কমবয়সী মেয়েরা বেশি যৌন হয়রানির শিকার
- জুডিশিয়াল পদ্ধতিতেই বড় ধরনের সমস্যা: নারী সংগঠন
বাংলাদেশের নারী ভাগ্য বদলাতে পাড়ি জমায় বিদেশে। বেশিরভাগ নারী গিয়েছেন গৃহপরিচারিকার কাজে। এদের মধ্যে অনেকে নিয়ে এসেছেন বৈদেশিক মুদ্রা। অনেকে নিঃস্ব হয়েছেন দালালের খপ্পরে পড়ে। তাদের কেউ কেউ হচ্ছেন যৌন নির্যাতনের শিকার। কেউ বা শারীরিক আবার কেউ কেউ হচ্ছেন মানসিক নির্যাতনের শিকার। এসব অভিবাসীদের অনেকে ফিরে এসেছেন দাসের জীবন থেকে। তবে যাদের কারণে দাসের জীবন তারা থাকছেন ধরাছোঁয়ার বাইরে। বিচারহীনতার সংস্কৃতি চর্চার কারণে বিচার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন তারা। বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে পারলেও আইনের ফাঁক-ফোকর দিয়ে তারা বেরিয়ে আসে দুর্নীতিবাজরা। মামলার শুনানির তারিখ না জানার কারণে ভিকটিম মামলার দিন আদালতে হাজির হতে পারে না। মামলাগুলোতে সাক্ষী পাওয়া যায় না। শুনানিতে ভিকটিমের অনুপস্থিতির কারণে মামলাগুলো দুর্বল হয়ে পড়ে। ফলে অপরাধীরা জামিনে বেরিয়ে আসে।
নারী অভিবাসীদের নিয়ে কাজ করা একাদিক সংগঠনের নেতারা বলছেন, জুডিশিয়াল পদ্ধতিতেই বড় ধরনের সমস্যা রয়েছে। যে কারণে অপরাধীকে বিচারের আওতায় আনা যাচ্ছে না। এর ফলে একদিকে যেমন অপরাধের মাত্রা বাড়ছে অন্যদিকে অভিবাসী নারীরা পাচারের শিকার হচ্ছেন। শ্রমিকদের নিরাপত্তা প্রদানের জন্য ২৫ বছরের ওপরে মেয়েদের পাঠানো হচ্ছে। কিন্তু যে নারীরা অভিবাসনের জন্য যথাযোগ্য নয় তারাও বিদেশ যাচ্ছেন। এতে করে কমবয়সী মেয়েরা অভিবাসী হচ্ছেন। তারাই বেশি যৌন হয়রানির শিকার হয়।
বিভিন্ন সূত্রের বরাতে তারা বলছেন, যেসকল নারী শ্রমিক চাকরি করতে যাচ্ছেন তাদের অধিকাংশেরই প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নেই। তাদের মধ্যে যথেষ্ঠ তথ্য ঘাটতি রয়েছে। যে কারণে কোনো কথা জিজ্ঞেস করলে তারা বলতে পারে না। অথচ তাদের লেবানন কাতার সৌদি আরবের মতো দেশে পাঠানো হচ্ছে। রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর মাধ্যমে বিদেশ গিয়ে বিপদে পড়েছেন। তারা ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। অভিবাসী নারী শ্রমিকের সংখ্যা মৌলিক সংখ্যার প্রায় অর্ধেক। শ্রমবাজারে অংশ নেয়া এসব নারী কর্মীর মধ্যে অনেকেই কম দক্ষতাসম্পন্ন। যে কারণে কর্মক্ষেত্রেও অধিকাংশ সময়ই সুরক্ষা সমস্যায় পড়েন। এর তথ্য ইউনিয়ন পরিষদের ডিজিটাল সেন্টারে থাকার কথা থাকলেও তা নেই। তাদের অধিকাংশই এ বিষয়ে জানেন না।
নারীর মানবাধিকার ও ক্ষমতায়ন বিষয়ক কনভেনশন অনার্স কল্যাণ বোর্ড সূত্রে বলছে, ২০২০ সালে চার লাখ ৮ হাজার প্রবাসী কর্মী দেশে ফিরেছেন। এর মধ্যে ৪৯ হাজার নারী কর্মী রয়েছেন। তাদের বেশিরভাগ পুলিশের হাতে আটকের পর বাধ্য হয়ে দেশে ফিরেছেন। সরকারি হিসেব মতে, ২০২০ সালের এপ্রিল থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ৭৭ শতাংশ নারী কর্মী দেশে ফিরেছেন। জনশক্তি প্রশিক্ষণ ও কর্মসংস্থান ব্যুরো তথ্যমতে, বিদেশে কাজ করতে যাওয়া নারীকর্মীদের মধ্যে ৯৭ শতাংশ নারী যান মধ্যপ্রাচ্যে। মোট কর্মীর ৪০ শতাংশই যান সৌদি আরবে।
