উত্থান–পতনের সাক্ষীর চিরবিদায়
- শোকের ছায়া ব্রিটেন ছাড়িয়ে গোটা বিশ্বেই
না ফেরার দেশে চলে গেছেন ব্রিটেনের রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ। গত বৃহস্পতিবার তিনি পরলোকগমন করেন। মৃত্যুকালে মহীয়সী এই নারীর বয়স হয়েছিল ৯৬ বছর। শোকের ছায়ায় আছন্ন বিশ্ব। গণমাধ্যম থেকে শুরু বিভিন্ন ধরনের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ভক্তরা গাইছেন রানীর গুণগান। অনেকেই মেনে নিতে পারছেন না প্রিয় ব্যক্তির পৃথিবী বিয়োগ। এমনকি ভুলে গেছেন ২০০ বছরের শাসন ও শোষণ। স্বয়ং ভারতবর্ষের বিভিন্ন নেতা করেছেন শোক প্রকাশ।
সিংহাসনে আরোহনের পর গত সাত দশকে ১৫ জন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর আসা-যাওয়া দেখেছেন তিনি। রয়েছেন উইনস্টন চার্চিল, মার্গারেট থ্যাচার, বরিস জনসনসহ সবশেষ প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পাওয়া লিজ ট্রাস। ১৯৫২ সালে রানি যখন সিংহাসনে বসেন, তখন যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন কনজারভেটিভ পার্টির নেতা উইনস্টন চার্চিল। ৫২ সালে বাবার মৃত্যুর পর সিংহাসনে বসেন দ্বিতীয় এলিজাবেথ। বয়সে ছোট হওয়ায় সেসময় এলিজাবেথকে শিশু বলে অভিহিত করেছিলেন তিনি। ১৯৫৫-৫৭ সাল পর্যন্ত স্বল্প সময়ের জন্য প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বে থাকেন অ্যান্থনি ইডেন। ১৯৫৬ সালে সুয়েজ ইস্যুতে পদত্যাগ করেন তিনি। ১৯৫৭ থেকে ১৯৬৩ পর্যন্ত যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন হ্যারল্ড ম্যাকমিলান।
১৯৭০-এ উইলসনের স্থলাভিষিক্ত হন কনজারভেটিভ পার্টির নেতা এডওয়ার্ড হিথ। প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন ১৯৭৪ পর্যন্ত। রানি এলিজাবেথের সময় হ্যারল্ড উইলসন দুই মেয়াদে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৬৪-৭০ এবং ১৯৭৪ থেকে ৭৬ সাল পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। জেমস ১৯৭৬ থেকে ১৯৭৯ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রীর পদে ছিলেন। তার সরকারের সময় ব্রিটেনের অর্থনৈতিক মন্দা এবং ইউনিয়নগুলোতে ব্যাপক সমস্যা দেখা দেয়।
রানি এলিজাবেথের সময়ে ১১ বছর প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বে ছিলেন মার্গারেট থ্যাচার। তিনি ১৯৭৯-১৯৯০ সাল পর্যন্ত ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। তবে রানির সঙ্গে থ্যাচারের শীতল সম্পর্ক ছিল বলে গুঞ্জন রয়েছে। ১৯৯০ সালে এ পদে বসেন জন মেজর। কনজারভেটিভ পার্টির নেতা মেজর ১৯৯০ থেকে ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত যুক্তরাজ্যের সরকারপ্রধান ছিলেন। মজার ব্যাপার হচ্ছে টনি ব্লেয়ার হচ্ছেন যুক্তরাজ্যের প্রথম প্রধানমন্ত্রী যিনি রানির শাসনামলে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৯৭ থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী ছিলেন টনি। টনি ব্লেয়ারের স্থলাভিষিক্ত হন গর্ডন ব্রাউন। লেবার পার্টির নেতা ২০০৭-২০১০ সাল পর্যন্ত যুক্তরাজ্যের সরকারপ্রধান ছিলেন। এরপর কনজারভেটিভ পার্টির ডেভিড ক্যামেরুন ক্ষমতায় ছিলেন ২০১০ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত।
