বাউল সম্রাট শাহ আব্দুল করিম শোষণ ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে ছিলেন সব সময়ই সোচ্চার। সেটা তিনি প্রকাশ করেছেন তার লেখা গানে। তাইতো তিনি বলতে পেরেছিলেন-
‘বাউল আব্দুল করিম বলে সূক্ষ্ম রাস্তা ধরো,
শোষণমুক্ত সমাজ গড়ে বাঁচার উপায় করো’।
(বাউল সম্রাট শাহ আব্দুল করিম)
দরিদ্র জনগোষ্ঠীর অধিকার আদায়ের সংগ্রামে সংগঠিত করার জন্য সকল ধর্মের মানুষকে আহ্বান জানিয়েছেন বাউল সম্রাট শাহ আব্দুল করিম। গেয়েছেন,
‘কৃষক মজুর ভাই, হিন্দু-মুসলিম প্রভেদ নাই
বাঁচার মতো বাঁচতে চাই সবাই বলরে’।
সম্প্রীতির সহাবস্থান গড়ে তুলেছেন তিনি তার চিন্তা চেতনা ও গানে গানে। নানান দাবিতে উপনিবেশিক আমল থেকেই পশ্চিমা শাসকগোষ্ঠীর শোষণ নির্যাতনের বিরুদ্ধে এবং স্বাধীন বাংলাদেশে বিভিন্ন সময়ে অসংখ্য আন্দোলন সংগঠিত হয়েছে। এসব আন্দোলনে নানা ধরনের পেশাজীবী, রাজনৈতিক, সামাজিক নেতৃবৃন্দের যেমন অবদান ছিল, তেমনি অবদান ছিল সংস্কৃতিকর্মীদের। আন্দোলনের উদ্দেশ্য গণমানুষের কাছে ছড়িয়ে দিতে এবং তাদের সচেতন করে তোলার ক্ষেত্রে সংস্কৃতি কর্মীদের অবদান সবসময়ই অগ্রগণ্য। জনগণকে উদ্বুদ্ধ করতে সংস্কৃতি কর্মীরা সবসময়ই একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকেন। বাউল সম্রাট শাহ আব্দুল করিমের ভূমিকা সেক্ষেত্রে স্মরণীয়।
সিলেট অঞ্চলে তেমনি একটি আন্দোলন হয়েছিল ১৯৫৪ সালে। সিলেটের হরিপুরে আবিষ্কৃত হয়েছিল তেল ও গ্যাস ক্ষেত্র। সেই তেল গ্যাস ক্ষেত্রে জমি অধিগ্রহণ করার স্বার্থে দেশীয় দালাল গোষ্ঠীর সাথে আঁতাত করে সাম্রাজ্যবাদ গোষ্ঠীর অপতৎপরতা শুরু হয়েছিল। তখন দেশের প্রগতিশীল নাগরিক এর প্রতিবাদে সোচ্চার হয়েছিলেন। প্রত্যন্ত অঞ্চলে গ্রামে গঞ্জে মানুষজনকে সচেতন ও আন্দোলনে সম্পৃক্ত করার জন্য প্রচারনা শুরু হয়। সেই সময় সিলেটের সুনামগঞ্জের বাউল শাহ আব্দুল করিম ‘তেল চোরা’দের নিয়ে একটি গান লিখেন এবং বিভিন্ন জায়গায় গেয়ে বেড়ান। গানটি ছিল এরকম-
‘হরিপুরে হরিলুট কেন, দেশবাসী কি খবর জানো;
তেলচোরা তেল নিল শোন, এদেশকে করতে চায় শ্মশান’।
বাউলের এই গানে ফুটে ওঠেছিল জাতীয় সম্পদ রক্ষার তাগিদ। দেশের জন্য খনিজ সম্পদ কতটুকু মূল্যবান, তিনি তাঁর গানে তা ফুটিয়ে তুলেছিলেন। তিনি আরো বলেন-