প্রবাসে নির্যাতনের শিকার হয়ে দেশে ফেরত আসা নারগিস আক্তার বলেন, জয়পাড়ার মনির নামে এক দালালের (আসল বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়া) মাধ্যমে তিনি লেবানন যান। দালাল বিদেশ যাওয়া বাবদ ৫০ হাজার টাকা নেয়। তাকে লেবাননে এক বাসায় গৃহপরিচারিকার কাজ দেয়। সেখানে অনেক অত্যাচার নিযার্তনের শিকার হন তিনি। সব নির্যাতন সহ্য করে এক বছর কাজ করেন। পরবর্তীতে গৃহকর্তার দ্বারা অত্যাচার ও নিযার্তনের পরিমাণ অনেক বেড়ে যায়। পরে সেখান থেকে তিনি পালিয়ে যান। সেই দেশের ভাষা জানতেন না। এমনকি তার পরিচিতও কেউ ছিলো না। এক বাঙালি নারীর সহযোগিতায় তিনি একটি কাজ পান। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি কোনো কাজও পাননি। বাংলাদেশে তার পরিবারের আর্থিক অবস্থা খুব খারাপ থাকায় তিনি দেশেও ফেরত আসতে চাননি। এভাবেই সেখানে কখনো কাজ পেলে কাজ করেছেন, কাজ না পেলে আর্থিক কষ্টের মধ্য দিয়ে দিন কাটিয়েছেন। এভাবে নারগিস লেবাননে দিনের পর দিন অবস্থান করেন। ২০২০ সালের শেষ দিকে বাংলাদেশে ফেরত আসেন। দেশে ফেরার পর তার প্রতিবেশি, পাড়ার লোকেরা তার সাথে কথা বলেনি, অনেকে তাকে নিয়ে কটুক্তি করেছে।
আরেক ভুক্তভোগী মোসা. বেবী আক্তার বলেন, বাড়ির পাশে এক দালালের মাধ্যমে তিনি গৃহকর্মীর কাজ নিয়ে সৌদিতে যান। সৌদি যেতে তার খরচ হয়েছে ৪০ হাজার টাকা। গৃহকর্তা তাকে খাবার দিতো না, মারধর করতো। ৩ দিন তাকে বাথরুমে আটকে রেখেছিলো। একদিন সুযোগ পেয়ে সেখান থেকে পালিয়ে যান। রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে কান্নাকাটি করছিলেন। সেখানে এক বাঙালির সাথে তার দেখা হয়। সেই বাঙালি তাকে বাংলাদেশ দূতাবাসে যাওয়ার পরামর্শ দেন। শুধু তাই নয়, তাকে একটি গাড়িতে উঠিয়ে দূতাবাসে যেতেও সহযোগিতা করেন। তিনি ১৫ দিন দূতাবাসের তত্ত্বাবধানে ছিলেন। কিন্তু দেশে ফেরার বিমান ভাড়া ছিলো না তার কাছে। বাংলাদেশ থেকে ২২ হাজার টাকা পাঠালে তিনি দেশে ফিরে আসেন।
সিডব্লিউসিএসের প্রেসিডেন্ট অধ্যাপক ইসরাত শামীম বলেন, নারী অভিবাসীদের পক্ষ থেকে নানা অভিযোগ আসে। যা আমরা গণমাধ্যম মারফত জানতে পারি। তাদের ঠিক মতো খাবার দেয়া হয় না। বাড়িতে যোগাযোগ করতে দেয়া হয় না। কোনো ধরণের সুযোগ-সুবিধা দেয়া হয় না। অভিবাসী পাচারের সংজ্ঞায় এ বিষয়গুলোই উল্লেখ আছে। এগুলো হলেই তাকে পাচার বলে। বলা হচ্ছে তাদেরকে বৈধভাবে নেয়া হচ্ছে, কিন্তু সেখানে যাওয়ার পরে এগুলো শুনতে হচ্ছে আমাদেরকে। এটাতো স্পষ্ট নারী পাচার। সংজ্ঞায়ও তাই বলা আছে। কিন্তু যারা এর সাথে জড়িত তাদের বিচারের আওতায় আনা যাচ্ছে না।
ইসরাত শামীম আরো বলেন, স্থাানীয় সরকারকে অভিবাসনের সকল তথ্য জানতে হবে। অভিবাসী নারীদের ডিজিটাল শিক্ষা বাড়াতে হবে। তাদের বিভিন্ন প্রশিক্ষণ দিতে হবে। দেশের বাইরে যাবার আগেই তারা মোবাইল ফোনে ছবি তুলে কিভাবে তাদের প্রয়োজনীয় ডকুমেন্টস স্বজনদের কাছে পাঠাবেন, কিভাবে সংরক্ষণ করবেন তা শিখাতে হবে।
আইসিএমপিডির কান্ট্রি কোর্ডিনেটর মোহাম্মাদ ইকরাম হোসেন বলেন, ইউনিয়ন পরিষদকে সম্পৃক্ত করে ইউনিয়ন পরিষদে নারী অভিবাসন কমিটি গঠন করা প্রয়োজন। ডেমো অফিসকে জবাবদিহিতার আওতায় আনা এবং নারী-বান্ধব পরিবেশ প্রয়োজন। সরকারের বিভিন্ন সুবিধা আছে, সরকারের নতুন পলিসি উদ্যোগ নিচ্ছে যেমন রিইন্টিগ্রেশন পলিসি। একদম ডোর স্টেপে সার্ভিসগুলো প্রচার করতে হবে।








