পাকিস্তানের বন্দর নগরী করাচির সড়কে অপরাধের সংখ্যা বাড়ছেই। গত কয়েক বছরে চুরি, ডাকাতি ও ছিনতাইয়ের ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। আর এসব ঘটনায় শতাধিক মানুষ নিহত হয়েছে। এদের মধ্যে সাংবাদিকও রয়েছেন। দেশটির গণমাধ্যম সুত্রে এ তথ্য জানা গেছে। আরব নিউজ বলছে, প্রদেশের পরিস্থিতি আর পুলিশের নিয়ন্ত্রণে নেই। সিন্ধুর মুখ্যমন্ত্রী মুরাদ আলি শাহও এর জন্য আইন শৃংখলাবাহিনীর অবহেলাকে দায়ী করেছেন।
সুত্রে জানা যায়, সম্প্রতি করাচির এক সাংবাদিককে দিবালোকে হত্যা ছিনতাইকারীরা। স্থানীয় টেলিভিশন চ্যানেলের সংবাদ প্রযোজক আতহার মতিন তার সন্তানদের নামিয়ে দিতে বাড়ি থেকে বের হলে দেখতে পান, একটি মোটরসাইকেলে চেপে দুই ব্যক্তি বন্দুকের মুখে আরেক ব্যক্তিকে জোর করে তুলে নিয়ে যাচ্ছেন। ছিনতাইকারিদের থামাতে মতিন তার গাড়ি দিয়ে মোটরসাইকেলটাকে ধাক্কা দিলে ছিনতাইকারিরা এক পথচারীর মোটরসাইকেল চুরি করে দ্রুত পালিয়ে যায়। তার আগে সাংবাদিকের গাড়িতে গুলি করে। সংবাদ প্রযোজক তার গাড়ির ভেতরে ঘটনাস্থলেই মারা যান। জানা যায়, থানা থেকে মাত্র কয়েকশ’ মিটার এবং আধাসামরিক রক্ষীদের সদর দপ্তর থেকে প্রায় এক কিলোমিটার দূরে এ ঘটনা ঘটে। আরো জানা যায়, চলতি বছরে অন্তত ১৫ জন মানুষ সড়কে ছিনতাইকারী কিংবা ডাকাতদের হামলা নিহত হয়েছেন। তাদের একজন ওই সাংবাদিক মতিন।
প্রায় ১৮ মিলিয়নের শহর বন্দর নগরী করাচী। নগরীর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিসংখ্যানের বরাত দিয়ে আরব নিউজ বলছে, ২০১৯ সালে করাচিতে ছিনতাই অথবা তাদের গাড়ি বা মোটরবাইক ডাকাতি প্রতিরোধ করতে গিয়ে ৪৪ ব্যক্তি নিহত এবং ২৮২ জন আহত হয়। ২০২০ সালে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৫১ এবং আহতের সংখ্যা ৩৩২ হয়েছিল। ২০২১ সালে এটি আরও বেড়ে নিহতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছিল ৭২ এবং আহতের সংখ্যা ৪৪৫।
চলতি বছর শুধু জানুয়ারিতেই সড়কে সংঘটিত অপরাধে ১০ ব্যক্তি প্রাণ হারিয়েছেন, আহত হয়েছেন ৭০ জন। ফেব্রুয়ারিতে সাংবাদিক মতিনসহ পাঁচজন নিহত ও শতাধিক আহত হন। রাস্তায় গাড়ি ছিনতাই এবং সেল ফোন চুরির সংখ্যাও ব্যাপকহারে বৃদ্ধি পেয়েছে।
আরো বলা হয়েছে, ২০১৮ সালে রাস্তার ধারে ছিনতাইয়ের বিভিন্ন ঘটনায় প্রায় ১২০টি গাড়ি ও ৯৪৯টি মোটরসাইকেল চুরি হয়। ২০২১ সালে এই সংখ্যা যথাক্রমে বেড়ে হয়েছিল ২৩৫ ও ৪৩৮৮টি। ২০১৮ সালে সড়কে ডাকাতিকালে প্রায় ১৯ হাজার ৮২৬টি সেলফোন চুরির ঘটনা ঘটেছিল এবং ২০২১ সালে চুরি যাওয়া সেলফোনের সংখ্যা ছিল ২৫,১৩৯। পরিসংখ্যানের তথ্য বলছে, বেশিরভার হত্যাকাণ্ড ঘটেছে মোবাইল ফোন ডাকাতির সময়।