‘এইভাবে তেল দেওয়া যায় না, দেশবাসী তা মানতে চায় না, করেন সবাই বিবেচনা, এই তেল মায়ের দুধের সমান, সম্পদ দেশবাসীর হয়, ব্যক্তিগত মালিক কেউ নয়, রয়েছে তেল চোরারই ভয়, দেশবাসী হও সাবধান...’।
বাউল সম্রাট শাহ আব্দুল করিম সেই দেশ ও দেশের মানুষের কথা, শোষিত মানুষের কথা ভেবেছিলেন। আর ভেবেছিলেন বলেই নিজেই গান লিখে তা জনগণের সামনে তুলে ধরেছেন। মানুষকে এভাবেই তিনি শোষণের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়েছিলেন গানে গানে। বর্তমান সময়ে এসেও গানের কথাগুলো যদি বিবেচনা করি তাহলে মনেই হয় না এই গানের রচয়নকাল ১৯৫৪। বাউলের সেই গানে সাম্রাজ্যবাদী শোষকদের চরিত্র ও ষড়যন্ত্র অত্যন্ত সহজ ভাষায় প্রকাশিত হয়েছিল এবং একই প্রকাশ পেয়েছে দেশের প্রতি গভীর ভালোবাসা। সহজ সরল ভাষার গ্রাম বাংলার মাটির গান গণমানুষের হৃদয়ে নাড়া দিয়েছিল গভীরভাবে।
সুনামগঞ্জ জেলার দিয়াই উপজেলার ধল আশ্রম জন্মগ্রহণ করেন বাউল সম্রাট শাহ আব্দুল করিম। তার জন্ম, বেড়ে ওঠা, মরমী সাধকদের সংস্পর্শে বাউল হয়ে ওঠা সকল কিছুই এ গ্রামে। দরিদ্র পরিবারের বড় সন্তান হওয়ায় পরিবারের নানান সংকট-সমস্যা, জমিদার, জোতদার, মহাজনদের অত্যাচার, নির্যাতন, শোষণ সকল কিছুই প্রত্যক্ষ করেছেন নিজ চোখে। নিজের দুঃখ কষ্টের মধ্য দিয়ে তিনি অনুভব করতে পেরেছিলেন দরিদ্র মানুষের ব্যাথা বেদনা। সারাজীবন শোষিত মানুষের পক্ষে কথা বলেছেন, গান গেয়েছেন। সারাজীবন লড়াই করেছেন দারিদ্র্যের সাথে।
কখনো এ লড়াই জমিদারের সাথে, কখনো গ্রামের প্রতিক্রিয়াশীল ধর্মান্ধ গোষ্ঠীদের সাথে। তার রচিত গানে তিনি এ সকল সংকট, অত্যাচাআর, নির্যাতন ও শোষণ ফুটিয়ে তুলেছেন সুন্দর ভাবে যা দিয়ে জানতে পারি তিনি কেমন সমাজ প্রত্যাশা করেছিলেন, তিনি কেমন মনের মানুষ ছিলেন। বাউল সম্রাট শাহ আব্দুল করিম ভাবতেন এবং স্বপ্ন দেখতেন একটি শোষণহীন সমাজব্যবস্থার। যে সমাজে একজন কৃষক তার ফসলের ন্যায্য হিস্যা পাবে, একজন শ্রমিক তার ন্যায্য মজুরি পাবে, যে সমাজ জন্ম নেওয়া একটি শিশুর মৌলিক অধিকারের নিশ্চয়তা দিবে, যে সমাজে পরিবার সমেত মাসে ৭দিন অনাহারে কাটাতে হবে না। যে সমাজে গরীব ও খেটে খাওয়া মানুষ। মাথা উঁচু করে বাঁচতে পারে। তার এইসমস্ত চিন্তা ভাবনা প্রকাশ পেয়েছিল তার সহজ সরল ভাষায় লেখা গানে। তিনি মানুষকে ভালোবাসতেন, তিনি ছিলেন গণমানুষের গায়েন। মানুষের দুঃখ দুর্দশার নানা চিত্র তার গানে ফুটে উঠতো, গানের সুরের সাথে ভেসে আসতো অন্তর্নিহিত কষ্ট।
