- প্রযুক্তিনির্ভরতা কমাবে গরু-ছাগল খামারের ব্যয়
সফল খামারি রাসেল ঢালি। তার খামারে রয়েছে ২৫টি গরু ও ৫০টি ছাগল। ব্যাংকার হওয়ার স্বপ্নে বিভোর থাকা রাসেল এখন একজন সফল উদ্যোক্তা। তার প্রতিষ্ঠিত খামারের নাম রাসেল ডেইরি ফার্ম। এ খামারে গরু-ছাগল পালন, দুধ বিক্রি, গোবর, বায়োগ্যাস প্ল্যান্ট, কেঁচো দিয়ে জৈবসার প্রস্তুত করে নিজেকে একজন প্রতিষ্ঠিত খামারি হিসেবে সুপ্রতিষ্ঠিত করেছেন তিনি ।
লক্ষীপুরের রায়পুর উপজেলার মেঘনা নদী অধ্যুষিত চরাঞ্চল এলাকা, উত্তর চরবংশী ইউনিয়নের চরবংশী গ্রামে রাসেলের ডেইরি ফার্মটির অবস্থান। রাসেল ঢাকায় একটি প্যাথলজিতে টেকনেশিয়ানের চাকুরি করেন। প্রতি শুক্র ও শনিবার বাড়িতে গিয়ে পরিবারের সদস্যের সঙ্গে খামারটির পরিচর্যা করেন তিনি। কৃষক পরিবারের সন্তান যুবক রাসেলের গরু ও ছাগল পালন দেখে অনেকেই খামার গড়ার স্বপ্ন দেখছেন।
প্রায় ৪০ শতাংশ জমিতে খামারটি গড়ে তোলা হয়েছে। খামারে সারি সারি বাঁধা রয়েছে বকনা গরু ও ছাগল। একটি গাভী ও একটি ছাগল থেকে বংশবৃদ্ধি। সেই ২০১০ সালে ফিজিয়ান জাতের একটি গাভী থেকেই প্রজনন সম্প্রসারণ শুরু। বর্তমানে খামারে দুটি ষাঁড়, ১৫টি গাভি ও ১০টি বাছুরসহ সর্বমোট ২৫টি গরু রয়েছে। বর্তমানে খামারের ১৫টি গাভী থেকে ১০০ লিটার দুধ পাওয়া যাচ্ছে। বাছুরগুলোকে যতেœ রাখা হয়েছে যেন কোনো রোগবালাই না হয়। রাসেলের খামারে ১০ হাজার টাকা থেকে ৫ লাখ টাকা মূল্যের ছাগলও রয়েছে। নিজ বাড়িতে তিনি দেশীয় জাতের বøাক বেঙ্গল ছাগল, মোরগ-মুরগী, কবুতর পালনও শুরু করছেন। আরও বড় পরিসরে খামার বাড়ানোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি ।
খামারি রাসেল ঢালি তার অনুভূতি ব্যক্ত করে আনন্দবাজারকে বলেন, ইচ্ছে ছিলো ব্যাংকার হবো। কিন্তু মেডিকেলে পড়তে গিয়ে তা আর হয়ে ওঠেনি। এখন আমার খামারের পরিধি অনেক বেড়েছে। প্রতিদিন খামার থেকে ১০০ লিটার দুধ পাওয়া যায়। যা বিক্রি হচ্ছে ১৫ হাজার টাকায়। তিনি আরও বলেন, খামারে বাছুরই হলো লাভের অংশ। বছরে খামারে বছরে ৪০টি বাছুর হয়। বাছুর থেকে আয় হয় প্রায় ২ লাখ ১০ হাজার টাকা। বর্তমানে তার খামারে দেড় কোটি টাকা মূল্যের গরু ও ছাগল রয়েছে। খামারে বোয়ার, তোঁতাপুরি, হারিয়ানা, বিটল, শিরহি ও যমুনাপাড়ি নামে বিভিন্ন জাতের ছাগল রয়েছে। তার খামারে পিতা-মাতা, স্ত্রী ও ভাইসহ ৫ জন কর্মচারি সহযোগিতা করে আসছেন।
