দেশের যেসব এলাকায় চিনিকল আছে ওইসব অঞ্চলে আখের উৎপাদন আগের তুলনায় অনেক কমে গেছে। নানা কারণে আখ চাষ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন চাষিরা। যার কারণে চরম সংকটে ভুগছে চিনিকলগুলো। গত ৫ বছরে এ কারণে রাজশাহী চিনিকলে উৎপাদন কমেছে তিন চতুর্থাংশ। এমন চিত্র অন্য চিনিকলগুলোর। শিল্পটি টিকিয়ে রাখতে হলে চাষিদের আখ চাষে ফেরানোই এখন প্রধান লক্ষ্য। দেশের ১৫টি চিনিকলের মধ্যে (কেরু অ্যান্ড কোং ছাড়া) ১৪টি চিনি কলই আছে লোকসানে।
গতকাল রবিবার জাতীয় সংসদে শিল্পমন্ত্রী নূরুল মজিদ মাহমুদ হুয়ামূন বলেছেন, ‘বর্তমানে দেশে চিনিকলের সংখ্যা ১৫টি। এর মধ্যে একটি চিনিকল (কেরু অ্যান্ড কোং) লাভজনক এবং অলাভজনক চিনিকলের সংখ্যা ১৪টি। ২০২০-২০২১ মাড়াই মৌসুম থেকে সরকারি সিদ্ধান্তে অলাভজনক ১৪টি চিনিকলের মধ্যে ৬টি চিনিকলের (পঞ্চগড়, সেতাবগঞ্জ, শ্যামপুর, রংপুর, পাবনা ও কুষ্টিয়া) আখ মাড়াই কার্যক্রম স্থগিত আছে।’
দেশের চিনিকলগুলোর যে বেহাল দশা তা রাজশাহী চিনিকলের চিত্র দেখলে বোঝা যায়। রাজশাহী চিনিকল সূত্র জানায়, গত ২০২০-২১ আখ মাড়াই মৌসুমে রাজশাহী চিনিকলে আখ মাড়াই হয় মাত্র ৬৩ হাজার ৯৬৪ মেট্রিক টন এবং চিনির উৎপাদন হয় ৩ হাজার ৬৬৪ দশমিক ৬০ টন। চলতি মৌসুমে ২০২১-২২ মাড়াই মৌসুমে ২৪ হাজার ৩ টন আখ মাড়াই হয় এবং তা থেকে চিনি উৎপাদন হয় মাত্র ১ হাজার ৩০৮ টন।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ক্রমাগত লোকসানের কারণে গেলো বছর রাজশাহী চিনিকল সাময়িক বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। এতে মিলে চাষিদের সরবরাহের জন্য মজুত করা সার, বীজ, কীটনাশকসহ অন্যান্য কৃষিজাত উপকরণগুলো অন্য চিনিকলে স্থানান্তরিত হয়। ফলে স্থানীয় আখচাষিরা হতাশ হয়ে তাদের আখ চাষের জমি থেকে মুড়ি আখ (গোড়ার আখ গাছ) তুলে ফেলেন। অধিকাংশ কৃষকই জমিতে আখের বদলে অন্য ফসল চাষে মনযোগী হন। এদের মধ্যে অনেকেই চাষযোগ্য জমি কেটে পুকুর খননও করেন। আর এতেই রাজশাহী চিনিকলে আখ সংকটের কারণে গত দু’বছরে চিনির উৎপাদন কমে আসে তিন চতুর্থাংশ।
রাজশাহী চিনিকল সূত্র জানায়, দেশের ১৫টি চিনিকলের মধ্যে গেলো বছর সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী রাজশাহীসহ ৬টি চিনিকল সাময়িক বন্ধের নির্দেশ দেয় সরকার। কিন্তু জনস্বার্থে পরবর্তীতে এ সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসে সরকার। কিন্তু ততক্ষণে চাষিরা মুখ ফিরিয়ে নেন আখচাষ থেকে। এতে রাজশাহী অঞ্চলে আখের উৎপাদন আগের তুলনায় তিন চতুর্থাংশ কমে যায়। রাজশাহী চিনিকল সূত্র জানায়, ২০২০ সালের প্রথমদিকে চাষিরা জানতে পারেন রাজশাহী চিনিকল বন্ধ হয়ে যাবে। এজন্য তারা তাদের জমিতে উৎপাদিত আখের প্রায় অর্ধেকেরও বেশি আখ গুড় তৈরির জন্য দিয়ে দেন। এতে করে আখ সংকটে পড়তে হয় রাজশাহী চিনিকলকে।
রাজশাহীর কাটাখালী এলাকার আখচাষি আলিম বলেন, আমার দুই বিঘা জমি আছে। সেখানে প্রতিবছরই আখ চাষ করি এবং সেই আখ রাজশাহী চিনিকলে বিক্রি করি। কিন্তু ইদানিং আখচাষে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছি। তিনি বলেন, দিন দিন সার, বীজ, কীটনাশকসহ লেবার খরচ বাড়ছে। আবার আখ জমি থেকে কেটে সুগার মিল পর্যন্ত পৌঁছে দিতেও গাড়িভাড়া লাগে, সেটিও বেড়েছে। খরচ বাড়লেও বাড়েনি আখের দাম।
রাজশাহী চিনিকলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শাহজাহান কবির বলেন, আখের উৎপাদন বেশি হলে চিনির উৎপাদন অটোমেটিকভাবে বেড়ে যায়। যেমন রাজশাহী চিনিকলে রয়েছে মোট ৯টি সাবজোন। এর মধ্যে পশ্চিমে কাশিয়াডাঙ্গা, নওদাপাড়া, মিলস গেট ‘ক’ ও মিলস গেট ‘খ’ জোনে উৎপাদন একেবারেই স্বল্প। এসব অঞ্চলে অতিরিক্ত নগরায়ন হওয়ায় আখের চাষযোগ্য জমি কমেছে। এর ফলে উৎপাদনও কম। অন্যদিকে পুঠিয়া, নন্দনগাছী, সরদহ, চারঘাট ও আড়ানীতে উৎপাদন বেশ ভালো। সেক্ষেত্রে মিলের মোট চাহিদা এ ৫টি সাবজোন থেকেই পূরণ করা হয়।
মো. শাহজাহান কবির বলেন, কৃষিজাত জমির পরিমাণ কমে আশপাশে ইটভাটা ও প্রচুর পরিমাণ পুকুর খনন, আখচাষের পরিবর্তে অন্যান্য ফসল চাষ, আখের মূল্যবৃদ্ধি, শহর বা নগরায়ন এবং সার ও কীটনাশকসহ অন্যান্য পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি হওয়ায় আখচাষ বহুলাংশে কমেছে। আর এ কারণে কমছে চিনির উৎপাদন। এছাড়া গত বছর লোকসানের কারনে দেশের সব মিল বন্ধের ঘোষণার কারণে অনেকেই আখচাষ ছেড়ে জমি লিজ দিয়েছেন। কেউ কেউ তৈরি করেছেন পুকুর। আম বাগান করায় কমেছে আখের জমি। এসব কারণে আখ সংকটে পড়েছে চিনিকল।
রাজশাহী চিনিকলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলেন, আখ সঙ্কট কাটিয়ে উঠতে কৃষকদের উন্নত প্রশিক্ষণ, আখের বীজ প্রদান করতে হবে। স্থানীয় সরকার ও জনপ্রশাসনকে চাষযোগ্য জমি রক্ষার ক্ষেত্রে কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে।
আনন্দবাজার/শহক








