- সফল হর্টিকালচার সেন্টার
টমেটো সারা বিশ্বেই ভোজনাবিলাসীদের কাছে একটি মুখরোচক খাবার। স্বাদে, গুণে এ সবজি অনন্য ভূমিকা পালন করছে। তরকারি, ভর্তা কিংবা সালাদে এর বিকল্প নেই। পাশাপাশি টমেটো দিয়ে অনেকে আচার তৈরি করেন। ডিম ভাজাতেও টমেটোর ব্যবহার স্বাদে আনে অনন্য এক বৈচিত্র্য।
এসব ছাড়াও টমেটো এখন আঙ্গুরের মতো টপাটপ খাওয়া যাবে। কেননা, বাজারে এসেছে টমেটোর এক নতুন উদ্ভাবিত জাত। যা দেখতে আঙুর বা চেরী ফলের মতোই। তাই খাবার টেবিলে এর পরিবেশনও করা যায় আঙ্গুর বা চেরী ফলের মতো।
রাজবাড়ী হর্টিকালচার সেন্টারে চেরী টমেটোর পরীক্ষামূলক চাষে ব্যপক সফলতা পেয়েছেন সেন্টারের কর্মকর্তা কর্মচারিরা। জেলার বেকার যুবসমাজ এ চেরী চাষাবাদ করে তাদের বেকারত্ব ঘোচাতে পারবে বলে আশা কৃষি বিভাগের।
সরেজমিনে রাজবাড়ী হর্টিকালচার সেন্টারে গিয়ে দেখা যায়, ১ শতাংশ জমিতে মাচা তৈরি করে চেরী টমেটোর পরীক্ষামূলক চাষ হয়েছে। প্রতিটি গাছে আঙ্গুরের মত থোকায় থোকায় ঝুলে আছে লাল আর হলুদ রংয়ের চেরী টমেটো। সেন্টারে গাছের চারা কিনতে আসা দর্শনার্থীরা চেরী টমেটো দেখে অবাক হচ্ছেন। সেন্টারের জমিতে চলতি বছর ৩০টি চারা রোপনে ব্যপক ফলন মিলেছে। প্রতিটি গাছ থেকে প্রায় ২০ কেজির মত চেরী টমেটো পাওয়া গেছে। একটি চেরী টমেটোর চারা রোপনের দেড় মাস পরেই ফলন আসে। একটি গাছ থেকে ৪ বারের বেশি ফলন পাওয়া যায়।
রাজবাড়ীতে প্রথমবারের মত চেরী টমেটো চাষাবাদের নানা দিক নিয়ে কথা হয় হর্টিকালচার সেন্টারের উপ পরিচালক কৃষিবিদ আ. কাদের সরদার এর সঙ্গে। তিনি বলেন, ময়মনসিংহে বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট টমেটোর এ জাতটি উদ্ভাবন করেছে। নাম দেওয়া হয়েছে, বিনা টমেটো-১০। তবে একে ‘চেরি টমেটো’-ই বলছেন গবেষকরা। উচ্চফলনশীল চেরি টমেটোর গাছের উচ্চতা ১৪০-১৪৫ সে.মি.। আকারে আঙ্গুরের মতো টমেটো প্রতি গাছে ফলের সংখ্যা হয় ২৫০-৫০০টি। গড় ফলন প্রতি হেক্টরে ৯০টন। যেকোনো উঁচু বেলে, দোআঁশ ও এটেল দোআঁশ প্রকৃতির মাটিতে জাতটি ফলানো যায়। তবে মাচা করে দিলে অধিকতর ভালো ফলন পাওয়া সম্ভব।
জমি তৈরি : টমেটোর ফলন অনেকাংশে জমি তৈরির উপর নির্ভর করে। তাই ৪-৫ বার জমি চাষ ও মই দিয়ে মাটি ঝরঝরে করে নিতে হবে।
