১০ টাকার নোটের প্রাচীন স্থাপত্য- শিল্পকর্মের নিদর্শন আতিয়া জামে মসজিদ
যে সকল ঐতিহ্যের কারণে টাঙ্গাইলকে সহজেই পরিচয় করিয়ে দেয়া যায় তার মধ্যে আতিয়া জামে মস্জিদ অন্যতম। আশির দশকে গভর্নর খোরশেদ আহম্মেদের সময়ে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের ১০ টাকার নোটের প্রচ্ছেদে জাতীয় সম্পদ হিসাবে মসজিদটি স্থান পাওয়ায় আরো সহজেই এটি পরিচিতি লাভ করে। ফলে মস্জিদটি শুধু ঐতিহ্যের নিদর্শনই নয় বরং এটি একটি দর্শনীয় প্রতিষ্ঠানে পরিনত হয়। টাঙ্গাইল শহরের দক্ষিণ পশ্চিমে ৭ কি.মি. দূরে লৌহজং নদীর তীরে দেলদুয়ার উপজেলার আতিয়াতে ঐতিহাসিক জামে মসজিদটির অবস্থান। এর নির্মাণ প্রায় ৪শ’ ১৩ বছর পূর্বে হলেও মসজিদটি প্রাচীন স্থাপত্যের এক অনন্য শিল্পকর্মের নিদর্শন হিসেবে এখনও সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করে। তবে সময়ের ভারে মসজিদটির শিল্পকর্মগুলো নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। প্রাচীন এই স্থাপত্যকে ধওেররাখতে মসজিদটি সংস্কার করা জরুরী হয়ে পড়েছে।
ইতিহাস খ্যাত বারোভূঁইয়ার এক ভূঁইয়া ঈশা খাঁর পুত্র মুসা খানের শাসনামলে মসজিদটি নির্মিত হয়। ঈশা খাঁর রাজধানী ছিল সোনারগাঁও। তিনি ছিলেন সোনারগাঁও অঞ্চলের শাসক। বৃহত্তর ঢাকা ও বৃহত্তর ময়মনসিংহ তখন সোনারগাঁও অঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত ছিল। শাসন কার্যপরিচালনার সুবিধার্থে ঈশা খাঁ টাঙ্গাইলের দেলদুয়ার উপজেলার আতিয়ায় পরগণা সৃষ্টি করেন। সে সময় আতিয়া পরগণার শাসনভার ন্যস্ত হয় ঈশা খাঁর পুত্র মুসা খার ওপর। প্রাচীন এই মসজিদটির আয়তন বাইরের দিকে ২০ দশমিক ৯ মিটার ও ১৬ দশমিক ১৩ মিটার ( ৬র্৯ ও ৪র্০)। মসজিদের প্রাচীর ২ দশমিক ৭২ মিটার (দশমিক ৫ ফুট) প্রশসস্ত বা দৈর্ঘ্য ৪২ ফুট প্রস্থ ৩২ ফুট এবং উচ্চতা ৪৪ ফুট । মসজিদের চার কোণায় রয়েছে ৪টি বিশাল আকারের অষ্টকোণাকৃতির স্তম্ভ বা মিনার। স্ফীত রেখার সাহায্যে অলঙ্কৃত মিনারগুলো ছাদের অনেক উপরে উঠে গেছে। চূড়ায় রয়েছে কারুকার্যময় সুন্দর ছোট ছোট গম্বুজ। গম্বুজগুলোর গায়ে বিভিন্ন রকমের কারুকার্য মসজিদটির সৌন্দর্য অনেকগুণ বাড়িয়ে তুলেছে।
মস্জিদটির প্রধান কক্ষ ও বারান্দা দুই ভাগে বিভক্ত। মসজিদটির পূর্ব ও মাঝের দেয়ালে রয়েছে একটি করে দরজা। বারান্দাসহ উত্তর-দক্ষিণ দেয়ালে রয়েছে দুটো করে দরজা। ভেতরের পশ্চিম দেয়ালে আছে ৩টি সুন্দর মেহরাব। প্রধান কক্ষের প্রত্যেক দেয়ালের সঙ্গে দুটি করে পাথরের তৈরি স্তম্ভ আছে। প্রধান কক্ষটি বর্গাকৃতির এবং ভেতরের দিকে এর প্রত্যেক বাহুর দৈর্ঘ্য ৭ দশমিক ৫৭ মিটার। প্রধান কক্ষের উপরে রয়েছে একটি বিশাল মনোমুগ্ধকর গম্বুজ। বারান্দার পূর্ব দেয়ালে রয়েছে তিনটি প্রবেশ পথ। মাঝখানের প্রবেশপথের উপরের অংশের নিম্নভাগে একটি শিলালিপি রয়েছে।
