নেই। তবে এ সমস্যা নিরসনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।
প্রান্তিক পর্যায়ে কৃষিখাতের উৎপাদন বৃদ্ধি ও সমস্যা সমাধানে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে কৃষকরা পাবেন স্মার্টকার্ড। এ কার্ডের মাধ্যমে প্রকৃত কৃষককে প্রণোদনা দেয়া ও মাঠে কী ধরনের ফসল ফলানো হচ্ছে সে বিষয়ে মনিটরিং করা হবে। ডিজিটাল পরিচিতি হিসেবে ‘স্মার্ট কৃষি কার্ড’ ব্যবহার করে প্রতিটি কৃষকের জন্য এলাকা ও চাহিদাভিত্তিক কৃষি সেবা দেওয়া হবে। তাছাড়া কৃষি তথ্যের ডিজিটাল বিশ্লেষণ ও ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে প্রয়োজনীয় কৃষি তথ্যের আদান প্রদান নিশ্চিত করা হবে।
কৃষিখাতের আধুনিকায়নে ‘স্মার্ট কৃষি কার্ড ও ডিজিটাল কৃষি’ প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে। যার মাধ্যমে এক কোটি ৬২ লাখ কৃষকের ডিজিটাল প্রোফাইল তৈরি এবং এক কোটি ৯ লাখ কৃষককে স্মার্ট কৃষি কার্ড দেওয়া হবে। ডিজিটাল উপায়ে এক কোটি ৬২ লাখ কৃষকের সঙ্গে সম্প্রসারণ কর্মী ও কৃষি বিশেষজ্ঞদের যোগাযোগ, তথ্যের আদান প্রদান ও এলাকাভিত্তিক চাহিদা অনুযায়ী সেবা কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, কৃষকদের হাতে এখন একটি কাগুজে কার্ড আছে। কিন্তু এই কার্ড ব্যবহার করতে গিয়ে কৃষকদের নানা ভোগান্তিতে পড়তে হয়। এ জন্য কৃষকের ডিজিটাল পরিচিতি হিসেবে এ স্মার্ট কার্ড দেওয়া হবে। কৃষি মন্ত্রণালয়ের আওতায় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করবে। এতে সম্পূর্ণ সরকারি অর্থায়নে ব্যয় করা হবে ১০৭ কোটি ৯২ লাখ টাকা।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের প্রধান কার্যালয়সহ ভূ-প্রকৃতিভিত্তিক ১৪টি কৃষি অঞ্চলের ৯টি জেলায় স্মার্ট কৃষি কার্ড দেওয়া হবে। জেলাগুলো হলো- গোপালগঞ্জ, সুনামগঞ্জ, টাঙ্গাইল, বরিশাল, যশোর, দিনাজপুর, রাজশাহী, বান্দরবান ও ময়মনসিংহ। এসব জেলার উপজেলা ও মেট্রোপলিটনে ৮৬ টি এলাকায় প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হবে। গত ১০ম একনেক সভায় অনুমোদন পাওয়া এ প্রকল্পটি ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর নাগাদ বাস্তবায়ন করা হবে।
পরিকল্পনামন্ত্রী এমএ মান্নান বলেছেন, এ প্রকল্পের মাধ্যমে কৃষকের আরো কাছে যাবে সরকার। এ কার্ডের মাধ্যমে তাদের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ বাড়বে। তাদের জমির পরিমাণ, কী ফসল তারা চাষ করে, তাদের বীজের প্রয়োজন জানা যাবে। এসব তথ্যের মাধ্যমে তাদের ঋণ বা সহায়তা দেয়া যাবে। মন্ত্রী বলেন, কৃষি যান্ত্রিকীকরণে বিভিন্ন ঋণ দেয়া হচ্ছে। তাই তাদের সম্পর্কে জানা খুবই প্রয়োজন। এ কার্ডের মাধ্যমে তারাও সরকারি বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা ও সহায়তা সম্পর্কে জানতে পারবে।
