৮ মার্চের অঙ্গীকার--
নারী প্রকৃতির আশীর্বাদে সহজাতভাবে সৃজনশীলতার অধিকারী এক অনন্য বৈশিষ্ট নিয়ে প্রতীয়মান। নারীর সৃজনশীলতার স্পর্শে পৃথিবী হয় সুষমামণ্ডিত। জ্ঞান-বিজ্ঞানে পৃথিবী এগিয়েছে অনেক দূর। এগিয়েছি আমরাও। বিশ্বজগতের প্রতিটি বিজয় ও সাফল্য এবং নবসৃষ্টির পেছনে নারীর অবদানও অপরিসীম। তারপরও নারীর সমঅবদানে সমৃদ্ধ সমাজ আজও নারীকে সমান চোখে দেখতে অভ্যস্ত হয়নি। এ বাস্তবতা বৈষম্যমূলক, যা ভীষণভাবে অযৌক্তিক, অনৈতিক ও পুরুষতান্ত্রিক সমাজের পক্ষপাতদুষ্ট সংকীর্ণতার বহিঃপ্রকাশ।
আর্ন্তজাতিক নারী দিবস বিশ্ব নারীর অহঙ্কারের প্রত্যয়দীপ্ত একটি দিন। সুদীর্ঘ নারী আন্দোলনের যৌক্তিকতায় জাতিসংঘের সমর্থনের মধ্য দিয়ে তাৎপর্যপূর্ণ এ দিনটি প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল বলেই আজকে দেশের সামগ্রিক অগ্রযাত্রায় সোনালি সূর্য ঝলমলে আলোয় উদ্ভাসিত। এই দিনটি সর্বক্ষেত্রে নারীর অগ্রযাত্রার প্রবেশ দ্বার উন্মুক্ত করেছে। প্রতিষ্ঠিত এই দিনের প্লাটফর্মকে সামনে রেখে নারী তার ন্যায্য পাওনা আদায়ে নতুন চিন্তাধারা প্রয়োগে সাহসী হয়েছে।
একবিংশ শতাব্দীর সূচনায় দাঁড়িয়ে নারী আন্দোলন তথা বাংলাদেশের নারী আন্দোলন যুক্ত হয়েছে ‘সিডো’ সনদ বাস্তবায়ন, বেইজিং, বেইজিং+১০, আজকের বিশ্ব ও বিশ্বায়ন প্রক্রিয়ার সঙ্গে। তাই বিশ্বায়নের ভালো মন্দ জেন্ডার ইকুয়ালিটির মধ্যে নতুন ভাবনা- মিলেনিয়াম ডেভলপমেন্ট গোল, প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর ভূমিকা রাষ্ট্র, সমাজ ও পরিবারের দায়িত্বকে আজ নতুন করে পর্যালোচনা করে দেখতে হবে বিশ্বায়নের পরিস্থিতি। জাতীয় উন্নয়নের ধারাকে গতিশীল করতে সাধারণ মানুষ তথা নারী-পুরুষকে নির্বিশেষে স্বাবলম্বী করে তোলা, শিক্ষা স্বাস্থ্য চিকিৎসা- এসবের মান এবং পরিণত সামাজিক অবস্থানগত উন্নয়ন পূর্বক ক্ষমতায়নের কথা ভাবতে হবে। কারণ আত্মবিশ্বাস, আত্মউন্নয়ন ও স্বাবলম্বীতা ছাড়া স্বাধীনতা এবং যে কোনো ধরনের মতায়নের কথা ভাবা যায় না।
বর্তমানে অনেক পরিবর্তন এসেছে। সাম্প্রতিক বিশ্বের দেশে দেশে রাষ্ট্র প্রধান, সরকার প্রধান, বিচারপতি, মন্ত্রী প্রভৃতি পদমর্যাদায় অধিষ্ঠিত হয়েছেন নারীরা। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার শীর্ষপদেও নারীরা নেতৃত্বের আসনে অধিষ্ঠিত হতে সক্ষম হয়েছেন। বিশ্বের দেশে দেশে বর্তমানে রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান হিসেবে নারী এখন ক্ষমতাসীন। আমরা দেখতে পাই:
১. মিশেল বাশেলেট: চিলির প্রথম প্রেসিডেন্ট। তিনি ২০০৬ সালের ১১ মার্চ দায়িত্বভার গ্রহণ করেন।
২. ইলেন জনসন সারলিফ: লাইবেরিয়ার তথা আফ্রিকার প্রথম নারী প্রেসিডেন্ট। তিনি ২০০৬ সালের ১৬ জানুয়ারি শপথ নেন।
৩. আঞ্জেলা মারকেল: জামানীর প্রথম নারী চ্যান্সেলর। ২০০০ সালে সিডিই পার্টির সভাপতি এবং ২০০৬ সালে চ্যান্সেলর নির্বাচিত হন।
৪. মারিয়া ডি-কারমো: সাওটোমা অ্যান্ড প্রিন্সিপির দ্বিতীয় নারী প্রধানমন্ত্রী। ২০০৫ সালের ৮ জুন প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
