তিতাস কর্তৃপক্ষ গ্যাস না দিয়ে শুধুমাত্র পাইপলাইনের মাধ্যমে বাতাস দিয়ে কোটি কোটি টাকার বিল নিচ্ছে। এ থেকে উত্তরণের জন্য মিলগুলোতে ইভিসি মিটার সংযোগের জন্য বারংবার অনুরোধ করা হলেও তা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে না বলে অভিযোগ করেছেন বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশন (বিটিএমএ)।
গতকাল শনিবার রাজধানীর প্যান পেসিঠিক সোনারগাঁও হোটেলে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে বিটিএমএ সভাপতি মোহাম্মদ আলী খোকন এসব কথা বলেন। আরও বক্তব্য রাখেন সহ-সভাপতি ফজলুল হক, আব্দুল্লাহ আল মামুন প্রমুখ।
তিনি বলেন, দেশে ১২০০ ইভিসি মিটার আমদানি করা হয়েছে। অল্পকিছু সংখ্যক মিলে সংযোগ প্রদান করা হলেও অজ্ঞাত কারণে বেশিরভাগ মিলগুলোতেই সরকারের নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও ইভিসি মিটারের সংযোগ দেয়া হচ্ছে না।
বিটিএমএ’র তথ্য মতে, বিটিএমএ’র যেসব মিল ক্যাপটিভ পাওয়ার জেনারেশন করে তার পরিমাণ ১৭০০ মেগাওয়াটের বেশী। এর মাধ্যমে মিলগুলো সরকারকে বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। বিভিন্ন গ্যাস বিতরণ কোম্পানিগুলি গ্যাস ট্যারিফ ১০৩ থেকে ১১৬ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধির জন্য বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনে প্রস্তাব প্রেরণ করেছে। যদিও বিইআরসি’র প্রস্তাবটিকে অযৌক্তিক বলেছে।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনোমিকস অ্যান্ড ফাইনান্সিয়াল এনালাইসিস (আইইইএফএ) ২০২০ সালে প্রতিবেদনে জানায়, দেশে ৫৭ শতাংশ বিদ্যুৎকেন্দ্র অলস বসিয়ে রেখে কেন্দ্র ভাড়া দেয়া হয়। অন্যদিকে তিতাস গ্যাস কর্র্তৃপক্ষ গত ৪ বছরে ১৫০৯ কোটি টাকা মুনাফা করেছে। অলসভাবে বসিয়ে রাখা কেন্দ্রগুলোর ভাড়ার অর্থ সাধারণ মানুষকে বহন করতে হবে কেন? ২০০৯ থেকে ২০১৯ পর্যন্ত ১০ বছরে গ্যাসের ট্যারিফ বৃদ্ধি হয়েছে ৩৬১ দশমিক ৬৭ শতাংশ।
সমিতির তথ্যানুযায়ী, ৩৬১ দশমিক ৬৭ শতাংশ গ্যাস বৃদ্ধির কারণে প্রতি কেজি সুতায় মিলগুলোর বিদ্যুৎ খরচের পরিমাণ হচ্ছে ১৯ দশমিক ৮৭ টাকা, মিল ভেদে তা সামান্য কম বেশি হতে পারে। তুলার অস্থিতিশীল মূল্যের প্রেক্ষিতে মিলগুলোকে উচ্চমূল্যে তুলা ক্রয় করতে হচ্ছে যা প্রকারন্তরে তৈরি পোশাক প্রতিষ্ঠানগুলোকেই বহন করতে হচ্ছে। অথচ তৈরি পোশাক প্রতিষ্ঠানগুলি যে মূল্যে সুতা ক্রয় করছেন সে অনুপাতে তাদের ক্রেতা প্রতিষ্ঠান থেকে মূল্য পাচ্ছেন না। এমনই পরিস্থিতিতে যদি গ্যাস ট্যারিফ আবারো ১০৩ শতাংশ বা ১১৬ শতাংশের মত বৃদ্ধি করা হয় তাহলে প্রতি কেজি সুতার উৎপাদনে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ খরচ হবে যথাক্রমে ২০ দশমিক ৪৭ ও ২৩ টাকা, যা বিদ্যমান প্রতিযোগিতামূলক অবস্থানকে ধ্বংস করে দিবে এবং বৈধ ও অবৈধ আমদানি উৎসাহিত হবে।