কৃষির আধুনিকায়নে ইতোমধ্যে কৃষকদের মাঝে ‘কম্বাইন হারভেস্টার’ মেশিন সরবরাহ করা হয়েছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. বেনজীর আলম বলছেন, এসব মেশিন দিয়ে ৮ ঘণ্টায় ৮ একর জমির ধান মাড়াই, কাটা ও ব্যাগিং করা যাচ্ছে। এটা দিয়ে একদিনে যে কাজ করা যায় তা শ্রমিক দিয়ে করলে ১৪৪ দিন লাগবে। কম্বাইন হারভেস্টার মেশিনের দাম ২৯ লাখ টাকা। এসব মেশিনের সহায়তায় হাওর অঞ্চলে ৭০ ভাগ আর সমতল অঞ্চলে ২০ ভাগ পর্যন্ত ভর্তুকি দেয়া হচ্ছে।। টাকার অঙ্কে একজন কৃষক ভর্তুকি পাবেন ২১ লাখ ৭০ হাজার টাকা পর্যন্ত। অনেক ক্ষেত্রে প্রকৃত কৃষক ভর্তুকি পান না বলে অভিযোগ থাকায় এসব সহায়তা দেয়ার ক্ষেত্রে কৃষকের স্মার্ট কার্ড স্বচ্ছতা আনবে।
আগামী ২০৩১ সালে উচ্চমধ্যম আয়ের দেশ এবং ২০৪১ সালে উন্নত দেশে পরিণত হওয়ার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে সরকার। সেজন্য যেকোনো মূল্যে কৃষি খাতের অগ্রগতি অব্যাহত রাখার পরিকল্পনা নেয়া হচ্ছে। এ লক্ষ্য অর্জনে ব্যক্তিখাতে সহায়তা দিয়ে কৃষিতে উৎপাদন ও রপ্তানি ব্যাপক বাড়াতে হবে। এক্ষেত্রে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, বর্তমানে কৃষিকাজে জড়িত কৃষকদের গড় বয়স হচ্ছে ৫৪ বছর। তরুণরা কৃষিতে আগ্রহী না হওয়ায় আগামীতে কারা কৃষিকে এগিয়ে নিবে তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিচ্ছে। বর্তমানে প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে কৃষিকাজের সাথে ৪৬ ভাগ কৃষক জড়িত থাকলেও এক দশক পর তা ৩০ ভাগে দাঁড়াবে। এমনকি দুই দশক পর তা ২০ ভাগে নেমে আসবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। ফলে দ্রুত কৃষির আধুনিকায়নের প্রতি জোর দেয়া হচ্ছে।
অন্যদিকে, কৃষিনীতি বাস্তবায়ন না হওয়ায় কৃষিজমিতে অপরিকল্পিত নগরায়ন, শিল্প-কারখানা স্থাপন, আবাসনসহ নানা স্থাপনা গড়ে উঠছে। এ কারণে প্রতি বছর প্রায় ৬৯ হাজার হেক্টর আবাদি জমি অকৃষি খাতে চলে যাচ্ছে। রাষ্ট্রায়ত্ত্ব গবেষণা প্রতিষ্ঠান মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের (এসআরডিআই) সম্প্রতি প্রকাশিত ‘বাংলাদেশের কৃষিজমি প্রাপ্যতার প্রবণতা’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।
মহাকাশ থেকে স্যাটেলাইটের মাধ্যমে ধারণকৃত চিত্র বিশ্লেষণ পদ্ধতিতে প্রণীত এ গবেষণা প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ২০০০ সাল পরবর্তী ১০ বছরে দেশে প্রতিবছর ৬৮ হাজার ৭৬০ হেক্টর আবাদি জমি অকৃষি খাতে চলে যাচ্ছে। অর্থাৎ ১০ বছরে শুধু আবাদি জমি কমেছে ৬ লাখ ৮৭ হাজার ৬০৪ হেক্টর। এটি কৃষির জন্য অশনিসংকেত বলছেন কৃষি গবেষকরা। নগরায়নের প্রভাবে কৃষিজ জমি কমছে। ফলে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতে কৃষি আধুনিকায়নের মাধ্যমে উৎপাদন বৃদ্ধিতে জোর দেয়ার তাগিদ দিচ্ছেন পর্যবেক্ষকরা।
উল্লেখ্য, কৃষি উৎপাদনে বিশ্বমঞ্চে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখছে বাংলাদেশ। বিশ্বের ১১৮টি দেশে ৫০ জাতের সবজি রপ্তানি করছে বাংলাদেশ। সবজি উৎপাদনে তৃতীয়, চা উৎপাদনে তৃতীয়, কাঁঠাল উৎপাদনে দ্বিতীয়, আম উৎপাদনে সপ্তম, পেয়ারা উৎপাদনে অষ্টম এবং আলু উৎপাদনে ষষ্ঠ অবস্থানে দেশ। বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ মুক্ত জলাশয়ে মাছ আহরণে তৃতীয় এবং মাছ চাষে পঞ্চম। পাট রপ্তানিতে প্রথম ও উৎপাদনে দ্বিতীয়।