৫. হেলেন কার্ক: নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী। ২০০৫ সালের অক্টোবরে প্রধানমন্ত্রী হিসাবে পুনঃনির্বাচিত হন।
৬. হান মিউংসুক: দক্ষিণ কোরিয়ার প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী। ২০০৬ সালের ২১ এপ্রিল তিনি দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
এছাড়া বাংলাদেশ, জ্যামাইকা, মোজাম্বিক, ফিলিপাইন এবং ইউক্রেনের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নারী। ফিনল্যান্ডের বর্তমান প্রেসিডেন্ট একজন নারী। বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর দুই নারী: যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী কন্ডোলিৎসা রাইচ ও হিলারী ক্লিনটন। বহির্বিশ্বের পররাষ্ট্রনীতিতে তাঁরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন।
নারী প্রকৃতির আশীর্বাদে সহজাতভাবে সৃজনশীলতার অধিকারী এক অনন্য বৈশিষ্ট নিয়ে প্রতীয়মান। নারীর সৃজনশীলতার স্পর্শে পৃথিবী হয় সুষমামণ্ডিত। জ্ঞান-বিজ্ঞানে পৃথিবী এগিয়েছে অনেক দূর। এগিয়েছি আমরাও। বিশ্বজগতের প্রতিটি বিজয় ও সাফল্য এবং নবসৃষ্টির পেছনে নারীর অবদানও অপরিসীম। তারপরও নারীর সমঅবদানে সমৃদ্ধ সমাজ আজও নারীকে সমান চোখে দেখতে অভ্যস্ত হয়নি। এ বাস্তবতা বৈষম্যমূলক, যা ভীষণভাবে অযৌক্তিক, অনৈতিক ও পুরুষতান্ত্রিক সমাজের পক্ষপাতদুষ্ট সংকীর্ণতার বহিঃপ্রকাশ।
আর এই বৈষম্যমূলক সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গিই নারীর প্রতি সহিংসতার মূল কারণ। মমতাময়ী নারী মানবশিশুকে গর্ভে ধারন করে পৃথিবীকে রেখেছে প্রাণবন্ত। নারীবিহীন সুসজ্জিত মায়া মমতার পরিবার কল্পনা করা যায় না। মাতৃর্গভ হতে শিশুর জন্মের পর যেকোনো পেশার একজন নারীর কোল জুড়ে নারীর স্তন্যসুধা পান করে নিরাপদ আদর যত্নে বেড়ে উঠে শিশু। পৃথিবীর বিস্তৃত অবয়বের সঙ্গে পরিচিত হয়। অবারিত দৃষ্টি প্রসারিত করতে শেখে।
নারীর কাছেই প্রথম হাতে খড়ি আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক শিক্ষা ও জ্ঞানের মতো আলোকবর্তিকার। দক্ষ নাগরিক বানাতে গোড়ায় পানি ঢালার কাজটি করেন স্নেহময়ী মা। যেকোনো একজন মানুষের পৃথিবীর পাঠশালায় প্রথম কারিগর ও শিক্ষক মা। আনন্দ ভালোবাসা, স্নেহ-মমতা, প্রেরণা ছাড়াও এ বিশ্ব বিনির্মাণে নানা উদ্ভাবন আবিষ্কার আর মাঠে ময়দানে সুনিপুণ দক্ষতা দেখিয়েছে নারী, নেতৃত্ব দিয়েছে নানা আন্দোলন, সংগ্রামে। ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়েছে নানা দেশের শীর্ষ আসনে। কর্মী, আবিষ্কারক, বিচারক, বিজয়ী পর্বতারোহী, নভোচারিণী, রানী, প্রেসিডেন্ট, প্রধানমন্ত্রী, স্পিকার, বিরোধীদলের নেত্রী, রাজনীতি, আইন সভায়, মন্ত্রীসভায়, ইউনিয়ন পরিষদ প্রশাসনের উচ্চপর্যায় পর্যন্ত।
