নানামুখী সংকটে বিলুপ্তির পথে দেশিয় হস্তজাত তৈরি বাঁশ-বেতের কুটিরশিল্প। বাজারে পণ্যের চাহিদা কমে যাওয়া এবং উপকরণের মূল্যবৃদ্ধিসহ নানাসংকটে এ শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে পারছেন না এ শিল্পের সঙ্গে জড়িতরা। তাই বংশপরম্পরায় পৈত্রিক এ পেশা ছাড়ছেন অনেকেই। তবে প্রশিক্ষণ ও স্বল্পসুদে ঋণ প্রদানের মাধ্যমে এ শিল্পকে টিকিয়ে রাখা সম্ভব বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
নওগাঁয় ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর মধ্যে ঋষি, তরণী, মাহালি ও বাঁশফোড় সম্প্রদায়ের মানুষ শত বছরের প্রাচিন এ পেশা আজো ধরে রেখেছেন। বাঙালির গৃহস্থালী কাজে ব্যবহৃত বাঁশের তৈরি কুলা, ডালা, খৈচালা, চালুনি, খোলসান, ফুলডালা, ঝাঁটা, দোলনা, তৈজসপত্র রাখার র্যাক তৈরি করে জীবিকা নির্বাহ করে আসছেন তারা। কালেরপরিক্রমায় নানা প্রতিকূলতায় পড়েছে এ পেশার মানুষ। এ শিল্পে সরকারি পৃষ্টপোষকতার অভাব ও ব্যাপকভাবে প্লাস্টিক সামগ্রীর ব্যবহার বৃদ্ধি পাওয়ায় বাঁশের তৈরি জিনিসপত্র বিক্রি আজ আর নেই বললেই চলে। এতে হস্তজাত এ কুটিরশিল্প এখন টিকে থাকাই অসম্ভব হয়ে পড়েছে।

নওগাঁর প্রায় সব উপজেলায় এসব সম্প্রদায়ের মানুষ বসবাস করছেন। এরমধ্যে নওগাঁর মহাদেবপুর উপজেলার শিবগঞ্জ গ্রামের নদীর বাঁধে সরকারি জায়গার উপর টিনের চালা দিয়ে কুড়েঘর তৈরি করে তরণি সম্প্রদায়ের ৫০ থেকে ৬০ পরিবারের বসবাস। তারাই যুগ যুগ ধরে পৈত্রিক পেশা হিসাবে গৃহস্থালী কাজে ব্যবহৃত বাঁশের তৈরি এসব পণ্য তৈরি করে আসছেন। জন্মের পরে বুদ্ধি হওয়ার পর থেকেই পরিবারের অন্য সদস্যের মতই তাদের সকলকেই কাজ করতে হয়। তারা মূলত কুলা, খৈচালা, চালুনি, ডালা, ফুলডালা তৈরি করে হাট-বাজারে বিক্রি করে কোনোভাবে জীবিকা নির্বাহ করেন।
অপরদিকে নওগাঁর সদর উপজেলার সান্দিড়া গ্রামের পূর্বপাড়ায় সরজমিনে দেখা যায়, গ্রামের ছেলে-মেয়ে সকলেমিলে এক উঠানে বসে বাঁশ দিয়ে তৈরি নানা হস্তশিল্প তৈরিতে ব্যস্ত। এ গ্রামে ঋষি সম্প্রদায়ের অনন্ত ৭০ পরিবারের বসবাস। তারা বাঁশের তৈরি শিশুদের জন্য দোলনা, আলনা, র্যাক, ডালি ও পোলই নিজেদের সু-নিপুন হাতে তৈরি করছেন এসব পণ্য। এসব পণ্যের আগে কদর যেমন ছিল, দামও পেয়েছেন তারা ভালো। তবে এখন এসব পণ্য তৈরির উপকরণ বিশেষ করে বাঁশ ক্রমেই উজাড় হওয়ার পথে। অন্যান্য উপকরণের মূল্যবৃদ্ধি পেলেও সেই তুলনায় বাঁশশিল্পের এ পণ্যগুলোর দাম আগের মত তারা পাচ্ছেন না। কারণ বর্তমানে প্লাস্টিকের পণ্যবাজারে কদর বাড়াই এ কুটিরশিল্প ক্রমেই হারিয়ে যেতে বসেছে। বর্তমানে এ শিল্পের সঙ্গে জড়িতরা বাপদাদার পৈত্রিক পেশাকে ধরে রেখে কোনভাবে জীবিকা নির্বাহ করে আসছেন।
