বছরের প্রথম কালবৈশাখী--
- গরমের তীব্রতা কমায় স্তস্তি
দেশের বিভিন্ন জেলার ওপর দিয়েও বয়ে গেছে কালবৈশাখী ঝড়। এতে গরমের তীব্রতা কমায় স্বস্তি পেয়েছে মানুষ। তবে ঝড় ও শিলা বৃষ্টিতে ক্ষেতের ফসলসহ বিভিন্ন ফল বাগানের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। বিভিন্ন জেলায় হতাহতের ঘটনাও ঘটেছে। আমাদের প্রতিনিধিদের পাঠানো প্রতিবেদন।
বিভাগীয় প্রতিনিধি, রংপুর
দেশের বিভিন্ন জেলার মতো রংপুর বিভাগের ৮ জেলার ওপর দিয়েও বয়ে গেছে কালবৈশাখি ঝড়। এতে গরমের তীব্রতা কমায় স্বস্তি পেয়েছে মানুষ। তবে ক্ষেতের ফসল ভাবিয়ে তুলেছে কৃষকদের। রংপুর অঞ্চলে বুধবার ভোর ৪টা থেকে শুরু হয় ঝড় ও বৃষ্টি। চলে প্রায় ২০ থেকে ২৫ মিনিট। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে রংপুর বিভাগের ৮ জেলায় ১৬ লাখ ৮৯ হাজার ৪৯০ হেক্টর জমিতে বোরো ধান আবাদ করা হয়েছে। হঠাৎ কালবৈশাখিতে ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ ধান নুয়ে পড়েছে। কিছুদিনের মধ্যেই কৃষকরা ধান কাটা-মাড়াই শুরু করতেন। এমন সময় ঝড়ে তাদের বড় ক্ষতি হয়ে গেল।
মিঠাপুকুর উপজেলার মিঠিপুর গ্রামের কৃষক আফজাল হোসেন বলেন, আমি প্রায় ১৫ বিঘা জমিতে ধানের আবাদ করেছি। ভোররাতের ঝড়ে আমার জমির সব ধানের শিষ মাটিতে পড়ে গেছে। আর ২০ থেকে ২৫ দিন পরেই ধান কাটা শুরু করতাম। এই সময় ঝড়-বৃষ্টিতে ক্ষতি হয়ে গেল। ধান কাটতে এখন বাড়তি খরচ হবে। ফলনও কিছুটা কম হতে পারে।
কাউনিয়া উপজেলার মধুপুর গ্রামের কৃষক অজয় কুমার আট বিঘা জমিতে ধান লাগিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘ধানের শীষ মাটিতে পড়ে যাওয়ায় দানা মাটির সঙ্গে লেগে পড়ে যেতে পারে। এমন ধান কাটতে শ্রমিকরা বেশি মজুরি নেবে।’ একই কথা জানান কালিগঞ্জ উপজেলার শিয়াল খোওয়া গ্রামের চাষি জুয়েল হোসেন এবং বান্দেরকুড়া গ্রামের সাদ্দাম হোসেনও।
ধানের ক্ষতির বিষয়ে জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের রংপুরের অতিরিক্ত পরিচালক এমদাদ হোসেন বলেন, ‘অধিকাংশ জমির ধান আধাপাকা হওয়ায় খুব বেশি ক্ষতি হবে না। তবে এই ঝড়বৃষ্টিতে আমের বেশ উপকার হয়েছে। বৃষ্টিতে আমের বোঁটা শক্ত হবে। এতে অনাবৃষ্টিতে আম ঝরে পড়বে না। রোগবালাইও কম হবে।’ ভোররাতে ঝড়-বৃষ্টির পর সারা দিনই আকাশ মেঘলা রয়েছে।
রংপুর আবহাওয়া অফিসের সহকারি আবহাওয়াবিদ মোস্তাফিজার রহমান জানান, কালবৈশাখির প্রভাবে দিনের বেলায় আকাশ মেঘলা আছে। দমকা হাওয়ার সঙ্গে ভারী বজ্রসহ বৃষ্টি হতে পারে।
কুমিল্লা ব্যুরো
কুমিল্লার মুরাদনগরে কালবৈশাখী ঝড়ে সিএনজিচালিত অটোরিকশার ওপর গাছ পড়ে শিশু মিয়া (৬৫) নামে এক বৃদ্ধ নিহত হয়েছেন। এ সময় শিশুসহ আরও চারজন আহত হয়েছেন। গতকাল সকাল ৮টার দিকে উপজেলার বাঙ্গরাবাজার থানার শলফা এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। শিশু মিয়া বাঙ্গরা থানা এলাকার ঘোষঘর গ্রামের মৃত নায়েব আলীর ছেলে।
বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন বাঙ্গরাবাজার থানা পুলিশের উপ-পরিদর্শক রনি চৌধুরী। তিনি বলেন, সকালে হঠাৎ কালবৈশাখী ঝড় শুরু হলে একটি গাছ চলন্ত অটোরিকশার ওপর পড়ে। এ সময় চালকসহ ৫ জন আহত হয়। হাসপাতালে নেওয়ার পথে বৃদ্ধ শিশু মিয়া মারা যায়। আহতদের মধ্যে তার নাতি হোসাইনসহ আরও চারজন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। গাছটি সড়ক থেকে সরানোর কাজ চলছে।
কুমিল্লা আবহাওয়া অফিসের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. ইসমাইল ভূঁইয়া জানান, বুধবার সকালে কালবৈশাখী ঝড়ের সময় বাতাসের গতিবেগ ঘণ্টায় ৬০ কিলোমিটার রেকর্ড করা হয়েছে। রাত ৩টা থেকে সকাল ৯টা পর্যন্ত বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে ৩০ মিলিমিটার। আরও ঝড়-বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে।
চট্টগ্রাম ব্যুরো
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড থেকে ছেড়ে আস একটি স্পিডবোট কালবৈশাখী ঝড়ের কবলে পড়ে সন্দ্বীপের গুপ্তছড়া ঘাটের কাছে ডুবে যায়। এ ঘটনায় একজনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। তবে কতজন নিখোঁজ রয়েছেন তা জানা যায়নি। গতকাল বুধবার সকাল সাড়ে ৯টার দিকে কালবৈশাখী ঝড়ের কবলে পড়ে স্পিডবোটটি উল্টে যায় বলে জানিয়েছেন গুপ্তছড়া ঘাটের ইজারাদার মো. আনোয়ার। তিনি বলেন, সীতাকুণ্ড থেকে সন্দ্বীপের উদ্দেশে ছেড়ে যাওয়া একটি স্পিডবোট কালবৈশাখী ঝড়ের কবলে পড়ে গুপ্তছাড়া ঘাটের কাছাকাছি এসে উল্টে যায়। ভালো আবহাওয়ার মধ্যেই স্পিডবোটটি ছেড়ে গিয়েছিল। এখন পর্যন্ত একটি শিশুর লাশ উদ্ধার করা হয়েছে।
তিনি বলেন, স্পিড বোটে ২০ জনের মতো যাত্রী ছিলেন। কেউ নিখোঁজ আছে কি-না তা জানার জন্য আমাদের উদ্ধার অভিযান চলছে। কোস্টগার্ডের পূর্ব জোনের জোনাল কমান্ডার ক্যাপ্টেন কাজী শাহ আলম বলেন, সন্দ্বীপে গুপ্তছড়া ঘাটের কাছে একটি স্পিডবোট মিসিং আছে শুনে অভিযান চলছে। তবে এ ঘটনায় কতজন নিখোঁজ আছে বা কতজনকে উদ্ধার করা হয়েছে তা এখনো জানি না।
জামালপুর
জামালপুরে কালবৈশাখী ঝড়ের তাণ্ডবে ব্যপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। গাছপালা ও বৈদ্যুতিক খুঁটি উপড়ে বন্ধ হয়ে পড়েছে বিদ্যুৎ সরবরাহ ও যান চলাচল। শিলা বৃষ্টি ও প্রবল বাতাসে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে বেশকিছু ঘরবাড়ি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। নষ্ট হয়ে গেছে বিভিন্ন ফসল ও শাক সবজির ক্ষেত। মঙ্গলবার ভোরে কালবৈশাখী ঝড় এই তাণ্ডব চালায়।
কালবৈশাখী ঝড়ের কবলে শহরের আমলাপাড়া এলাকায় প্রধান সড়কের ওপর গাছ ও ২টি বিদ্যুতের খুঁটি উপড়ে পড়ে। এতে বন্ধ হয়ে যায় শহরের প্রধান সড়কে যান চলাচল ও বিদ্যুৎ সরবরাহ। মঙ্গলবার ভোর ৫টায় শুরু হওয়া কালবৈশাখী ঝড় ১৫ মিনিট ধরে এই তান্ডব চালায়। বেলা ১১টার দিকে শহরের অন্যান্য এলাকায় বিদ্যুৎ পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলেও আমলাপাড়া ও এর আশপাশের এলাকায় বিকেল পর্যন্ত বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রয়েছে।