তাদের মধ্যে একজন ছিলেন উজমা বরকত আলীর ২০ বছর বয়সী ছেলে ওসামা। যিনি এই মাসের শুরুর দিকে উত্তর করাচির একটি ফাস্ট-ফুড জয়েন্টে রাতের খাবার খাচ্ছিলেন। সেই সময় রাস্তার ডাকাতরা তার সেলফোন চুরি করার চেষ্টা করে এবং তাকে কাছে থেকে গুলি করে।
উজমা বরকত আলী গণমাধ্যমকে বলেন, ওই ঘটনা যেন আমার ওপর আকাশ ভেঙে পড়েছে। তারা আমার কাছ থেকে আমার পৃথিবীটাই যেন কেড়ে নিয়েছে। "আমি শুধু ন্যায়বিচার চাই,"। হত্যাকারীদের গ্রেপ্তার করে ফাঁসিতে ঝোলানো উচিত, যাতে তারা অন্যান্য মায়ের ওসামাদের হত্যা করতে না পারে।
এদিকে, নিহত সংবাদ নির্মাতার ভাই তারিক মতিন, এই হত্যার জন্য "পুলিশ, রক্ষীসেনা এবং সিন্ধু সরকারকে" দায়ী করেছেন। তিনি বলেন, অপরাধীদের পাশাপাশি কর্মকর্তাদের "অযোগ্যতা ও অপরাধের প্রতি পরোক্ষ সমর্থন" উভয়ই দায়ী।
মতিনের কর্মস্থল সামা টিভির সংবাদ পরিচালক ফারহান মল্লিক বলেন, "সড়কে সংঘটিত অপরাধের মাত্রা এমন একটি পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে করাচির প্রতিটি নাগরিক অত্যন্ত হতাশ হয়ে পড়েছেন। কিন্তু পুলিশ ও রক্ষীরা কেউই কিছুই করছে না। যেখানে ঘটনাটি ঘটেছিল সেখান থেকে মাত্র কয়েকশ’ মিটার দূরে প্রহরীদের একটি ফাঁড়ি অবস্থিত এবং এটি আইন প্রয়োগকারী সংস্থার নিষ্ক্রিয়তার বিষয়ে অনেক কথা বলে, যারা নাগরিকদের অপরাধীদের করুণার উপর ছেড়ে দিয়েছে।
জেষ্ঠ্য সাংবাদিক মাজহার আব্বাস অপরাধ বৃদ্ধির জন্য পুলিশ ও প্রহরারত সেনাদের নিষ্ক্রিয়তাকে দায়ী করেছেন। বলেছেন, কম হারে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার বিষয়টিই সমস্যাটিতে অবদান রেখেছে। সিন্ধু সরকারের পরিসংখ্যান অনুসারে, গত বছর সড়কে সংঘটিত অপরাধের ঘটনাগুলোতে গ্রেপ্তার হওয়া ৭,১৭৯ জনের মধ্যে ৩,৬৬৬ জন জামিনে এবং ৩,৫১৩ জন বেকসুর খালাস পেয়েছে। এটি নিয়ন্ত্রণ করা পুলিশ ও রক্ষী উভয়ের দায়িত্ব। পুলিশের যোগসাজশ না থাকলে এবং তারা তাদের দায়িত্ব ঠিকভাবে পালন করলে কোনো অপরাধ ঘটতে পারে না।
ইউনিভার্সিটি অফ ওয়ারউইকের পুলিশি আচরণ বিষয়ে বিশেষজ্ঞ শিক্ষাবিদ জোহা ওয়াসিম বলেন, সড়কে অপরাধ প্রতিরোধের জন্য আয় বৈষম্য, বেকারত্ব, শ্রেণিবৈষম্য, রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের অভাব ও শ্রমিক শ্রেণির ক্ষমতায়নের মতো কাঠামোগত সমস্যাগুলির সমাধান করতে হবে।
জানা যায়, শহরে দিনকে দিন অপরাধ বেড়ে যাওয়ার অন্যতম কারন সরকারি কর্মকর্তা, ভুক্তভোগী ও বিশেষজ্ঞরা আইন প্রয়োগকারী সংস্থার নিষ্ক্রিয়তা। পাশাপাশু আদালতে বারবার অপরাধীদের কম দোষী সাব্যস্ত হওয়া। করাচী ২০১৩ সাল পর্যন্ত বিশ্বের সবচেয়ে বিপজ্জনক স্থানগুলোর একটি হিসেবে খ্যাত ছিল। পরে সেনাসদস্যরা সড়কগুলোকে আরও নিরাপদ করতে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করে। যা