বর্তমানে যে শিলালিপিটি রয়েছে এর আগেও এখানে একটি শিলালিপি ছিল বলে ইতিহাসে উল্লেখ আছে। এই শিলালিপিটি ফার্সিতে লেখা। কোন কারণে আদি শিলালিপিটি বিনষ্ট হলে পরবর্তীকালে মসজিদ মেরামতের সময় বর্তমান শিলালিপিটি লাগানো হয়। বর্তমানে এ শিলালিপিতে উল্লেখ করা হয়েছে, আতিয়া মস্জিদটি নির্মাণ হয় ১০১৮ হিজরিতে। জানা যায়, ১৬০৯ সালে বায়েজিদখান পন্নীর পুত্র সাঈদখান পন্নী মসজিদটি নির্মাণ করেন। টাঙ্গাইলের করটিয়ার বিখ্যাত পন্নী জমিদার বংশের আদি পুরুষ হলেন সাঈদ খান পন্নী। মসজিদের পশ্চিমদিকে অবস্থিত ফটকের ডানদিকে আরেকটি শিলালিপি আছে। ইংরিজেতি লেখা এই শিলালিপি পাঠে জানা যায়, ১৬০৯ সালে সাঈদ খান পন্নী এটি নির্মাণ করেন। এরপর ১৮৩৭ সালে মসজিদটি সংস্কার করেন দেলদুয়ার জমিদার বাড়ীর সদস্য রওশন খাতুন চৌধুরাণী। পরে দেলদুয়ারের জমিদার আবু আহম্মদ গজনবী ও করটিয়ার জমিদার ওয়াজেদ আলী খান পন্নীসহ কয়েকজন মিলে ১৯০৯ সালে পুনরায় মসজিদটি সংস্কার করেন। বর্তমানে জাতীয় জাদুঘর এটির তত্ত্বাবধায়ক।
টাঙ্গাইলের আতিয়া জামিয়া মসজিদটি দেশের অন্যতম প্রাচীন ঐতিহ্যের নিদর্শন। তবে মসজিদের দেয়ালের উপর যে চিত্র ফলক ছিল তা বহুলাংশে নষ্ট হয়েছে। মস্জিদটি কতটা কারুকার্যময় ছিল তা বোঝা যায় এর নির্মাণশৈলী ও চিত্রফলক দেখে। এটি বাংলাদেশের অন্যান্য মস্জিদ থেকে একটু ভিন্ন। মসজিদের প্রায় লাগোয়া পশ্চিম দিকেই রয়েছে হিন্দু-বৌদ্ধ যুগের অতি প্রাচীন একটি পুকুর। এটি উত্তর-দক্ষিণে মাঝারি আকারের মসজিদের পূর্বদিকে রয়েছে উন্মুক্ত প্রাঙ্গণ। আতিয়া জামে মসজিদকে কেন্দ্র করে প্রায় দুই বর্গকিলোমিটার স্থানজুড়ে বহু প্রাচীন কীর্তি ধ্বংসাবশেষের চিহ্ন রয়েছে। মোঘল আমলে এটি ছিল প্রশাসনিক কেন্দ্র। প্রাচীন হিন্দু-বৌদ্ধ-সুলতানী আমল ও ইংরেজ আমলের প্রথম দিকেও এ স্থানের প্রাধান্য ছিল।
মসজিদের সভাপতি সৈয়দ মাজহারুল ইসলাম আনোয়ার জানান, ২০০১ সালের পর থেকে কোন চুনকাম করা হয়নি। অযত্ন ,অবহেলা আর সংস্কারের অভাবে দেশের অন্যতম প্রাচীন নিদর্শন আতিয়া জামে মসজিদটি তার ঐতিহ্য হারাতে বসেছে। এখনও মসজিদটি দেখার জন্য প্রতিদিন শতশত দর্শনার্থী ভীড় করে। মসজিদটি দেখাশোনার দায়িত্ব প্রত্নতাত্তিক কিভাগের উপর ন্যাস্ত থাকায় এলাকাবাসী বা পরিচালনা পরিষদ মসজিদটির সংস্কার করতে পারেন না। তবে এলাকাবাসী ও দর্শনার্থীরা মসজিদটির সংস্কার ও পুণরায় যেকোন টাকার নোটে মসজিদটি প্রচ্ছেদ করার দাবী জানান।








