- মহাজনদের হাতে পুরো তাঁতশিল্প
- তাঁত সংখ্যা সাড়ে ৪ হাজার থেকে কমে দাঁড়িয়েছে ৫১০
- তাঁতপল্লীকে টিকিয়ে রাখতে বিনাসুদে ঋণ দেওয়ার পরামর্শ
শাড়ি বাঙালি নারীদের প্রথম পছন্দ। শাড়িতেই বাঙালি নারীকে ফুটিয়ে তুলে আপন সৌন্দর্য্য। শাড়িতে ফিরে পায় তার অস্তিত্ব। আধুনিকতার ছোঁয়াতেও শাড়ির প্রতি বাঙালি নারীদের রয়েছে তীব্র আকর্ষণ। টাঙ্গাইল শাড়ির প্রতি নারীদের দুর্বলতা একটু বেশি। নারীর এ দুর্বলতা আজকের না, সেই সুদীর্ঘকালের। শাড়ির রাজধানী টাঙ্গাইলের তাঁতপল্লী। জেলার দেলদুয়ার উপজেলার চন্ডী-পাথরাইল ও তার পার্শবর্তী এলাকা নিয়ে সেই তাঁতপল্লীটি।
ঈদ-কিংবা পুজা ছাড়াও নারীদের চাহিদা পুরণে ব্যস্ত তাঁতপল্লী। সুঁতা কাটা থেকে শাড়ি বানানো, বুটি কাটা থেকে শাড়ি বিক্রির ব্যস্ততায় তাঁতপল্লীতে সবসময় উৎসব বিরাজ করে। “ সেই এলাকায়ও ভালো নেই তাঁতীরা”। এক সময় এ দেশের মসলিন ও জামদানি ছিল পৃথিবী বিখ্যাত। বিদেশি পর্যটক এসব কাপড় দেখে আকৃষ্ট হতেন। ব্রিটিশদের পর পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীও এ তাঁতশিল্পের দিকে নজর দেয়নি। এখনও শাড়িতে অগ্রণী ভূমিকা রাখছে তাঁতশিল্প। টাঙ্গাইল শাড়ির কদর উত্তরোত্তর বেড়েই চলেছে। অথচ তাঁতীদের স্বার্থরক্ষায় নেই সরকারি বেসরকারি কোন পদক্ষেপ।
কৃষিপ্রধান দেশ হলেও, গ্রামীণ শিল্প হিসেবে তাঁত টাঙ্গাইলের মানুষের আয়ের অন্যতম উৎস। তবে, শিল্পায়নের প্রভাবে এ শিল্প স্ব-মহিমায় টিকতে না পেরে, অনেকটা রুগ্ন হয়ে পড়েছে। অবর্ণনীয় দুর্ভোগ ও দুর্গতিতে ধুঁকে ধুঁকে দিনযাপন করছেন এ শিল্প সংশ্লিষ্টরা। জেলার তাঁত শিল্পীরা নিবিড় মনযোগ আর নিষ্ঠায় শ্রম দিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাজ করে যাচ্ছেন। কাপড় বিক্রির মাধ্যমে পরিবারে স্বচ্ছলতা ফেরার আশা করলেও, তাঁতীদের স্বচ্ছলতা ফিরছে না। এক সময় তাঁত চালানোর খটখট শব্দ আর ব্যাপারীদের আনাগোনায় জমজমাট থাকতো টাঙ্গাইলের তাঁতপল্লী। কালের বির্বতনে পাল্টে গেছে সেই চিত্র। এখন আর তাঁতী বা জোলাপাড়া’র সেই সুদিন নেই। অনেকেই পেশা পরিবর্তন করেছে।

কিছুদিন আগেও তাঁতপল্লীর প্রতিষ্ঠিত তাঁতী ছিলেন জগন্নাথ রাজবংশী, শচীন রাজবংশী, গুপিনাথ রাজবংশী ও দমন রাজবংশী। এরা একদিকে ছিলেন প্রতিষ্ঠিত তাঁতী অন্যদিকে ছিলেন বড় ব্যবসায়ী। পাল্লায় চলতে না পেরে ছিটকে পড়েছেন এসব তাঁতীরা। ছিটকে পড়েছেন ওদের মতো আরও অসংখ্য তাঁতী। শাড়ি ব্যবসা একটি গোষ্ঠির হাতে চলে যাওয়ায় সেই দাপটে ব্যবসায়ীদের দিন কাটছে এখন অর্ধহারে-অনাহারে।