সিমন দ্যা বেভোয়ার বলেছেন, ‘নিজের পুরুষত্ব নিয়ে নিরাপত্তাহীনতায় ভোগা একজন পুরুষ নারীর প্রতি সবচেয়ে বেশি অহম, আক্রমণাত্মক অথবা ঘৃণাপূর্ণভাব প্রকাশ করে থাকে’। হাজার বছর ধরে নারীর সামাজিক বা শারিরীক নিষ্পেষণের মূল কারণটি তিনি একটি বাক্যে বলে দিয়েছেন’। নারীর উপস্থিতি নিজ যোগ্য আসনে সমাসীন হওয়া সত্ত্বেও এখনো বিশ্বময় নারীর সার্বভৌম অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়নি। ক্ষমতায়ন ও সার্বভৌম অধিকার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে প্রচলিত ধ্যান ধারণার প্রভাবমুক্ত হওয়া অত্যন্ত জরুরি।
নারী অধিকার নিশ্চিত করে তাঁকে ক্ষমতায়ন করা শুধু সমাজের জন্য নয়, পুরুষের নিজের জীবনের মানউন্নয়নেও অতি প্রয়োজন। একটি পরিবারের পুরো দায়ভার একজন পুরুষকে করে তোলে সেই পরিবারটির একজন প্রয়োজনের কৃতদাস। তাতে হয়তো সে পরিবারের আন্যান্য সদস্যদের ওপর অভিভাবকত্বের ক্ষমতায় যথেচ্ছা দাম্ভিকতা করার অধিকার পায়, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তার জীবনখানি ঐ পরিবারের ঘানি টানা বলদের মতোই হয়। তার গতানুগতিক জীবনমানের তেমন কোনো পরিবর্তন হয় না।
একমাত্র উদার চিত্তে দূরদর্শী চিন্তাকর্ষণের মাধ্যমে নারীর অবদানের মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি প্রদান পূর্বক নারীর ক্ষমতায়নের পথ সুগম করতে পারলে এই অবস্থার পরিবর্তন আসবেই আসবে। ম্যান্সপ্লানিং বন্ধ করতে হবে। এই শব্দটি দিয়ে যা বোঝায় তা হলো- প্রচলিত ধারণায় পুরুষ শ্রেণি অনেক সময় পরিবেশের অহম থেকে মনে করেন যে তার নিজের অভিজ্ঞতা জ্ঞান নারীর চেয়ে বেশি, পুরুষ নামে মনে করে সে জানে বেশি, ক্ষমতা ও জ্ঞানে নারী অপেক্ষা সুপিরিয়র। জ্ঞান-বিজ্ঞানের চর্চা ও পরিচর্চার মাধ্যমে সমৃদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও পুরুষের প্রাচীন মানসিকতার গণ্ডি থেকে বেরিয়ে আসার মতো উদার চিত্ত এখনও তৈরি হয়নি।
পারিবারিক ও সামাজিক পরিবেশ থেকে নারীর জ্ঞান দক্ষতা কর্ম ও মর্যাদাকে তাচ্ছিল্য করে দেখতে শেখার অভ্যাসের অবসান হয়নি আজও। নারীর ক্ষমতায়নের পথ প্রসারিত করতে হলে এমন ধারণার অবসান অবশ্যই প্রয়োজন। একটা উদাহরণের মাধ্যমে পরিষ্কারভাবে বোঝানোর চেষ্টা করছি: একজন ছেলে বন্ধুকে তার মেয়ে বন্ধু বললো- ছেলেটি এমন নোংরাভাবে আমার দিকে তাকাচ্ছিল যে, আমাকে আড্ডা থেকে চলে আসতে হলো। সঙ্গে সঙ্গে ছেলে বন্ধুটি বললো- ছেলেটি না হয় একটু তাকিয়েছে, তাতে কী হয়েছে? সে তো আর বাঘ ভাল্লুক নয়? এখানে ছেলে বন্ধুটি ঝট্পট্ তার মতো করে মেয়েটির মানসিক অবস্থার বিচার না করে মন্তব্য করে ফেললো। এটাই ম্যান্সপ্লানিং।
বাংলাদেশের নারীদের ক্ষেত্রে শিশু কন্যা থেকে একজন নারীর প্রতি জীবনাবসানের আগ পর্যন্ত তার কাছের পুরুষটি (অভিভাবক, বাবা, ভাই, স্বামী) এই কাজটিই করে থাকেন। তারা জানেন না এ কাজটির প্রভাব নারীকে মানসিকভাবে কতটা ক্ষতিগ্রস্ত করে। আর এ কারণেই কোনো কিশোরী ইভটিজিংয়ে উত্ত্যক্ত হয়ে বাড়িতে অভিভাবকের সহানুভূতির আশ্বাস পাবে না এই আস্থাহীনতায় আর তাচ্ছিল্য হওয়ার ভয়ে নিরূপায় হয়ে আত্মহননের পথ বেছে নেয়।
লেখক: কবি ও সংগঠক। সাবেক উপ-পরিচালক, মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তর, ঢাকা।