বপনের সময় : মধ্য সেপ্টেম্বর থেকে মধ্য অক্টোবর সময়ের মধ্যে বীজতলায় বীজ বপন করতে হবে। বীজ বপনের পর থেকে চার সপ্তাহ বয়সী চারা মূল জমিতে লাগানোর উপযুক্ত সময়। তবে মধ্য নভেম্বর পর্যন্ত চারা লাগানো যায়।
বীজ শোধন : টমেটোর বীজ বপন করার সময় পিঁপড়ার আক্রমণ থেকে রক্ষার জন্য বীজ বপনের সঙ্গেই সেভিন পাউডার বপনকৃত বীজের লাইনের সঙ্গে ছিটিয়ে প্রয়োগ করতে হবে।
সার ও প্রয়োগ পদ্ধতি : একর প্রতি ৫ টন গোবর, ১৬০ কেজি ইউরিয়া, ১৪০ কেজি টিএসপি ও ১২০ কেজি এমওপি প্রয়োগ করতে হবে। চারা রোপণের আগে জমি শোধনের জন্য ফুরাডান পাউডার প্রয়োগ করা ভালো। ইউরিয়া সার ৩ ভাগ করে জমি প্রস্তুতের সময়, চারা লাগানোর ১৫ দিন ও ৩৫ দিন পর এবং এমওপি ২ ভাগ করে চারা লাগানোর ১৫ ও ৩৫ দিন পর মূল জমিতে প্রয়োগ করতে হবে।
সেচ ও নিষ্কাশন : চারা মাটিতে পূর্ণরূপে স্থাপিত হওয়ার আগ পর্যন্ত প্রতিদিন একবার পানি দিতে হবে।
আগাছা দমন এবং মালচিং : আগাছা দেখা দিলে নিড়ানি বা হাতের সাহায্যে আগাছা পরিষ্কার এবং মাটি নরম করে মালচিং করতে হবে।
বালাই ব্যবস্থাপনা : ভাইরাসজনিত রোগের হাত থেকে রক্ষার জন্য ১০-১৫ দিন অন্তর অন্তর ম্যালাথিয়ন ৫৭ ইসি স্প্রে করতে হবে। এ ব্যবস্থা প্রথম ফল পাকার আগ পর্যন্ত চালু রাখতে হবে। পাতা পচা রোগ থেকে গাছকে রক্ষার জন্য ফুল আসার ঠিক আগ থেকে ১৫ দিন অন্তর তিনবার ডাইথেন-এম ৪৫ অথবা রিডোমিল এমজেড অনুমোদিত মাত্রা অনুযায়ী প্রয়োগ করতে হবে। টমেটোর গাছ ঢলে পড়া রোগ থেকে রক্ষার জন্য ক্ষেতের মাটি যাতে স্যাঁতস্যাঁতে না থাকে তার ব্যবস্থা করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, চেরি টমেটো মূলত ছোট জাতের টমেটো। দেখতে আঙুরের মতো হলেও পুষ্টিমান আঙুরের থেকেও অনেক বেশি। এ টমেটো খেতে অত্যন্ত সুস্বাদু ও নানা পুষ্টিগুণে ভরপুর। এ জাতটি রাজবাড়ী জেলায় ছড়িয়ে পড়লে অনেক লাভজনক উচ্চ মূল্যের সবজি হিসাবে পরিচিতি পাবে এবং কৃষকরা লাভবান হবেন। বেকার যুব সমাজ চেরী টমেটো চাষ করে বেকারত্ব ঘোচাতে পারবে। কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরী হবে।
উল্লেখ্য, চেরী টমেটো হল এক ধরনের ছোট গোলাকার টমেটো যা বুনো কিসমিস টাইপ টমেটো এবং গৃহপালিত বাগানের টমেটোর মধ্যে একটি মধ্যবর্তী জেনেটিক মিশ্রণ বলে বিশ্বাস করা হয়। চেরি টমেটোর আকার একটি থাম্বটিপ থেকে একটি গল্ফ বলের আকার পর্যন্ত এবং গোলাকার থেকে সামান্য আয়তাকার পর্যন্ত হতে পারে।