জনপ্রিয় "করাচি অপারেশন" নামে পরিচিত। এর ফলে অপরাধের হার হ্রাস পেয়েছিল এবং দেশের কিছু দাগী আসামীকে কারাগারে বন্দী করা হয়েছিল। এতো উদ্যোগের পরেও সাম্প্রতিক মাসগুলিতে করাচির রাস্তায় অপরাধ ফিরে এসেছে। যা কর্তৃপক্ষ ও নাগরিকদের উদ্বিগ্ন করে। যারা এমন একটি শহর নিয়ে ভীত যেটি পাকিস্তানের প্রধান পুঁজিবাজার, যেটি নগদ-সংকটে থাকা দেশের সকল পণ্য পরিবহন ব্যবস্থাপনা পরিচালনা করে এবং যেটি পাকিস্তানের বেশিরভাগ কর-রাজস্ব আয় করে থাকে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শেখ রশিদ আহমেদ সিন্ধুর প্রাদেশিক সরকারকে করাচিতে "কঠোর ব্যবস্থা" গ্রহণের আহ্বান জানিয়ে এক বিবৃতিতে বলেন, সাংবাদিক হত্যার পর করাচি আরও একবার আগুন ও রক্তে নিমজ্জিত হলো। তিনি আরো বলেছেন, বর্তমানে প্রদেশের পরিস্থিতি আর পুলিশের নিয়ন্ত্রণে নেই।
সিন্ধুর মুখ্যমন্ত্রী মুরাদ আলি শাহ গত দেড় মাসে সড়কে অপরাধ বৃদ্ধি পাওয়ার কথা স্বীকার করেন এবং আরও বলেন যে, পুলিশ ও রক্ষীদের অবহেলা ছিল এক্ষেত্রে একটি বড় সমস্যা। বলেন, আমি সাধারণত গোপনে শহর পরিদর্শন করি, কিন্তু পুলিশ ও প্রহরীদের সড়কে অথবা সংশ্লিষ্ট এলাকায় টহল দেওয়ার দায়িত্বে খুব কমই দেখেছি। এই সপ্তাহে অনুষ্ঠিত অপরাধ নিয়ন্ত্রণ বিষয়ক একটি সরকারি সভায় তিনি এসব কথা বলেছিলেন। শহরের শীর্ষ পুলিশ কর্মকর্তাদের উদ্দেশে তিনি প্রশ্ন করেন "আপনাদের স্টেশন হাউসের লোকেরা কোথায়, তারা কী করছে এবং কী কার্যসম্পাদন করেছে?
রক্ষীদের একজন মুখপাত্র আরব নিউজের উল্লেখ করে সেনাবাহিনীর মিডিয়া শাখা আইএসপিআরের কাছে এই বিষয়ে তাদের মন্তব্য জানতে চান। আইএসপিআরের পক্ষ থেকে জবাব চাওয়ার নানা চেষ্টা করেও কোনও সাড়া মেলেনি।
করাচির পুলিশ প্রধান গোলাম নবী মেমন বলেছেন, তাঁর বাহিনী সড়কে ক্রমবর্ধমান অপরাধ দমনে কঠোর পরিশ্রম করছে। আরো বলেন, তার বাহিনী ওসামার মতো নিহতের হত্যাকারীদের বিচারের আওতায় আনা হবে। পুলিশ প্রধান মেমন স্বীকার করেছেন যে পুলিশের মধ্যে "কতিপয় সদস্যের" অপরাধীদের সাথে সম্পর্ক থাকতে পারে তবে তা খুবই "ক্ষুদ্র ও ব্যক্তিগত পর্যায়ে" এবং এই ধরনের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল। তিনি পুলিশের নেয়া নতুন নতুন পদক্ষেপের রূপরেখাও তুলে ধরেন।
উল্লেখ্য, ফেব্রুয়ারি মাসের শুরুতে, সিন্ধু সরকার হঠাৎ করে করাচি পুলিশ প্রধান অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক ইমরান ইয়াকুব মিনহাসকে এই পদে আসার মাত্র নয় মাসের মাথায় অপসারণ করে এবং মেমনকে তাঁর স্থলাভিষিক্ত করে। করাচি প্রশাসক মুর্তজা ওয়াহাব আরব নিউজকে নিশ্চিত করেছেন যে, সড়কে অপরাধ বৃদ্ধি পাওয়ায় বিশেষভাবে এই পরিবর্তন আনা হয়েছে।
আনন্দবাজার/শহক