সম্প্রতি ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ-এফবিসিসিআই কর্তৃক প্রদত্ত একটি সংবাদে উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে ঋণের কিস্তি পরিশোধের সময় না বাড়লে ৫০ শতাংশ ব্যবসায়ীই খেলাপি হবেন। গ্যাস ট্যারিফ বৃদ্ধি পেলে সুতার কেজিতে যে মূল্য বৃদ্ধি পাবে তার কারণে মিলগুলো বা অন্য যে কোনভাবে অনুপ্রবেশকৃত ইয়ার্ন ও ফেব্রিকের সাথে প্রতিযোগিতায় টিকতে না পেরে ক্রমাগত মজুদের কারণে ব্যাংকের দায়-দেনা পরিশোধসহ সংশ্লিষ্ট ইউটিলিটি ও উৎপাদন কার্যক্রমের সাথে সংশ্লিষ্ট কাঁচামাল বা খুচরা যন্ত্রাংশ আমদানি করতে ব্যর্থ হয়ে বন্ধের সম্মুখীন হবে।
এখাতে প্রত্যক্ষভাবে কর্মরত জনগোষ্ঠীর সংখ্যা ১ মিলিয়নের (১০ লাখ) মত যার ৬০ শতাংশের বেশী নারী শ্রমিক। প্রাইমারি টেক্সটাইলখাতে রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাক খাতের প্রবৃদ্ধি টেকসই ও অব্যাহত রাখার জন্য ক্রমাগতভাবেই এ খাতে নতুন নতুন বিনিয়োগ হচ্ছে। ইতোমধ্যে টেক্সটাইল স্প্রিনিংয়ে প্রায় ৬০০০কোটি টাকার বিনিয়োগ দৃশ্যমান। এছাড়াও ২০২৩ সালের মধ্যে ন্যূনতম ২৫টি মিল প্রতিটি প্রায় ১ লক্ষ স্পিন্ডিল বিশিষ্ট অর্থাৎ মোট ২৫ লক্ষ স্পিন্ডিল উৎপাদন আসবে বলে আশা করছি। বিনিয়োগের জন্য ২.৫ বিলিয়ন ইউএস ডলারের প্রয়োজন হবে। এর ফলে প্রায় ১ লক্ষ অতিরিক্ত নতুন কর্মসংস্থানের সৃষ্টির আশা করা যাচ্ছে। এখাতটিকে আবর্তিত করে ব্যাংক, বিমা, শিপিং, পরিবহণ, হোটেল, প্রসাধনীসহ অন্যান্য অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হচ্ছে। তাই এখাতটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর। ইতোমধ্যেই বিগত তিন বা তারও বেশি সময় যাবত পর্যায়ক্রমে বর্ধিত গ্যাস ট্যারিফে গ্যাস বিল প্রদান করা হচ্ছে। অথচ প্রায়শই মিলগুলো তাদের নির্ধারিত পিএসআই এ গ্যাস পাচ্ছে না।
গ্যাস সংকট মোকাবিলার জন্য সরকার এলএনজি আমদানির বিষয়টি উত্থাপন করে বিগত সময়ে গ্যাস ট্যারিফ বৃদ্ধি করেছে। বাস্তবতা বিবেচনায় বর্ধিত গ্যাস ট্যারিফ মেনে নিয়েছি কিন্তু পরবর্তীতে এলএনজি আমদানি করে গ্যাস পাইপলাইনে সরবরাহ করা হলে কিছুদিনের জন্য গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতি স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু এর পরে আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজি’র উচ্চ মূল্যের অজুহাতে এলএনজি আমদানি বন্ধ থাকে। এলএনজি’র আমদানি যদি অব্যাহত থাকতো তাহলে আন্তর্জাতিক বাজারের এলএনজির বিভিন্ন সময়ের মূল্য গড় করলে হয়তো এলএনজির মূল্য একটি গ্রহণীয় পর্যায়ে থাকত ফলে গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতিও স্বাভাবিক হতো।
গ্যাসের বিদ্যমান সরবরাহ সংকট অব্যাহত এবং কোন কারণে গ্যাস ট্যারিফ বৃদ্ধি করা হয় তাহলে সামগ্রিক টেক্সটাইল ও ক্লথিংখাত যে ঝুঁকির মধ্যে পড়তে পারে নিম্নে তা প্রধানমন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রীর জ্বালানি বিষয়ক উপদেষ্টা ও বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী নিকট তুলে ধরা হয়। সেগুলো হলো- ১. সুতার মূল্য ২ থেকে ৫ সেন্ট পর্যন্ত বৃদ্ধি