শোষণের যাঁতাকলে পিষ্ট গ্রাম বাংলার সাধারণ মানুষের দীর্ঘঃশ্বাস ফুটে উঠেছিল তার গানে-
‘এই কি তোমার বিবেচনা, কেউ যে খায় মাখনছানা
কেউর মুখে অন্ন জুটে না, ভাঙাঘরে ছানি নাই’
বাউল আব্দুল করিম রাজনৈতিকভাবে সচেতন ছিলেন। ১৯৫৪ সালে মওলানা ভাসানীর আহ্বানে কাগমারী সম্মেলনে যোগ দিয়ে গণসঙ্গীত পরিবেশন করেন। পরবর্তীতে দেশের নানা জায়গায় যুক্তফ্রন্ট এর প্রচারণায় তিনি ছিলেন নিত্যসঙ্গী। তবে সবকিছু ছাপিয়ে তার গন্তব্য ছিল মানুষ। মানুষের মধ্যেই তিনি অরূপের সন্ধান করতেন। তিনি সর্বদাই গরীব দুঃখী মানুষের কথা ভাড়তেন, তাদের কথা বলতেন। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে তার ভাবনায় শোষণহীন সমাজ গড়ে তোলার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন। তার গানের মধ্যেই সে ভাবনার প্রতিফলন ঘটেছিল-
‘স্বাধীন বাংলায় রে বীর বাঙালি ভাই
শোষণহীন সমাজব্যবস্থা গড়ে তোলা চাই’।
শাহ আব্দুল করিম ৭২-এর সংবিধানের চার মূলনীতি নিয়েও তার ভাবনা প্রকাশ তার গানে গানে-
‘গণতন্ত্র সমাজতন্ত্র, এই ছিল তার মহামন্ত্র
ধর্ম নয় শোষণের যন্ত্র, নিরপেক্ষ সমুদয়’।
কিন্তু স্বাধীনতা উত্তর দেশব্যাপী হত্যা, নির্যাতন, লুন্ঠণ, শোষণ-বৈষম্যের চিত্র দেখে তিনি যারপনাই হতাশ হন। ‘ভেবেছিলাম একদিন দেশ হবে স্বাধীন, এখন শুভদিন আসতে পারে শোষকের মন্ত্রণা বিষম যন্ত্রণা, প্রাণে সহেনা দুঃখ বলব কারে’।
মানুষের দুঃখ বেদনাকে তিনি রাধাকৃষ্ণের বিরহ সঙ্গীতে দিয়েছেন অনন্য রূপ। শোষণ বঞ্চনার বিরুদ্ধে হয়েছেন স্পষ্টভাষী। তিনি মানুষের জন্যই গান বাঁধতেন। দৃশ্যমান পুরস্কার বা সম্মাননা এসব তার কাছে ছিল গৌন। মানুষের ন্যায্য অধিকার থেকে যে গোষ্ঠী মানুষকে বঞ্চিত করতে চায় তাদের বিরুদ্ধে তিনি ছিলেন সোচ্চার। মুক্তিযুদ্ধকালে দেশবিরোধী রাজাকারের নির্যাতনের কথাও তিনি বলে গেছেন তার গানে।
‘হানাদার বাহিনী আর দালাল রাজাকার
ধনরত্ন লুট করে নেয়, মা বোনদের ইজ্জত মারে’।
বাউল সম্রাট শাহ আব্দুল করিমের গানে ও কর্মে আমরা তার শোষণহীন সমাজ ভাবনার প্রকাশ দেখতে পাই স্পষ্টভাবে। সব সময় তিনি ছিলেন শোষিতের পক্ষে আর শোষকের বিরুদ্ধে।