পরবর্তীতে ব্রিটিশ সরকারপ্রধানের দায়িত্বে বসেন থেরেসা মে। তিনি ব্রিটেনের দ্বিতীয় নারী প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। ব্রেক্সিট ইস্যুতে ১০ নং ডাউনিং স্ট্রিট থেকে সরে দাঁড়াতে হয় তাকে। এরপরই আসেন বরিস জনসন। যিনি ২০১৯-২২ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। তার আমলেই ব্রেক্সিট ইস্যুটি সমাধান হয়। সবশেষ ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বে বসেন লিজ ট্রাস। ৬ সেপ্টেম্বর বালমোরালে রানি এলিজাবেথের সঙ্গে দেখা করার পর সরকার গঠনের অনুমতি পান তিনি। এর দু’দিন পরই মারা গেলেন রানি। এর সঙ্গে ব্রিটেনের ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘ সময় সিংহাসনের দায়িত্বে থাকা রানির অধ্যায়ের শেষ হলো।
এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্ম হয়েছিল ডায়ানার, ছোটবেলায় তার বছর কয়েক কেটেছিল পার্ক হাউস নামে এক বাড়িতে যেটি ছিল রানির অন্যতম একটি আবাস স্যান্ড্রিংহামের ঢিল-ছোঁড়া দূরত্বে। রানি নিঃসন্দেহে মনে করতেন মেয়েটির রাজ পরিবারে প্রিন্সেস হবার সবরকম যোগ্যতা আছে। তবে খুব শিগগিরই এটা বেশ স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল যে আবেগপ্রবণ উঠতি বয়সের তরুণী ডায়ানা প্রাসাদের কঠোর মধ্যযুগীয় নিয়মনীতি নির্ভর জীবনের জন্য তখনো তৈরি ছিলেন না। এ বিষয়ে তার ভাবী স্বামীর সাহায্যও তিনি পাননি। চার্লসের রাশভারী চরিত্র ছিল ডায়ানার উচ্ছল ও বহির্মুখী চরিত্রের বিপরীত। এ ছাড়াও চার্লসের মনেপ্রাণে তখনও ছায়া ফেলে রেখেছিলেন তার প্রাক্তন প্রেমিকা ক্যামিলা পার্কার-বোলস।
চার্লস ও ডায়ানার বাগদানের পর এক টিভি সাংবাদিক যখন চার্লসকে জিজ্ঞেস করেছিলেন তিনি কি ডায়ানার প্রেমাসক্ত- তখন চার্লসের দায়সারা গোছের জবাব, ‘ওই প্রেম বলতে যা বোঝায় আর কী’- সেটাই ওই দম্পতির সম্পর্ক কেমন হতে যাচ্ছে সে বিষয়ে একটা ইঙ্গিত দিয়েছিল। রানি তার ছেলেমেয়েদের বিয়ের ব্যাপারে খুব কমই নাক গলানোর নীতিতে বিশ্বাসী ছিলেন। অনেক ভাষ্যকার বলেছেন রানির আসলে উচিত ছিল রাজ পরিবারে নতুন সদস্য যারা আসছেন , তাদের পরিবারের রীতিনীতি সম্পর্কে পরামর্শ ও নির্দেশ দেওয়া। ডায়ানা রাজপরিবারের এসে অসহায় ও বিচ্ছিন্ন বোধ করতেন- বুঝতে পারতেন না তার কাছে প্রত্যাশা কী-এবং ভালো কিছু করলে কখনও প্রশংসা না পেয়ে হতাশ বোধ করতেন।
প্রিন্স চার্লসের মতো রানিও প্রিন্সেস ডায়ানার ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশে অস্বস্তি বোধ করতেন- বুঝতে পারতেন না কীভাবে পরিস্থিতি সামাল দিতে হবে। রানির বড় হয়ে ওঠার অভিজ্ঞতা ছিল ভিন্ন। তার সময়ে মনের ভাব বা অনুভূতি প্রকাশ করার চল ছিল না। ডায়ানার মেজাজ-মর্জি এবং নজর কাড়ার জন্য তাঁর নেওয়া নাটকীয় কিছু পদক্ষেপ তারা কীভাবে সামলাবেন আসলে সেটা তারা বুঝতে পারতেন না। অনেকে মনে করতেন জনমত কীভাবে নিজের দিকে টানতে হয়, সে বিষয়টি ডায়ানা ভালো বুঝতেন এবং তা ব্যবহারও করতেন। রাজপরিবার এ বিষয়ে অদক্ষ ছিল।
রানি দেখলেন ডায়ানা এবং চার্লসের বিয়ে ভেঙে যাচ্ছে। অথচ এ বিয়ে থেকে অনেক কিছু আশা করেছিলেন তিনি। তিনি পাশ থেকে শুধু শান্তি বজায় রাখার চেষ্টা করেছিলেন। তিনি খুব ভালো করেই বুঝতে পারছিলেন এক্ষেত্রে তার ছেলের ব্যর্থতা এবং পরিণামে এই বিয়ের ব্যর্থতা রাজতন্ত্রের ভবিষ্যতের ওপর বড় ধরনের একটি আঘাত হয়ে আসবে। চার্লস আর ডায়ানার মধ্যে সম্পর্কের আরও অবনতি ঘটার পর রানি ছেলের বিবাহিত জীবনে নাক না-গলানোর যে নীতি মেনে চলছিলেন, তা থেকে বেরিয়ে আসার সিদ্ধান্ত নেন। তিনি দুজনকে কথা বলতে ডেকে পাঠান এবং তাদের অনুরোধ করেন এ বিয়ে টিকিয়ে রাখতে তারা যেন শেষবারের মতো চেষ্টা করেন।
