প্রতিবছরের বন্যায় কুড়িগ্রামের চিলমারী উপজেলার ব্রহ্মপুত্র নদ সংলগ্ন প্রত্যন্ত চরাঞ্চলে ক্ষতিগ্রস্ত হয় ফসল। প্রতি বছরের ন্যায় এবারো বন্যায় ফসলের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এতে করে সেখানকার অনেক পরিবার অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের নারীরা বসতবাড়ির আঙ্গিনায় শাক-সবজি চাষ করে ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। পাশাপাশি ভেড়া ও হাঁস-মুরগী পালন করে ভাগ্য বদলানোর স্বপ্ন দেখছেন চরাঞ্চলের এসব দরিদ্র নারীরা। তাদের এ উন্নয়নমূখী কর্মকান্ড দেখে উৎসাহিত হচ্ছেন আরও অনেকেই।
বন্যায় চরাঞ্চলে ধানের বীজতলা, মাঠের ফসল, বাড়ির আশেপাশের শাক-সবজি ও হাঁস-মুরগীর ব্যাপক ক্ষতি হয়। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বসত বাড়ি, গো-খাদ্য ও খড়ের গাদা। এদিকে ক্ষতি কমাতে সরকারের পাশাপাশি এগিয়ে আসে বেসরকারী উন্নয়ন সংস্থা ফ্রেন্ডশিপ। সংস্থার ট্রান্সজিশন ফান্ড (এএসডি) প্রকল্পের সহায়তায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের নারীরা শুরু করে বসতভিটায় সবজি চাষ, হাঁস-মুরগী ও ভেড়া পালন। এতেই পাল্টে যেতে থাকে তাদের জীবনমান। সচেতনতামূলক কর্মকান্ডের পাশাপাশি বিভিন্ন প্রশিক্ষণ কাজে লাগান তারা। কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার সরদার পাড়া গ্রাম থেকে ইউনিয়ন পরিষদ, বাজার, হাসপাতাল এবং স্কুল-কলেজে যাওয়ার রাস্তাটি ভেঙ্গে যাওয়ায় এলাকার মানুষের যাতায়াতের জন্য সীমাহীন দূর্ভোগ সৃষ্টি হয়। সমষ্ঠিগতভাবে উদ্যোগ নিয়ে বন্যায় ভেঙ্গে যাওয়া তাদের গ্রামের রাস্তাটি মেরামত করেন।
চিলমারী উপজেলার নয়ারহাট ইউনিয়নের নাইয়ার চর এফডিএমসির সদস্য মোছা. বুলবুলি বেগম। তিনি ফ্রেন্ডশিপের ট্রান্সজিশন ফান্ড (এএসডি) প্রকল্প থেকে তিন হাজার ৬০০ টাকা মূল্যের একটি ভেড়া পেয়েছেন। এখন তার চারটি ভেড়া রয়েছে। ভেড়াগুলির বর্তমান বাজার মূল্য ১৬ হাজার টাকা। বুলবুলি বেগম বলেন, আধুনিক পদ্ধতিতে শাক-সবজি উৎপাদনের প্রশিক্ষণ পাওয়ার পর আমার বসতবাড়িতে সবজি উৎপাদন করে ৫ হাজার ১শত টাকার সবজি বিক্রি করেছি। যা আমার সাংসারিক ব্যয়ভার বহনে সহায়ক হচ্ছে এবং আমি সবজি বিক্রির ৮ হাজার টাকায় একটি ছাগল ক্রয় করেছি।
একই গ্রামের আইয়ুব আলী, সুমারী বেগম, বেহুলা খাতুন ও কছিরন বেগম বলেন, আগে হাট থেকে সার কিনে আনতাম। এখন আমরা কম্পোষ্ট সার তৈরী করে ব্যবহার করি। ফেরোমন ফাঁদ দিয়ে পোকা মারছি। সরকারি সুযোগ সুবিধা পেতে বিভিন্ন অফিসে যোগাযোগ করছি এবং গ্রামে বাল্যবিয়ে প্রতিরোধে আমরা দৃঢ় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ।
ফ্রেন্ডশিপ এর ট্রান্সজিশন ফান্ড (এএসডি) প্রজেক্টের প্রজেক্ট ম্যানেজার কৃষিবিদ মো. আশরাফুল ইসলাম মল্লিক জানান, ফ্রেন্ডশিপ লুক্সেমবার্গ এর সহায়তায় সদস্যদের আয় রোজগার নিয়মিতকরণের মাধ্যমে অর্থনৈতিক উন্নয়ন, সম্পদবৃদ্ধি এবং সমাজে সুশাসন যেমন বাল্যবিবাহ রোধ, পারিবারিক নির্যাতন বন্ধ, জাতীয় সংসদ ও সংবিধান সম্পর্কে ধারণা, জিডি করার কৌশল ইত্যাদি শিক্ষামূলক আলোচনাসহ দুর্যোগ পরিস্থিতি মোকাবেলায় সক্ষমতা বৃদ্ধি, জনগোষ্ঠীর ভৌগলিক দুর্দশাগ্রস্থতা হ্রাসকরণ এবং স্থানীয় অবকাঠামো উন্নয়নে কুড়িগ্রাম সদর, চিলমারী এবং রৌমারী উপজেলার মোট ২৪টি চরে ৭২১ জন সদস্যকে উক্ত প্রকল্প সহায়তা প্রদান করে আসছে।
চিলমারী উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা মোহাম্মদ রাশিদুল হক জানান, চিলমারী উপজেলায় ফ্রেন্ডশিপের ট্রানজিশন ফান্ড প্রকল্পের মাধ্যমে ২১১টি পরিবারকে ভেড়া প্রদান করেছে এবং প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে। এতে পরিবারগুলো ভেড়া পালনের মাধ্যমে স্বল্প সময়ে অধিক আয়ের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। ভেড়া পালনের মাধ্যমে চরাঞ্চলের মানুষ স্বাবলম্বী হবে।
আনন্দবাজার/এম.আর







