বাবার কোলে গুলিবিদ্ধ শিশুর মৃত্যু
গত বছরও ঈদের আগের দিন রাতে হাতে মেহেদী লাগিয়ে দিতে বায়না ধরেছিল শিশু তাসপিয়া। মা ঘুমের মধ্যে মেয়ের হাতে এঁকে দেন মেহেদীর আলপনা। সকালে ঘুম থেকে উঠে মেহেদী রাঙা হাত ঘুরে ঘুরে বাড়ির সবাইকে দেখিয়েছে তাসপিয়া। রাত পোহালে কাল সেই ঈদ। এবারও বাড়ির মেয়েরা সবাই হাত রাঙাবে মেহেদীর রঙে। শুধু রাঙাবে না তাসপিয়া। মায়ের কাছে আর বায়নাও ধরবে না সে। কথাগুলো বলতে বলতে নিরবেই দু’চোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে শিশু তাসপিয়ার মা জেসমিন আক্তারের।
স্ত্রীর আবেগঘন কথাগুলো শুনে নিজের আবেগ ধরে রাখতে পারলেন না তাসপিয়ার বাবা আবু জাহেরও। তিনি কাঁদতে কাঁদতে বলতে থাকলেন, আমার মেয়ে নেই, এবার আমাদের পরিবারে কোন ঈদ নাই। ঈদের আনন্দ নেই। আমাদের সব আনন্দ ছিল একমাত্র মেয়ে তাসপিয়াকে ঘিরে। মেয়ের জন্য বিদেশ থেকে গাড়ি, জামা-কাপড়সহ নানা খেলনা এনেছেন। যেগুলো নিয়ে খানিক পর পরই খেলায় মেতে থাকতো। তাসপিয়াহীন শূন্য ঘরে খেলনা, জামা-কাপড়ের দিকে চোখ যেতেই বুকের ভেতরটা হাহাকার করে ওঠে।
গত ১৩ এপ্রিল বিকেলে চার বছরের শিশু তাসপিয়া আক্তার ওরফে জান্নাতকে চিপস-জুস কিনে দিতে নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ উপজেলার হাজীপুরের মালেকার বাপের দোকান নামকস্থানে যান প্রবাসী বাবা আবু জাহের। তিনি সেখানে তার ভাগনে আবদুল্লা আল-মামুনের দোকানে বসে কথা বলছিলেন। এমন সময় পূর্ব বিরোধের জের ধরে সন্ত্রাসী রিমন কয়েক সহযোগী নিয়ে সেখানে হামলা চালায়। এ সময় জাহের তার মেয়েকে কোলে নিয়ে পালানোর চেষ্টাকালে গুলি করে রিমন। এতে শিশু তাসপিয়া মাথা ও মুখমন্ডল গুলিতে ঝাঁঝারা হয়ে যায়। আর তার বাবা আবু জাহেরও চোখসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে গুলিবিদ্ধ হন। গুরুতর আহত অবস্থায় ঢাকায় নেওয়ার পথে কুমিল্লায় তাসপিয়ার মৃত্যু হয়।
গতকাল শনিবার বেগমগঞ্জের হাজীপুর গ্রামের বাড়িতে আলাপকালে তাসপিয়ার বাবা প্রবাসী আবু জাহের বলেন, মেয়ে তার মায়ের গর্ভে থাকাকালীন তিনি দ্বিতীয়বার বিদেশ সফরে যান। তাই জন্মের পর মেয়ের মুখ দেখা হয়নি। মেয়েও তাকে সামনাসামনি দেখেনি কখনো। বিদেশ থেকে দেশে আসার খবর শুনে তাকে এগিয়ে আনার জন্য বিমানবন্দরে মা (আবু জাহেরের), স্ত্রী ও স্বজনেরা গিয়েছিল। তার স্ত্রীর সঙ্গে গিয়েছিল চার বছরের শিশু তাসপিয়াও। বিমানবন্দরে দূর থেকে দেখেই এক পলকে তাঁকে চিনে ফেলে তাসপিয়া। আব্বু বলে কোলে উঠে আমাকে জড়িয়ে ধরে। সেই মেয়ে আজ আমার বুক খালি করে চলে গেল!
তাসপিয়ার মা জেসমিন আক্তার ঘরের আলমারি ভর্তি মেয়ের জামা-কাপড়, জুতো দেখিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলেন, মারা যাওয়ার কয়েকদিন আগে তার ফুফু ঈদ উপলক্ষে কয়েকটি নতুন জামা তৈরী করে পাঠিয়েছেন। কিন্তু এসব জামা পরার জন্য শুধু নেই আমার তাসপিয়া। যারা আমার তাসপিয়াকে এতটা নির্মমভাবে হত্যা করেছে। আমার বুক খালি করেছে। আমি তাদেরও এমন শাস্তি দেখতে চাই। যাতে তাদের মায়ের বুকও যেন আমার মত খালি হয়। আমি আমি আমার নিষ্পাপ মেয়ের হত্যাকরীদের প্রত্যেকের ফাঁসি চাই।
সত্তরোর্ধ দাদি ছেমনা খাতুন ঘরের ভেতরের বেড়ায় মুখ লুকিয়ে ডুকরে ডুকরে কাঁদছিলেন, আর বলছেন, আমার নাতিন তাসপিয়া নেই, এবার আমাদের কোনো ঈদের আনন্দও নেই। ঈদের দিন ঘরের দরজা বন্ধ করে কোথায়ও চলে যাব। এই চাড়া আর উপায় কি? যে ঘরে তাসপিয়া নাই, সেই ঘরে কী করে থাকবো। ঈদের দিন তো নাতনি আমাকে নতুন জামা পরে সালাম দিয়ে জড়িয়ে ধরতো। আমি তাকে আদর করতাম। এবার কাকে আমি আদর করবো, আমার তাসপিয়ার কেন এমন হল, সে কেন আমাদের ছেড়ে এভাবে চলে গেল?
তাসপিয়ার খুন হওয়ার ঘটনায় তার খালু হুমায়ুন কবির বাদী হয়ে বেগমগঞ্জ থানায় মামলা করেছেন। মামলায় রিমনসহ ১৭ জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। আরও ১০-১২ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি দেখানো হয়েছে। মামলাটি বর্তমানে জেলা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) তদন্ত করছে। এই মামলায় এ পর্যন্ত প্রধান আসামি রিমন ওরফে মামুন উদ্দিনসহ (২৩) ১৩ জন আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের মধ্যে নয়জন এজাহারভুক্ত এবং রিমনের ১৬৪ ধরায় আদালতে দেওয়া জবানবন্দির ভিত্তিতে দুইজন ও সন্দেহভাজন দুইজন।