শিবগঞ্জ গ্রামের ও সান্দিড়া গ্রামের দু’জন কারীগর পূজা রাণী তরনী এবং সুকুমারের সাথে কথা হলে তারা জানান, প্রতিনিয়ত অভাবের সঙ্গে সংগ্রাম করে কোনো রকমে বেঁচে আছেন তারা। অভাব যেন আজ তাদের জীবনের একটি অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাপ-দাদার পেশা। কিভাবে তৈরি করা হয় এসব পণ্য জানতে চাইলে তারা বলেন, সব ধরনের বাঁশ দিয়ে এসব পণ্য তৈরি করা সম্ভব নয়। তল্লা জাতীয় এক ধরনের বাঁশ দিয়ে এসব পণ্য তৈরি করা হয়। প্রথমেই হাট-বাজার থেকে বাঁশ ক্রয় করে এনে ছোট ছোট সাইজ করে কেটে নিয়ে পানিতে ডুবিয়ে রাখা হয়। এরপর ছোট সাইজের বাঁশগুলো মাঝা-মাঝি ফাটিয়ে পাতলা করে বাতা বের করা হয়। বাতা থেকে ছোট ছোট খিলিল তৈরি করা হয়। কোনো খিলিল গোলাকার আবার কোনো খিলিল চেপ্টা করে সুন্দর করে চেঁষে-ঘুষে তা রোদ্রে শুকিয়ে পণ্যতৈরির কাজে লাগানো হয়। প্রতিটি বাঁশ থেকে প্রকার ভেদে কুলা ৮ থেকে ৯ টি ও দোলনা ৪ থেকে ৫টি করে পাওয়া যায়। প্রতিটি বাঁশ ক্রয় এর ৭ থেকে ৮ দিন পর পূর্ণাঙ্গরূপে এসব পণ্য পাওয়া যায় বলে জানালেন তারা।
সমাজিক সংগঠন একুশে পরিষদের সভাপতি অ্যাডভোকেট ডিএম আব্দুল বারী বলেন, বেত’তো হারিয়ে গেছে। বাঁশও যাওয়ার পথে। পরিবেশ বান্ধব এ কুটিরশিল্পকে টিকিয়ে রাখতে হলে বৃক্ষরোপনের মত বাঁশেরও রোপন বৃদ্ধিসহ সহজশর্তে বিনাসুদে ঋণ প্রদান করলে ঐতিহ্যবাহী এ শিল্পকে টিকিয়ে রাখা সম্ভব বলে মনে করেন তিনি।
নওগাঁ বিসিক জেলা কার্যালয় এর উপ-ব্যবস্থাপক এবিএম আনিছুজ্জামান সব ধরনের সহায়তার আশ্বাস দিয়ে বলেন, জেলায় এ শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে তার কার্যালয় থেকে প্রয়োজনীয় সকল ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
নওগাঁর ১১টি উপজেলার বিভিন্ন স্থানে এ সম্প্রদাযের প্রায় এক থেকে দেড় হাজার পরিবার বসবাস করছেন। তাদের সঠিক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে সহজ ও স্বল্প সুদে ঋণ প্রদানের মাধ্যমে প্রাচিন এ শিল্পকে টিকিয়ে রাখা সম্ভব বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
আনন্দবাজার/এম.আর