খামার করতে আগ্রহীদের উদ্দেশ্যে রাসেল বলেন, গরু বা ছাগলের মালিকের ভবিষ্যৎ হলো বাছুর। যে মালিক বাছুরকে দুধ খাওয়ালো না, সে সম্পূর্ণ আয় থেকেই বাদ পড়লো। যে বাছুরকে দুধ খেতে দিলো, গাভী মালিকের লাভ একটু যদি কমও হয় তবুও তার ইনভেস্ট হলো। আর কেউ যদি আমার মত সফল খামারি হতে চায়, অবশ্যই তাকে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা নিয়ে আগাতে হবে। তিনি আরও বলেন, বর্তমানে গরুর দুধের দাম কম, খাদ্যের দাম বেশি। তাই খরচ কমাতে খাদ্যের জন্য একটু প্রযুক্তি নির্ভর হতেই হবে। কাঁচা ঘাসের কোনো বিকল্প নাই। খরচ সাশ্রয় হলে কৃষক লাভবান হবেন।
রায়পুর শহরের বাসিন্দা যুক্তরাজ্য ফেরত কামরুল আল মামুন বলেন, রাসেল একজন সফল খামারি। রায়পুর শহরের মানুষের কাছে মানসম্পন্ন খাঁটি দুধ এবং দুগ্ধজাত পণ্য পৌঁছে দেয়ার উদ্দেশ্য নিয়েই ‘গোয়ালাস ডেইরিজ’ নাম দিয়ে রাসেলের কাছ থেকে দুধ নেয়া শুরু করি। বাজার মূল্যে এরকম খাঁটি দুধ পাওয়াতে ভোক্তাদের কাছে দুধের জনপ্রিয়তা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। এ ছাড়াও আমাদের নিজস্ব কারখানায় এ দুধের তৈরী সর দই এর ব্যাপক চাহিদা তৈরী হচ্ছে। আমি এবং আমার ব্যাংকার বন্ধুও এরকম একটি গরু ও ছাগলের খামার দেয়ার পরিকল্পনা করছি। যাতে করে আরো বেশি মানুষের কাছে খাঁটি দুধ পৌঁছে দেয়া যায়। রায়পুর উপজেলার চরবংশী ও চরআবাবিল ইউনিয়নে এখন কম-বেশি একটি করে খামার সবারই বাড়িতে রয়েছে। সফল উদ্যোক্তা রাসেলকে দেখে অনেকেইে উদ্বুদ্ধ হয়েছেন। রাসেল ঢালি ব্যাংকার হতে চেয়েছিলেন। তবে মেডিকেলে ভর্তির কারনে তা আর হতে পারেননি।
রায়পুর উপজেলার মেঘনা নদীর চরাঞ্চল খ্যাত উত্তর চরবংশী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হোসেন আহাম্মদ জানান, বর্তমান কৃষিতে সাফল্য অর্জন করেছেন অনেকে। এ ইউনিয়নে এখন যে পরিমাণ দুধ উৎপাদন হয়, তা বিক্রির জায়গা নেই। যদি সরকারিভাবে এ অঞ্চলে একটি দুগ্ধ শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা যায় তাহলে চরবংশী ইউনিয়নের মানুষকে আর বাইরে যেতে হবে না। এ বিষয়ে সরকারি সহযোগিতা কামনা করেন তিনি।
রায়পুর উপজেলা প্রাণি সম্পদ কর্মকর্তা আতাউর রহমান বলেন, রাসেল ঢাকায় একটি প্যাথলজিতে চাকুরির পাশাপাশি দু’দিন বাড়িতে থেকে গরু ও ছাগলের খামার করা ছিলো একটি অসাধারণ বিষয়। আমরা মুগ্ধ। প্রায় প্রতিদিনই তার খামারের খোঁজ নেয়া হয়। গরু ও ছাগলগুলোকে ভ্যাকসিন দেয়া হয়। সরকারিভাবে তাকে সহযোগিতার চেষ্টা করবো।
আনন্দবাজার/এম.আর








