- ১৫টি সিনেমা হলের মধ্যে ১৩টি বন্ধ
- হলগুলোর আধুনিকীকরনে সরকারি পৃষ্টপোষকতার দাবি
- নিদিষ্ট সময়ে ইউটিউবে সিনেমা প্রদর্শন বন্ধ
‘অনেক আগের কথা, মা-বাবাকে না বলে স্কুলের ব্যাগে বাড়ি থেকে চাল, কখনো বা না জানিয়ে বাবার পকেট থেকে টাকা নিয়ে সিনেমা দেখতে যেতাম, সাদা-কালো সিনেমাগুলোর মধ্যে সাত ভাই চাম্পা, ছুটির ঘণ্টা, বেদের মেয়ে জোসনা, এমন কতো যে সুন্দর ছবি হতো। মাঝে মাঝে ধরা পড়ে যেতাম। এসব শুধুই অতীত।’
সিনেমা হল নিয়ে কথা বলতে গিয়ে স্মৃতির পৃষ্ঠা উল্টিয়ে জয়পুরহাট জেলা শহরের আরাম নগর মহল্লার আব্দুস সালাম (৬০) এমনভাবেই কথা বললেন।
শুধু আব্দুস সালাম নন, তার বয়সের প্রায় সব মানুষেরই শৈশবের স্মৃতি এমনই ছিল। জয়পুরহাট জেলার কালাই উপজেলার মোলামগাড়ি হাটের মোহাম্মদ আলী (৬৩) বলেন, ‘আগের দিনে মুই কছুনু আনন্দের বড় মাধ্যম আছিলো সিনেমা হল, আর এখন টিভি, ইউটিউব. ফেসবুক, নাচ, গান, কনসার্ট, মোবাইল ফোন হছে। আরো কি সব বিনোদন দেখমু।
ষাট থেকে নব্বই দশক পর্যন্ত দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে দাপিয়ে চলা চলচ্চিত্রে এখন মন্দাভাব বিরাজ করছে। এক সময়ের রমরমা সিনেমা ব্যবসা বন্ধ হতে বসেছে জয়পুরহাটে। এ অবস্থায় আগের ১৫টি সিনেমা হলের চলছে মাত্র ২টি সিনেমা হল। ‘পৃথিবী’ ও ‘নাজমা’। ওই সময়ের সিনেমা ব্যবসা সঙ্গে জড়িতদের অবস্থা ভালো থাকলেও এখন তাদের অবস্থা অনেকটাই মানবেতর।
জেলার ১৫টি সিনেমা হলগুলোর মধ্যে জয়পুরহাট শহরের ‘রবি টকিজ’ ১৯৬৯ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। ‘চিত্রা’ সিনেমা ১৯৮২ সালে, ‘নাজনীন’, ‘আনন্দ’ (পূর্ব নাম ভারতী টকিজ), ‘নাজমা’ ১৯৮৩ সালে ও ‘পৃথিবী’ ২০০১ সালে। কালাই উপজেলা শহরে ১৯৮৩ সালে ‘হাসনাহেনা’, একই উপজেলার মোলামগাড়ীহাটে ১৯৯৫ সালে ‘বিধিলিপি’, ক্ষেতলাল উপজেলায় ১৯৯০ সালে ‘রিতি সিনেমা’, আক্কেলপুর উপজেলা শহরে ১৯৮৭ সালে ‘আয়না’ ও ১৯৯১ সালে ‘পলাশ সিনেমা’, পাঁচবিবি উপজেলা শহরে ১৯৭৯ সালে ‘রূপালী’ সিনেমা হল ছাড়াও জয়পুরহাট সদর উপজেলার জামালগঞ্জ বাজারে ১টি ও মঙ্গলবাড়ি বাজারে ১টি, জেলায় মোট ১৫টি সিনেমা হল প্রতিষ্ঠিত হয়।
এসবের মধ্যে ভূতের বাড়ির মত শুধু ভৌত অবকামাঠামো রয়েছে জেলা শহরের রবি টকিজ, নাজমা সিনেমা ছাড়াও, মঙ্গলবাড়ি বাজার, জামালগঞ্জ চার মাথা, পাঁচবিবি ও আক্কেলপুরে মোট ৬টি সিনেমা হলের। শুধু নিভু নিভু করে কোন রকমে চলছে জয়পুরহাট জেলা শহরের পৃথিবী সিনেমা হল ও নাজমা সিনেমা হল। বিনোদন প্রিয় দর্শকরা সিনেমা হল বিমূখ হলে লোকশানের কারনে সব ক’টি একে এক বন্ধ হলে অবশিষ্টগুলোর নাম নিশানাও মিশে গেছে কালের স্রোতে।
