- মোবাইল-কম্পিউটার ব্যবহার করছেন সজিব
কেউ চোখ থাকতেও অন্ধ। আবার কেউ অন্ধ হয়েও চেতনার আলোয় আলোকিত। তাদের মধ্যে এমনই একজন দৃষ্টি প্রতিবন্ধী শাহরিয়ার ইসলাম সজিব। সজিব বগুড়ার আদমদীঘি উপজেলার সান্তাহার পৌর শহরের নতুন বাজার এলাকার রেজাউল করিমের ছেলে। অদম্য ইচ্ছা শক্তি দৃষ্টিহীন সজিবকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। চোখে না দেখলেও মনের সাহসে তিনি শুরু করেছেন মাল্টিমিডিয়ার ব্যাবসা।
শনিবার দুপুরে উপজেলার সান্তাহার মালা সিনেমা হল এলাকায় শাহরিয়ার ইসলাম সজিবের ‘এস আর টেলিকম’ নামের মাল্টিমিডিয়া প্রতিষ্ঠানে কথা হয় তার সঙ্গে। এসময় তিনি জানান, বাবা ছিলেন সরকারি চাকুরিজীবি, এখন অবসরে। তিন ভাইবোনের মধ্যে সবচেয়ে বড় সজিব। ছোট দুই ভাই ও বোন স্কুলে পড়ে। জন্মের পর থেকে এক চোখে পৃথিবীর আলো দেখেন নি সজিব। একটি চোখের উপর ভরসা করে চালিয়ে নিতে পারতেন সকল কাজ। লেখাপড়া, খেলাধুলা ও প্রয়োজনীয় সকল কাজই করতেন অন্য আরো দশ জনের মতোই। দশ বছর বয়সী সজিব যখন ৫ম শ্রেণিতে পড়েন ঠিক তখন সহপাঠীদের সঙ্গে একদিন খেলতে যান মাঠে। ক্রিকেটের বল এসে লাগে তার সচল চোখটিতে। এতে সারা জীবনের জন্য পৃথিবীর আলো দেখা থেকে বঞ্চিত হন তিনি। বহু চিকিৎসা করেও আর দৃষ্টি ফেরানো সম্ভব হয় নি সজিবের। দু’চোখের আলো নিভে গেলেও চেতনার আলো জ¦লছিল তার ভেতরে। সেই আলোয় আলোকিত হওয়ার স্বপ্ন সজিবের। দৃষ্টিহীন সজিব হন পবিত্র কোরআনের (৫ প্যারার) হাফেজ। এরপর তিনি সান্তাহার পৌর শহরের লকোসেট জামে মসজিদে কিছুদিন মোয়াজ্জিন ও পরে ঈমামতি করেন। সেখানে সর্বশেষ তাঁর বেতন ছিল ২৫শ’ টাকা। বছর খানেক আগে কম্পিউটার সম্পর্কে অভিজ্ঞতা নিতে তিনি সান্তাহার ডিজিটাল পোস্ট অফিসে ৬ মাস মেয়াদী কোর্সে (প্রশিক্ষণ) ভর্তি হন। সেই ট্রেনিং শেষে তিনি একটি মাল্টিমিডিয়ার দোকান দেয়ার স্বপ্ন দেখেন। তবে অর্থের অভাবে সেই অসাধ্যকে সাধন করা তার পক্ষে সম্ভব হচ্ছিলোনা। অবশেষে তার মা তাসলিমা বানু তার বাবার বাড়ি থেকে পাওয়া সম্পত্তি (জমি) বিক্রি করে ছেলের হাতে দুই লাখ টাকা তুলে দেন। সেই টাকায় সজিব ব্যবসা শুরু করেন। দৃষ্টিহীন সজীব এখন তার দোকানে মাল্টিমিডিয়ার কাজের পাশাপাশি ই-পাসপোর্টের আবেদন, ভিসা প্রসেসিং ও পুলিশ ক্লিয়ারেন্সের আবেদন ফি জমা, ই-টিন সার্টিফিকেটের আবেদন, এনআইডির আবেদন ও সংশোধন, বিদ্যুৎবিল জমা ও ফ্লেক্সিলোড দেওয়ার ব্যবস্থা রেখেছেন।
স্থানীয় ব্যবসায়ী রেজাউল ইসলাম রকি বলেন, প্রতিটি কাজের পেছনেই তীব্র ইচ্ছা থাকা দরকার। ইচ্ছাশক্তি প্রবল হলে সফলতা সুনিশ্চিত। ইচ্ছাশক্তির বলেই যে কোনো অসাধ্য সাধন করা যায়। সজিব তেমনই একজন। সে দৃষ্টিহীন হলেও স্বভাবিক আরো দশজনের মতো কম্পিউটার ও মোবাইল চালাতে পারে। আমরা চাই সজিবের ব্যবসা সম্প্রসারণ হোক।
দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শাহরিয়ার ইসলাম সজীব বলেন, দোকান চালুর পর আট মাস অতিবাহিত হলো। দৃষ্টি প্রতিবন্ধী হওয়ায় অনেক খদ্দের আমার দোকানে আসতে চায়না। তবে আমি খদ্দেরদের বলতে চাই আমার ওপর ভরসা শতভাগ ভরসা রাখতে পারেন। কম্পিউটারে কাজ করতে কোনো সদস্যা হয় কি না? জানতে চাইলে তিনি বলেন, ইন্টারনেট ভিত্তিক কোনো কাজ করতে গেলে ভেরিফিকেশন কোড নিয়ে বিরম্বনায় পড়তে হয়। তবে ক্রেতাদের সহযোগিতা নিয়ে চালিয়ে নিতে পারি। তাছাড়া অন্যকোনো সমস্যা হয় না। তিনি আরো বলেন, তেমন কোনো চাওয়া পাওয়া নেই। এখন দোকান ভাড়া, বিদ্যুৎ ও ইন্টারনেট বিল দিয়ে টিকে থাকতে পারলে আলহামদুলিল্লাহ। তবে কখনো যদি সরকারি বা বেসরকারি ভাবে কোনো সুযোগ-সুবিধা পাই তাহলে মোবাইল এক্সরসরিসের মালামাল তুলে ব্যবসা সম্প্রসারণ করতে চাই।
সান্তাহার ডিজিটাল পোস্ট অফিসের কম্পিউটার ট্রেনার (অফিস অ্যাপ্লিকেশন) মিজানুর রহমান মিজান জানান, ৭০ জন ট্রেনিং নিতে আসে। তাদের মধ্যে দু’জন ছিল প্রতিবন্ধী। সজিব দু’চোখে দেখতে পারে না। তাদের জন্য ৫০% ছাড়ে ট্রেনিং দেয়া হয়। সজিবের রেজাল্ট ভালো ছিল।








