কুমিল্লার নাঙ্গলকোটে চলতি আমন মৌসুমে বিভিন্ন জাতের আমন ধান চাষ করেছেন কৃষকরা। তবে, গেলো কয়েকদিন আগেও বিস্তৃর্ণ ছিল সবুজের মাঠ, সে মাঠ এখন হলুদে ছেড়ে গেছে। উপজেলার পৌরসদরসহ ১৬টি ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামে শত শত হেক্টর জমির আমন ধান ক্ষেত টুংরো ভাইরাসের আক্রমণে হলুদ বর্ণ ধারণ করতে দেখা যায়। কৃষকরা স্থানীয়বাজার থেকে সার ও বিভিন্ন কীটনাশক ক্রয় করে ধান ক্ষেতে প্রয়োগ করেও ধান ক্ষেত রক্ষা করতে পারছেন না।
সরেজমিনে এবং কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কৃষকরা ইতোমধ্যে ধানের বীজতলা তৈরী, চারা রোপণ থেকে শুরু করে আগাছা দমন, সার, কীটনাশক প্রয়োগে হাজার-হাজার টাকা ব্যয় করেছেন। ব্যাপকহারে টুংরো ভাইরাসের কারণে আমন ধান ক্ষেত নষ্ট হওয়ায় কৃষকদের মাঝে চাপা কান্না বিরাজ করতে দেখা য়ায়। কৃষকরা টুংরো ভাইরাসের আক্রমণ হওয়ায় ধান ক্ষেতকে স্থানীয় ভাষায় জন্ডিস রোগ বলছেন। আবার অনেক কৃষকরা এটিকে ধানের গোড়া পচা রোগ বলছেন। কৃষকরা বিভিন্ন ইউনিয়নে দায়িত্বরত উপ-সহকারি কৃষি কর্মকর্তাদের কোন প্রকার পরামর্শ না পাওয়ার অভিযোগ করেন। পৌরসভা ও ২/১জন কৃষক উপ-সহকারি কৃষি কর্মকর্তাদের সহযোগিতা নিয়ে ধান ক্ষেতে কীটনাশক প্রয়োগ করলেও কোন উপকার হয়নি বলে কৃষকরা জানান। নাঙ্গলকোট পৌরসদরসহ ১৬টি ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামকে ৩৭ব্লকে ভাগ করে ২৭জন উপ-সহকারি কৃষি কর্মকর্তা মাঠ পর্যায়ে দায়িত্ব পালন করছেন। কৃষকদের অভিযোগ, তারা উপ-সহকারি কৃষি কর্মকর্তাদেরকে মাঠ পর্যায়ে পরামর্শের জন্য নিয়মিত পান না। তাদের সহযোগিতা ছাড়া তারা ধানচাষসহ সবজির আবাদ করেন। তাদের সহযোগিতা ফেলে তাদের ফসলী জমি নষ্টের হাত থেকে রক্ষা পেত। গত কয়েকদিন সরেজমিনে ঘুরে নাঙ্গলকোট পৌরসদরসহ বিভিন্ন ইউনিয়নের কৃষকদের সাথে কথা বলে জানা যায়, নাঙ্গলকোট পৌরসদর, বাঙ্গড্ডা, পেড়িয়া, রায়কোট উত্তর, দক্ষিণ, হেসাখাল, মক্রবপুর, আদ্রা উত্তর, দক্ষিণ, জোড্ডা পূর্ব, পশ্চিম, মৌকরা, ঢালুয়া, দৌলখাঁড়, বক্সগঞ্জ, সাতবাড়িয়া ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামের কৃষকদের ধান ক্ষেতে ব্যাপকহারে টুংরো ভাইরাসের আক্রমণে আমন ধান ক্ষেত নষ্ট হতে দেখা যায়। গত শনিবার এবং রবিবার নাঙ্গলকোট পৌরসদরের বাতুপাড়া, দৈয়ারা, বাঙ্গড্ডা, পেড়িয়া, মৌকরা, জোড্ডা পূব, পশ্চিম ও আদ্রা দক্ষিণ এবং হেসাখাল ইউনিয়ন ঘুরে মাঠের পর মাঠ আমন ধান ক্ষেত কোথায় হলুদ বর্ণ ধারণ করে একবারে নষ্ট হতে দেখা যায়। আবার কোথায়ও ধান ক্ষেত নষ্ট হওয়ার পথে রয়েছে। পেড়িয়া ইউনিয়নের শ্রীফলিয়া বৈছালী মাঠে সোহরাবের ৫৪ শতক, দুলালের ৩৬ শতক, ছাদেকের ২৪ শতক, মাষ্টার আবুল বশরের ৩৬ শতক, গোলাপের ৪২ শতক, আমির হোসেনের ৪৮ শতক, ইব্রাহিমের ৫৪ শতক, আবুল খায়েরের ৩৬ শতক, কাশেমের ৬০ শতক, শ্রীফলিয়া পূর্ব মাঠে ইয়াছিনের ৪৮ শতক, দৌলতপুর মাঠের মোহাম্মদ নবীর ৪৮ শতক, জাকের ভূঁইয়ার ৩৬ শতক, মোহাম্মদ ভূঁইয়ার ৩৬ শতক, ছেহরিয়া মাঠে সরওয়ারের ১শ ২০ শতক, নুরুল হকের ৪২ শতক, শামছুল হকের ৬০ শতক, জগত বাবুর ৬০শতক, টিপুর ৩০ শতক, বাবুলের ৩০ শতক আমন ধান নষ্ট হয়েছে। বাঙ্গড্ডা ইউনিয়নের কাদবা উত্তরপাড়ার ইমাম হোসেনের ৫৪ শতক, হালেমের ৪২ শতক, নুর হোসেনের ৩৬ শতক, আছাদের ৩০ শতক, এয়াকুবের ২৪ শতক, আমির হোসেনের ৪৮ শতক, জহিরের ৩০ শতক, মাষ্টার হানিফের ৬০ শতক, বারেকের ৩৬ শতক, মাঈন উদ্দিনের ২৪ শতক, আবাদের ৩০ শতক এবং হোসেনের ৩৬ শতক ধান ক্ষেত নষ্ট হয়েছে। জোড্ডা পশ্চিম ইউনিয়নের রাজাপাড়া মাঠে মোমেনা বেগমের ৩০ শতক, পারভিনের ২৪ শতক জিয়াউর রহমানের ৭২ শতক, গ্রাম পুলিশ সেলিমের ৩৬ শতক, করপাতি গ্রামের রকিব উদ্দিনের ৪শ শতক, আবদুর রশিদের ১শ ২০ শতক, হাছানের ১শ ৪ শতক, শফিকের ৯০ শতক, তৈয়ব আলীর ৭২ শতক, বাবুলের ১শ ২০ শতক, হোছনের ১শ শতক, জাহাঙ্গীরের ৩০ শতক, মহিনের ৩০ শতক, সোলেমানের ২শ ৪০ শতক, নুর মিয়ার ১শ ২০ শতক, কাশেমের ১শ ২০ শতক, মোশারফের ২শ ৪০ শতক, মানিকেরও ২শ ৪০ শতক জমি নষ্ট হয়েছে। পাশ্ববর্তী নোয়াপাড়া গ্রমেরও অনেক কৃষকের আমন ধান নষ্ট হতে দেখা যায়। আদ্রা দক্ষিণ চাটিতলা গ্রামের মোহাম্মদ উল্ল্যার ১শ ২০ শতক, বেলালের ৯৬ শতক, মনু মিয়ার ৯৬ শতক, আবু বক্করের ১শ ২০ শতক এবং আবদুর রহিমের ১শ ৫০শতক জমির আমন ধান নষ্ট হয়েছে। মৌকরা ইউনিয়নের তিলিপ গ্রামের খন্দকার বিল্লালের ৩০ শতক, হেকিম নুরন্নবী খন্দকারের ৩০শতক, মোবারকের ৬০শতক, চাঁন্দগড়া মাঠে আবদুল মিয়ার ৬০শতক, মজিবুল হকের ৩৬শতক, আবুল কাশেমের ৪৮ শতক, মানিকের ৬০শতক, তেলপাই গ্রামের শামছুল হকের ৩০ শতক. মনাজের ২৪ শতক ও জসিমের ৩৬ শতক জমির ধান নষ্ট হয়েছে। করপাতি গ্রামের কৃষক রকিব উদ্দিন বলেন, ৪শতক জমিতে বি আর-২২ জাতের আমন ধান রোপন করেছি। ধান রোপণ থেকে আগাছা দমন, সার ও কীটনাশক প্রয়োগে আমার এ পর্যন্ত ৬০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। আমার সব জমির ধান টুংরো পোকার আক্রমনে নষ্ট হয়ে গেছে। উপ-সহকারি কৃষি কর্মকর্তার পরামর্শে সার ও কীটনাশক প্রয়োগ করেও জমি রক্ষা করতে পারিনি। একই গ্রামের আবদুর রশিদ বলেন, আমার ১শ ২০শতক জমির আমন ধান হলুদ বর্ণ ধারণ করে সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে গেছে। কৃষি কর্মকর্তাদের কোন সহযোগিতা পাইনি। শ্রীফলিয়া গ্রামের কৃষক আবুল খায়ের বলেন, আমার ৩৬ শতক জমির ধান সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে গেছে। কৃষি কর্মকর্তাদের কোন সহযোগিতা পাইনি। আমার সম্পূর্ণ ধান নষ্ট হওয়ায় পরিবার-পরিজন নিয়ে খাওয়া-ধাওয়া অর্ধাহারে-অনাহারে কাটাতে হবে। দৌলতপুর গ্রামের মোহাম্মদ নবী বলেন আমার ৪৮শতক জমির ধান সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে গেছে। এ পর্যন্ত আমার ধান রোপণে আমার প্রায় ১১ হাজার টাকা খরচ হয়েছে।
পিপড্ডা গ্রামের কৃষক আব্দুল হান্নান বলেন,৬০ শতক জমিতে ৪৯ ধান রোপণ করি,কিস্তি নিয়ে ১২ হাজার টাকা খরচ করেছি। পুরো ক্ষেত হলুদ হয়ে গেছে। বাজার থেকে ঔষধ এনে ২ বার স্প্রে করেছি কোন উপকারে আসেনি।আমি ২০ বছর যাবত কৃষি কাজ করি কোন কর্মকর্তাকে আমি দেখিনি।
নাঙ্গলকোট উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা জাহিদুল ইসলামকে গত দুই দিনে অফিসে গিয়েও পাওয়া যায়নি, মুঠোফোনে কল দিলে আমি মিটিংয়ে আছি বলে ফোন কেটে দেন।
এ বিষয়ে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কুমিল্লার উপ-পরিচালক মিজানুর রহমান বলেন, নাঙ্গলকোট উপজেলায় রোগটি দীর্ঘদিনের সমস্যা। যেখানে ভাইরাসটি বেশি আক্রমণ করেছে তা রিকভার করা সম্ভব নয়। বীজ জাতের কারণে ভাইরাসে আক্রমণ করে বেশি। কিছু বীজ জাত চিহ্নিত করে বাদ দেয়া হবে। যদি কোন উপ-সহকারী মাঠে না থাকে তাহলে আমাকে তথ্য দিন আমি ব্যবস্থা নেব।