পেলে স্থানীয় সুতা ক্রয়ের ক্ষেত্রে তৈরি পোশাক প্রতিষ্ঠানগুলো আপত্তি জানাতে থাকে। তাই এ ক্ষেত্রে গ্যাস ট্যারিফ যদি ১০৩ থেকে ১১৬ শতাংশ বাড়লে স্থানীয় স্পিনিং মিলগুলি তাদের তৈরি সুতা বাজারজাতকরণ ঝুঁকির মধ্যে পড়বে। ২. ইয়ার্ন ও ফেব্রিকের সাপ্লাই চেইন-জি ডিসরাপশন হবে। ৩. বিদ্যমান বিনিয়োগ অনিশ্চিত অবস্থার মধ্যে পড়বে। মিলগুলো সময় মত ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হবে, ফলে বিদ্যমান কর্মসংস্থান বিঘ্নিত হয়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হবে। ইতোমধ্যে নতুন ২.৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বিনিয়োগ ২০২৩ সনের মধ্যে বাস্তবায়নের আশাবাদ করা হয়েছে,বর্তমান গ্যাস সংকট বিবেচনায় নিয়ে উল্লিখিত বিনিয়োগ নাও হতে পারে। ফলে ইতোমধ্যে উক্ত বিনিয়োগের জন্য যে প্রক্রিয়া নেয়া হয়েছে তা বাধাগ্রস্তসহ সম্ভাব্য বিনিয়োগ অপবিনিয়োগে পরিণত হতে পারে। ফলে প্রধানমন্ত্রীর ২০৪১ সনের মধ্যে বাংলাদেশকে উচ্চ আয়ের দেশে পরিণত করার স্বপ্নটি ঝুঁকির মধ্যে পড়বে। ৪. বিদ্যুতের মূল্য বৃদ্ধিতে স্থানীয় ক্ষুদ্র ও মাঝারি টেক্সটাইল মিলগুলো বর্ধিত বিদ্যুতের মূল্যের সাথে তাদের তৈরি ফেব্রিকের মূল্য সমন্বয় করতে পারছে না বিধায় অবৈধ বাজারজাত উৎসাহিত হবে।
গ্যাস সংকট মোকাবিলায় ৫ দফা পদক্ষেপের অনুরোধ করা হয়। ১. অনতিবিলম্বে ক্যাপ্টিম পাওয়ার জেনারেশন সংশ্লিষ্ট মিলগুলোতে ইভিসি মিটার স্থাপন ও তার ভিত্তিতে বিল পরিশোধের ব্যবস্থা। ২. সারের চাহিদা বিকল্পভাবে অর্থাৎ আমদানির মাধ্যমে পূরণ করা সম্ভব, সেহেতু অন্তর্বর্তীকালীন ব্যবস্থা হিসাবে সার কারখানায় সরবরাহকৃত গ্যাস টেক্সটাইল খাতের মিলগুলোতে সরবরাহের ব্যবস্থা। ৩. তিতাস কর্তৃপক্ষ বিগত ৩/৪ বৎসর যাবত মুনাফা করছে, তাই তাদের মুনাফাকৃত অর্থের একটি অংশ এলএনজি’র আমদানিতে ব্যয়ের মাধ্যমে এলএনজির মূল্যকে সহনীয় পর্যায়ে রাখাসহ এলএনজির ফ্রিকোয়েন্ট ইম্পোর্ট নিশ্চিত করা। ৪. গ্যাস সংশ্লিষ্ট অভিযোগ পাওয়ার সাথে সাথে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কর্তৃক বিষয়টি জনগুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা করে দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ এবং এ ক্ষেত্রে কোন কর্মকর্তার গাফিলতিতে যদি কোন মিলের সার্বিক উৎপাদন ব্যাহত হয় তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ। একই সাথে গ্যাসের অপব্যবহারে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি/মিলের বিরুদ্ধে যদি কোন অভিযোগ পাওয়া যায় এবং তা প্রমাণিত হয় তাহলে তার বিরুদ্ধেও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ। ৫. মিলের অনুকূলে ইতোমধ্যেই গ্যাস সংযোগের জন্য ডিমান্ড নোট ইস্যু করা হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট মিল কর্তৃক ডিমান্ড নোটের অর্থ পরিশোধ করা হয়েছে সংশ্লিষ্ট মিলগুলোতে অনতিবিলম্বে গ্যাস সংযোগ প্রদান করতে হবে।
আনন্দবাজার/এম.আর