এছাড়াও জামালপুর সদর উপজেলার শরীফপুর ইউনিয়নের উপর দিয়ে বয়ে যাওয়া কালবৈশাখী ঝড়ে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। ভোররাতে শরীফপুর ইউনিয়নের বেড়া পাথালিয়া, রঘুনাথপুর, বেপারিপাড়া, শ্রীরামপুর ও গোদাশিমলার উপর দিয়ে বয়ে যাওয়া কালবৈশাখী ঝড়ে শতাধিক কাচা পাকা ঘর, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ঝড় কবলিত এলাকায় রাস্তার উপর গাছপালা পড়ে যোগাযোগের বিঘ্ন ঘটছে, বিচ্ছিন্ন রয়েছে বিদ্যুৎ সংযোগ। প্রবল বাতাসের সাথে শিলা বৃষ্টি হওয়ার কারণে কৃষকের কাচা, আধা-পাকা ধান, সবজি, লিচু ও আম বাগানের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।
সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা লিটুস লরেন্স চিরান জানান, পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে প্রশাসন ঝড় কবলিত এলাকায় কাজ করছে। বিভিন্ন দপ্তরের মাধ্যমে ঝড়ের কবলে ক্ষতিগ্রস্থ এলাকার ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নির্ণয় করা হচ্ছে। পরবর্তীতে ক্ষতিগ্রস্থদের সহায়তা দেয়া হবে।
নওগাঁ প্রতিনিধি
নওগাঁয় কালবৈশাখী ঝড়ের সঙ্গে বৃষ্টি হওয়ায় আমের উপকার হলেও ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে ধানের। বুধবার ভোর ৪টার দিকে কালবৈশাখীর তাণ্ডব শুরু হয়। সরেজমিনে দেখা যায়, শেষ রাতে ঝোড়ো হাওয়ায় মাঠের প্রায় ৯০ শতাংশ ধান মাটিতে নুইয়ে পড়েছে। এতে করে ধানচাষিদের গুনতে হবে বাড়তি টাকা। রানীনগর উপজেলার বড়খোল গ্রামের ধানচাষি সাদ্দাম হোসেন বলেন, বুধবার শেষ রাতের ঝড় আর বৃষ্টিতে ১২ বিঘা জমির আধাপাকা ধানের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। আর কিছু দিন পরে ধান কেটে ঘরে তোলা হবে। কিন্তু হঠাৎ কালবৈশাখী ঝড়ে জমির সব ধানগাছ মাটিতে পড়ে গেছে। এখন এই জমির ধান কাটতে আমাকে বাড়তি টাকা গুনতে হবে।
সদর উপজেলা ও রানীনগর উপজেলার ধানচাষিরা জানায়, আমরা মাথার ঘাম পায়ে ফেলে অনেক কষ্ট করে ইরি-বোরো ধান চাষ করেছি। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় মাঠে এবার ধানের ফলন ভালো ছিল। সবে মাত্র মাঠে ধান পাকতে শুরু করেছে। কিছু মাঠে ধান কাটা মাড়াই শুরু হয়েছে। এক সপ্তাহের মধ্যে এই এলাকাগুলোতে ধান কাটার ভরা মৌসুম শুরু হয়ে যেত। কালবৈশাখী ঝড় ও বৃষ্টিতে আমাদের মাঠের ধান সব জমির সঙ্গে লেগে গেছে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক শামছুল ওয়াদুদ বলেন, মাঠের প্রায় সব ধান জমিতে শুয়ে পড়েছে। তবে পাকা এবং আধা পাকা হওয়ায় ধানের খুব একটা ক্ষতি হবে না। তিনি আরও বলেন, এই বৃষ্টির কারণে আমের অনেক উপকার হবে বলে মনে করি।