ওই সময় জগন্নাথ রাজবংশীর ৫২টি তাঁত ছিল। শচীনের ২০টি , গুপিনাথের ছিল ১০টি আর দমনের ছিল ২০টি তাঁত। ওরা অন্যান্য তাঁতীদের পত্তন দিতেন। শাড়ির নতুনত্ব এরাই আগে আনতেন। তাঁতী আর বড় ব্যবসায়ী হিসেবে একটি পরিচিতি ছিল। অর্থনৈতিক দিক দিয়েও সমাজে একটা অবস্থান ছিল। আজ তাদের জীবনে এসেছে হতদরিদ্রতা। কথা হয় এসব পুরনো তাঁতীদের সাথে। কথায় কথায় বেরিয়ে আসে “ওরা ভালো নেই”। জগন্নাথ রাজবংশীর পৈতৃক ভিটে ছিল ২১ শতাংশ। ব্যবসা থেকে ছিটকে পড়ে পুরো ভিটে বাড়িটা কার্তিক দাসের কাছে বিক্রি করেছেন। কার্তিক ভারতে থাকায় এখনও ওই ভিটেতে থাকছেন জগন্নাথ।
মনেমন্টুর শাড়ি হাউজের পলান বসাকের কাছ থেকে পত্তন এনে ৪টি তাঁত বসালেও সচল রয়েছে একটি। কারিগরকে পারিশ্রমিক দিয়ে সপ্তাহে ৬শ টাকা উপার্জন হয়। সাংসারিক খরচ সপ্তাহে হাজার ১২শ’ টাকা । প্রতি সপ্তাহে ৫ থেকে ৬শ’ টাকা ধার দেনা করেন। বছর শেষে দেনা পরিশোধ করতে বিভিন্ন এনজিও শেষ ভরসা। এতে ক্রমশ বাড়ছে দেনা। সম্প্রতি জগন্নাথের সেই ভিটে বাড়িটি বিক্রি করবে কার্তিক। বৃদ্ধ স্ত্রীকে নিয়ে কোথায় উঠবে এটা ভেবেই কাটছে জগন্নাথের সময়।
আরেক বড় ব্যবসায়ী শচীন রাজবংশীর ১১ শতাংশের ভিটে বাড়ি ছিল। দেনা পরিশোধ করতে এখন ৩ শতাংশ আছে। বর্তমানে পলাশ বসাকের কাছ থেকে পত্তন নিয়ে থাকার ঘরে দুটি তাঁত বসালেও সচল রয়েছে একটি। এক সময়ে সেই দাপটে ব্যবসায়ী বৃদ্ধ বয়সে নিজেই বসেছে শাড়ি কানানোর পিঁড়িতে। সপ্তাহে দুটি শাড়ি বানিয়ে উপার্জন করেন ১৬শ’ টাকা। অল্প উপার্জনে চার-পাঁচজনের সংসার চলছে ডালভাতে।
শচীনের আরেক ভাই গুপিনাথের ছিল ১১ শতাংশের ভিটে। হারিয়েছে সব তাঁত। দেনা পরিশোধ করতে বাড়ি বিক্রি করে তিন শতাংশে থাকার ঘরটা তুলেছেন গুপিনাথ। শচীন আর গুপির সেই ভিটেতে চলছে রামা বসাকের তাঁত। দমনও ছিলেন তাঁতপল্লীর পুরনো তাঁতী। বাড়িতে তাঁত ছিল ২০টি। তাঁত সব শেষ। একমাত্র ছেলে সুধীর রাজবংশী এখন অন্যের বাড়িতে শাড়ি বানাচ্ছেন। বৃদ্ধ দমন এ বয়সে দিয়েছে চায়ের দোকান। কেউ কেউ ধার দেনার দায় এসব তাঁতীদের ছেলে সন্তানদের ওপর দিলেও মুলত শাড়ি ব্যবসা থেকে ছিটকে পড়ায় তাদের এমন পরিস্থিতি বলে জানালেন স্থানীয়রা।

গত কয়েক বছরে সুঁতার দাম দফায় দফায় বৃদ্ধি, ভারতের শাড়ির অনুপ্রবেশ, কারিগর ও মহাজনদের মধ্যে লাভ্যাংশের অসম বন্টন আর শ্রমিকের অভাবে অনেকে তাঁত বন্ধ হয়েছে। বিশ্ববাজারে সুঁতার দামের তুলনায় দ্বিগুন বেড়েছে দেশীয় বাজারে। তুলার দামের সাথে সুতার দামেরও সংগতি নেই। তাঁতপল্লীর তাঁত সংখ্যা ৪ হাজার ৫শ’ থেকে কমে এখন ৫১০ টি। পাথরাইল-চন্ডীতে তাঁত থাকলেও ৪ হাজার তাঁত বন্ধ। মহাজনদের হাতে চলে এসেছে পুরো তাঁতশিল্প। দেশ বিদেশি ক্রেতারা ওইসব মহাজনদের শো-রুমেই আসে শাড়ি কিনতে। সাধারণ তাঁতীদের ভাগ্য বদলের কোন সুযোগ নেই। অন্যান্য সময় তাঁতীরা যে মজুরী পায় ঈদের সামনেও একই মুজুরী। তাঁতীদেরকে ঈদের আগে মুজুরী বাড়ানো হতো, খোরাকি দেওয়া হতো, ঈদের পোশাক দেওয়া হতো। এখন এমনটা নেই। নিজের তাঁতের শাড়িও বিক্রি করতে পারে না সাধারণ তাঁতীরা। শাড়ি বিক্রির জন্য যেতে হয় ওইসব মহাজনদের কাছে। পরিশ্রম করছে সাধরণ তাঁতী। অট্টালিকা গড়ছে মহাজনরা। ফলে “ভালো নেই এখানকার তাঁতীরা।”
২০১৫ সালের ২৩ জুলাই ১৯৭৯ বাস্তবায়নে কল কারখানা কল্যাণ, পেশাগত স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠান পরিদর্শণ অধিদপ্তর থেকে সান, দো,প্রতি,পরি,টাঃ /১০৮৬ স্মারকে তাঁতশিল্পের ওপর শ্রম আইন প্রয়োগের নোটিশ আসে। শ্রম আইন ২০০৬ ইং বাংলাদেশ শ্রম সংশোধন আইন ২০১৩ ইং মোতাবেক চিঠিতে উল্লেখ ছিল, ১৯৭৯ ইং শ্রমিক কল্যাণ, পেশাগত সমস্যা ও নিরাপত্তা বাস্তবায়নে সকল তাঁতশ্রমিক, মালিক ও ব্যবসায়ীদের পৃথক লাইসেন্স করতে হবে কর্মচারীদের তথ্য উপাত্তি রেজিষ্টার বহিতে লিপিবদ্ধ রাখতে হবে, কর্মচারীদের স্থায়ীকরণ ও সিফ্ট ভিত্তিক কাজের সুবিধা দিতে হবে, অতিরিক্ত কাজের (ওভার টাইম) জন্য দ্বিগুন বেতন দিতে হবে, কাজ শুরু ও প্রস্থানের সময় রিজিষ্টারে লিপিবদ্ধ রাখতে হবে। প্রত্যেক শ্রমিককে সার্ভিসবুক চালু রাখতে হবে, চিকিৎসাভাতা দিতে হবে। শ্রমিকদের ছবিসহ আইডি কার্ড তৈরি করতে হবে, নিজস্ব উদ্যোগে কমপক্ষে পাঁচটি তাঁত থাকলে তাকে নিয়িমত কর প্রদানসহ লাইসেন্স করতে হবে।
উদ্যোগটি মালিকদের বেকায়দা মনে হলেও সাধারণ তাঁতীদের উপকারে আসতো বলে মনে করছেন সচেতন মহল। তাঁতীতের স্বার্থ রক্ষায় পাথরাইল তাঁত সমিতি থাকলেও সমিতির অধিকাংশ সদস্য এখন অন্য পেশাদাররা। এজন্য এসব ছিটকে পড়া তাঁতীদের পাশে দাঁড়ানোর মতো কেউ নেই।
দুস্থ তাঁতীদের স্বার্থ রক্ষা ও তাঁতপল্লীকে টিকিয়ে রাখতে বিনাসুদে ঋণ দেওয়ার পরামর্শ স্থানীয় সূধিজনদের। টাঙ্গাইল তাঁতপল্লীর শাড়ি ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি রঘুনাথ বসাক তাঁত কমে যাওয়ার বিষয়টি স্বীকার করেন। এ শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে পাওয়ার লোম ও ইন্ডিয়ান শাড়ির সয়লাব কমিয়ে দেশীয় শাড়ি রপ্তানী বাড়ানোর পরামর্শ দেন তিনি। শাড়ি তৈরির প্রধান কাঁচামাল সুঁতার দাম কমানোর কথাও বলেন তিনি। উৎসব ছাড়া সবসময় বাঙালী নারীদের শাড়ি পড়ারও আহব্যান জানান তিনি।
আনন্দবাজার/শহক