কিন্তু তাতে কোনো ফল হল না। ডায়ানা বিবিসির প্যানোরামা অনুষ্ঠানে এক সাক্ষাৎকারে তার কাহিনি বিশ্বের সামনে তুলে ধরার সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর রানি আবার এ বিষয়ে হস্তক্ষেপের সিদ্ধান্ত নিলেন। তিনি দুজনকেই আলাদা করে চিঠি লিখে বললেন তাদের সামনে এখন একটাই পথ খোলা আছে -বিবাহবিচ্ছেদ। নাতিদের কথা মাথায় রেখে রানি ডায়ানার সঙ্গে ভালো সম্পর্ক বজায় রেখেছিলেন। কিন্তু তাদের ডিভোর্সের পর রানি ও ডায়ানার সম্পর্কে আরও অনেক দূরত্ব তৈরি হয়।
ডায়ানার মৃত্যুর পর রানির বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে, তিনি জনগণের মন-মানসিকতা বুঝতে ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছেন। রানি তখন তার শোকাহত দুই নাতিকে সান্ত্বনা দিতে ছিলেন বালমোরাল প্রাসাদে। এ ঘটনার পর বহু সংবাদপত্রে ডায়ানার মৃত্যুতে রানির প্রতিক্রিয়ার প্রতি ইঙ্গিতপূর্ণ নাটকীয় নানা শিরোনাম আসায় আর জনমতেও এর প্রতিফলন ক্রমশ বাড়তে থাকায় তিনি লন্ডনে ফিরে আসতে বাধ্য হন। ডায়ানার শেষকৃত্যের আগের দিন রানি নজিরবিহীন এক টেলিভিশন ভাষণ দেন, যাতে তিনি তার পুত্রবধূ সম্পর্ক খোলামেলা কথা বলেন। তার সেই সম্প্রচার ছিল যুগান্তকারী।
এতে রানি, রাজকুমারী ডায়ানার আবেগ এবং সমাজে তার অবদানকে স্বীকৃতি দিয়েছিলেন। বলা হয়, রানি তার এ ভাষণের মধ্যে দিয়ে রাজতন্ত্রকে একটি বিপর্যয়ের দোরগোড়া থেকে উদ্ধার করেছিলেন। রাজকুমারী ডায়ানার মরদেহ নিয়ে কফিন বাকিংহাম প্রাসাদের ফটক অতিক্রম করার সময় রানি তার পুত্রবধূকে শেষ বিদায় জানিয়েছিলেন।
এদিকে রানির মৃত্যুর পর তাঁর বড় ছেলে ৭৩ বছর বয়সী তৃতীয় চার্লস স্বয়ংক্রিয়ভাবে ব্রিটিশ সিংহাসনে আরোহণ করেছেন। রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথের স্বামীর নাম প্রিন্স ফিলিপ। তিনি গত বছর ৯৯ বছর বয়সে মারা যান। তাঁদের চার সন্তান- তৃতীয় চার্লস, প্রিন্সেস অ্যানি, প্রিন্স অ্যান্ড্রু ও প্রিন্স এডওয়ার্ড। রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথের ৪ সন্তান, ৮ নাতি-নাতনি ও ১২ প্রপৌত্র-পৌত্রী আছে। তৃতীয় চার্লস রাজা হওয়ার পর এখন ব্রিটিশ সিংহাসনের উত্তরাধিকারের ক্রমতালিকাটি ঠিক কেমন দাঁড়িয়েছে, তা গতকাল শুক্রবার এক সচিত্র প্রতিবেদনে জানিয়েছে বিবিসি অনলাইন। ক্রমতালিকায় থাকা ২৩ উত্তরাধিকারের নাম উঠে এসেছে।
তৃতীয় চার্লস রাজা হওয়ার পর এখন ব্রিটিশ সিংহাসনের উত্তরাধিকারীদের ক্রমতালিকার এক নম্বরে রয়েছেন প্রিন্স উইলিয়াম। তিনি রাজা চার্লসের বড় ছেলে। তাঁর জন্ম ১৯৮২ সালে। মা প্রিন্সেস ডায়ানা। চার্লসের প্রথম স্ত্রী ডায়ানা। তিনি ১৯৯৭ সালে ফ্রান্সের প্যারিসে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হন। মৃত্যুর কয়েক বছর আগে চার্লসের সঙ্গে তাঁর বিচ্ছেদ হয়। ২০০৫ সালে ক্যামিলাকে বিয়ে করেন চার্লস। চার্লস রাজা হওয়ার পর ক্যামিলা এখন ‘কুইন কনসোর্ট’ বলে অভিহিত হবেন। প্রিন্স উইলিয়ামের ছেলে প্রিন্স জর্জ রয়েছে ক্রমতালিকার দুই নম্বরে। তার জন্ম ২০১৩ সালে। মা কেট মিডলটন। তিন নম্বরে প্রিন্স উইলিয়ামের মেয়ে প্রিন্সেস শার্লট। তার জন্ম ২০১৫ সালে।