সিনেমা ব্যবসার এমন মহা খরা চলছে নব্বই দশক থেকে। দর্শক টানতে ব্যর্থ দেশের সিনেমার এমন বেহাল দশার নানা কারণ জানান দর্শক সাধারণসহ বিশিষ্টজনরা ।
সিনোমা ব্যবসায় এমন দূর্যোগ নামায় ক্রমাগত লোকসানের মুখে সিনেমা ব্যবসা বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছেন স্থানীয় প্রেক্ষাগৃহ মালিকসহ এ ব্যবসার সাথে জড়িতরা। তারা জানান, সিনেমা হল বন্ধ হওয়ার পর সে সময়ের সাধারনের কাছে সমাদৃত মানুষগুলো এখন পেশা পরিবর্তন করে কেউ করছেন চা-পানের দোকান, কেউ বা চালাচ্ছেন রিকশা ভ্যান, আবার অনেকে কোন কাজ না পেয়ে করছেন মানবেতর জীবন-যাপন।
সিনেমা হল কর্মচারীদের মধ্যে জেলার সদর উপজেলার শান্তিনগর এলাকার আনন্দ সিনেমা হলের গেটম্যান গোপাল চন্দ্র রায়, বিশ^াসপাড়া এলাকার নাজমা সিনেমা হলের ম্যানেজার রানা, সাহেবপাড়া এলাকার নাজনীন সিনেমা হলের গেটম্যান আব্দুল মালেক, ক্ষেতলাল উপজেলার আমানীপাড়া গ্রামের হাসনাহেনা সিনেমা হলের মেশিন অপারেটর শহিদুল ইসলামসহ অনেকে জানান, আগে সিনেমা হলের কর্মচারী হওয়ার কারণে তাদের সমাজে গ্রহনযোগ্যতা ছিল, এখন সে দিন নাই, তারা কেউ রিকশা, কেউ দিন মজুর আবার কেউ চা-পানের দোকান দিয়ে কোন রকমে দিন কাটাচ্ছেন।
সিনেমা ব্যবসার মন্দাভাব কাটাতে ইতোমধ্যে প্রেক্ষাগৃহগুলোর আধুনিকায়নের কথাও জানান হল মালিকরা। এর জন্য প্রয়োজন প্রচুর টাকার বিনিয়োগ। তারপরও বর্তমানে প্রায় একই ধরনের গল্প আর নকল ছবি দর্শকদের কতটুকু টানবে তা নিয়েও রয়েছে শঙ্কা। তবে সহজ শর্তে অর্থ ঋণ সুবিধা পাওয়া গেলে এ ব্যবসার আরো কিছু দূর দেখতে চান স্থানীয় সিনেমা হল মালিকরা ।
আক্কেলপুর উপজেলার আয়না সিনেমা হলের মালিক আবুল কালাম আকন্দ, পাঁচবিবি উপজেলার রূপালী সিনেমা হলের মালিক আবু তালেব বাবু চেীধুরী, পৃথিবী সিনেমা হলের মালিক এসএম সুমনসহ অন্যান্য সিনেমা ব্যবসায়ীরা জানান, নিদিষ্ট সময়ে ইউটিউবে সিনেমা প্রদর্শন বন্ধ, সিনেমা হলগুলোর আধুনিকীকরনে সরকারি পৃষ্টপোষকতা, অশ্লিল সিনেমা নির্মান ও প্রদর্শন বন্ধ ও সীমিত আকারে বিদেশী সিনেমা প্রদর্শন অনুমতি দেয়া হলে শুধু জেলার নয় দেশের চলচ্চিত্র ব্যবসা আবারো ঘুরে দাঁড়াবে।
স্থানীয় মঞ্চ শিল্পী ও শান্তিনগর থিয়েটারের সভাপতি মিজানুর রহমানসহ জেলার সাংস্কৃতিক কর্মীরা জানান, নকল সিনেমা, দূর্বল গল্প, সিনেমা হলগুলার সেকেল অবস্থা -এসব নানান বিষয়ে চলচ্চিত্র ধ্বংসের কারণ। এসব সমাধান হলেই কেবল এ শিল্প আলোর মুখ দেখবে বলে আশাবাদী সংস্কৃতিকর্মীরা।
জয়পুরহাট জেলা প্রশাসক শরীফুল ইসলাম বলেন, জয়পুরহাটে যে সকল সিনেমা হলের অবকাঠামো রয়েছে এবং এই সব সিনেমা হল মালিকরা যদি আবারো সিনেমা ব্যবসায় আগ্রহ প্রকাশ করেন তাহলে সরকারের পক্ষ থেকে সম্ভব্য সব ধরনের সহযোগীতা দেয়া হবে।








