- তথ্য সংগ্রাহক ৩ লাখ ৭০ হাজার জন
- ট্যাব দেয়া হয়েছে ৩ লাখ ৯৫ হাজার
- স্বাধীন দেশে প্রথম আদম শুমারিতে জনসংখ্যা ছিল ৭ কোটি ১৫ লাখ
দেশে ও আন্তর্জাতিকভাবে প্রথম ডিজিটাল পদ্ধতিতে আদম তথা জনশুমারি ও গৃহগণনা অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে বাংলাদেশে। ১৫-২১ জুন পর্যন্ত সময়ে ষষ্ঠ জনশুমারিটি অনুষ্ঠিত হবে। গণনা করতে ৩ লাখ ৯৫ হাজার ট্যাব সংগ্রহ করা হয়েছে। এতে তিন লাখের অধিক গণনাকারী ব্যক্তি তথ্য সংগ্রহ করবে।
তা ছাড়া এ বিষয়ে ১৪ জুন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণ দেবেন। আর রাষ্ট্রপতি স্মারক ডাক টিকেট প্রকাশ করবেন। অন্যদিকে রেডিও, টেলিভিশন, প্রিন্ট ও অনলাইন গণমাধ্যমে প্রচার ও প্রকাশ করা হবে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো-বিবিএসের জনশুমারি ও গৃহগণনা ২০২২ এর মাস্টার ট্রেইনারগণের চার দিনব্যাপী প্রশিক্ষণ কর্মশালায় এ তথ্য জানানো হয়। গতকাল বুধবার রাজধানী ঢাকার বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে প্রশিক্ষণের উদ্বোধন করেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল এফসিএ, এমপি।
অর্থমন্ত্রী বলেন, কর ও সেনাবাহিনীর লোকবল নিয়োগে মধ্য শতাব্দিতে আদম শুমারি অনুষ্ঠিত হতো। সেই ধারাবাহিকতায় বিশে^র বিভিন্ন দেশে আদম শুমারি অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। তবে বাংলাদেশেই বিশে^র প্রথম ডিজিটাল পদ্ধতিতে জনশুমারি ও গৃহগণনা হচ্ছে। যদিও এটি করার পরিকল্পনা অনেক আগে নেয়া হয়েছিল। নানা প্রতিবন্ধকতার কারণে তা করা সম্ভব হয়নি।
তিনি বলেন, বিবিএস নিজস্ব প্রযুক্তিতে প্রথম ডিজিটাল শুমারি করছে। পরিসংখ্যান ঠিক না থাকলে অর্থনীতি নিয়ে কাজ করা যায় না। তাতে সবকিছুই নষ্ট হতে বাধ্য। ইতিপূর্বে বিশে^ তথ্যের অভাবে অনেকে না খেয়ে মারা গেছে। ১৮০৪ সালে বিশে^ ১০০ কোটি মানুষ ছিল। ১৮৩০ সালে ২০০ কোটি ও ৬০ সালের পর ৬০০ কোটিতে দাঁড়ায় মানুষ। ২০০ বছরে ৮শ কোটি মানুষে পরিণত হয়েছে।
জনশুমারি ও গৃহগণনায় জনগণকে সঠিক তথ্য দিয়ে সহযোগিতার প্রত্যাশার আহ্বান জানিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, প্রধানমন্ত্রী জাতিকে সঙ্গে নিয়ে দেশকে সমৃদ্ধ করে চলেছেন। একটি মানুষও যদি গণনা থেকে বাদ পড়ে অভুক্ত থেকে মারা যায় তার দায় আমাদের নিতে হবে। জবাবদিহি করতে হবে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আমাদের ভৌলিক মুক্তি দিলেও তার অর্থনৈতিক মুক্তির সময় তাকে আমরা দেয়নি। সে কারণে আজ আমরা পিছিয়ে পড়া জাতি। সেইসব সমাপ্ত কাজ তার কন্যা শেখ হাসিনা বাস্তবায়নে প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তার নেতৃত্বে গত ১২ বছরে রুপকথার মতো উন্নয়ন ও কর্মযজ্ঞ অনুষ্ঠিত হচ্ছে দেশে। মানুষ নিজেদের উন্নত করতে কাজ করছে। তিনি এ সময় কুরআনের একটি আয়াতের অর্থ করে বলেন, ‘তোমাদের মধ্যে যারা সৎকাজের আদেশ ও অন্যায় কাজ করা থেকে বিরত থাকার জন্য কাজ করছে তারাই উত্তম মানুষ।’
মুস্তফা কামাল বলেন, আমাদের প্রত্যেকের কাজই হচ্ছে মানুষকে ভালোবাসা। আমরা অনেক দূর এগিয়েছি। আরো যাবো। আমাদের তরুণ জনগোষ্ঠী এগিয়ে যেতে স্বপ্ন দেখে। তাদেরকে সঙ্গে নিয়ে চলতে হবে। শুধু নিজেকে নিয়ে নয় সবাই সাথে নিয়েই চলতে হবে। কেননা হাশরের দিন প্রতিবেশিরা যেন আমাদের বিরুদ্ধে সাক্ষী না দিতে পারে। কেননা আত্মীয়তার সম্পর্ক খারাপ করা ব্যক্তিরা বেহেস্তে যাবে না। ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে সৎকাজের ভালো ফল পাওয়া যায়। জনশুমারিকে সৎকাজ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। একটি মানুষও যেন কোন কিছু থেকে বাদ না যায়। তিনি বলেন, রেমিটেন্সের তথ্য সংগ্রহ করতে প্রথম ডিজিটাল সার্ভে করা হয়েছিল। তখন রেমিটেন্স আসতো ১৪ বিলিয়ন ডলার, রেমিটেন্সে প্রণোদনা দেয়ায় তা ১৮ বিলিয়ন ও পরবর্তীতে ২৫ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়ায়। এ বছর এখন পর্যন্ত ২১ বিলিয়ন ডলার এসেছে। এটি দেশের অর্থনীতিকে শক্তিশালী জায়গায় নিয়ে যাচ্ছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো-বিবিএসের মহাপরিচালক মোহাম্মদ তাজুল ইসলামের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল এফসিএ, এমপি। বিশেষ অতিথি ছিলেন মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সমন্বয় ও সংস্কার বিভাগের অতিরিক্ত সচিব মো. সামসুল আরেফিন, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের সিনিয়র সচিব এন এম জিয়াউল আলম, পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের সচিব ড. শাহনাজ আরেফিন। বক্তব্য রাখেন জনশুমারি ও গৃহগণনা প্রকল্পের পরিচালক মো. দিলদার হোসেন ও টেকনিক্যাল টিমের প্রধান ড. দিপংকর রায়। ভিডিও বার্তা দেন পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান এমপি।
এম এ মান্নান বলেন, দেশের সার্বিক উন্নয়নের জন্য জনশুমারি প্রয়োজন। এটি কোভিড-১৯ এর কারণে দেড় বছর পর অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। অতি সহজে অল্প সময়ের মধ্যেই এটি সম্পন্ন হবে। মাঠ ও উপজেলা, জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ে মনিটনিং করতে লোকবল নিয়োগ দেয়া হয়েছে। তিনি বলেন, বিভাগীয় ও জেলা গণনা সমন্বয়কারীরা এই চারদিনে প্রশিক্ষণে অংশ নিয়েছেন। আপনারা নিজেদের অধীনস্তদের মধ্যে এই জ্ঞান ছড়িয়ে দেবেন। এটি জাতিসংঘের টেইসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা-এসডিজি অর্জনে সহায়ক হবে।
উন্নত দেশ অর্থাৎ সবাই শিক্ষিত হবে। প্রতিটি কাজই সম্মানের। নিজেরা যাতে সঠিক ও দক্ষতার সঙ্গে কাজ করতে পারে সেটিই হবে উন্নত দেশ। বিশে^র উন্নত দেশের সমপর্যায়ে আমাদের জীবনমান উন্নীত হবে। নির্ভুল ও নিখুত শুমারি প্রত্যাশা করেন তিনি।
সামসুল আরেফিন বলেন, এই তথ্যসংগ্রহের পর আর কোন বড় আয়োজনে জনশুমারি নাও করা লাগতে পারে। আমরা অন্যান্য তথ্যগুলো সংযোজন করে জনশুমারি করতে পারবো। তা ছাড়া তিনি ডিজিটাল মাধ্যমও কখনো কখনো সমস্যা দেখা দিতে পারে বলে উল্লেখ করেন। বলেন, সেক্ষেত্রে সচেতন থাকতে হবে। ট্যাবের যত্ন নিতে হবে।
শাহনাজ আরেফিন বলেন, প্রধানমন্ত্রীর স্বপ্নের রাস্তা বাস্তবায়নে ডিজিটাল জনশুমারি করা হচ্ছে। ৪০টি মন্ত্রণালয়ের সার্বিক সহযোগিতা পাওয়া গেছে। প্রশানসনিক পর্যায়ে ৬টি পর্যবেক্ষণে মনিটরিং করা হচ্ছে। যতদ্রুত সম্ভব ফল প্রকাশ করা হবে। বাদ পড়াদের ক্ষেত্রে ৪০টি টেলিফোনের মাধ্যমে তথ্য দেয়া-নেয়া দেয়া হবে।
তিনি বলেন, স্বাধীন বাংলাদেশে ১৯৭৪ সালের প্রথম আদম শুমারিতে জনসংখ্যা ছিল ৭ কোটি ১৫ লাখ। ১৯৮১ সালের গণনায় ৮ কোটি ৯৯ লাখ, ১৯৯১ সালে ১১ কোটি ১৫ লাখ, ২০০১ সালে ১৩ কোটি ৫ লাখ ও ২০১১ সালে ১৪ কোটি ৯৮ লাখ জনসংখা ছিল।
এন এম জিয়াউল আলম বলেন, ডিজিটাল বাংলাদেশের ধারণা ও পরিকল্পা দেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ক উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয়। তথ্য সঠিক না হলে তার কোন মূল্য নেই। দেশিয় সফটওয়ার, ডাটা সেন্টার, ডিবাইস সব নিজেদের। এতে তথ্য সংরক্ষণ ও নিরাপত্তার বিষয়ে সর্বাধিক নজর দেয়া হয়েছে।
স্থানীয় প্রশাসনেরও সার্বিক সহযোগিতা প্রয়োজন। গণনাকারীদের জান-মালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে বলেন তিনি।
মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম বলেন, গত দেড় বছরে ট্যাবের মাধ্যমে বিভিন্ন জরিপ পরিচালনা করেছে বিবিএস। ট্যাবের প্রতিরক্ষা যাতে সুন্দর ও নিরাপদ থাকে সেজন্য আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সহযোগিতা প্রয়োজন। বড় বড় বিল্ডিংয়ে যাতে কোন বাধা দেয়া না হয় সে ব্যাপারে প্রত্যেকের সহযোগিতা দরকার। এসব ট্যাব পরার্তীতে অর্থনীতি শুমারিসহ বিভিন্ন জরিপে ব্যবহার করা হবে।
দিলদার হোসেন স্বাগত বক্তব্যে বলেন, ১০ ফেব্রুয়ারি ১৯৭৪ সালে প্রথম জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের তথ্য সংগ্রহ করার মাধ্যমে দেশে আদম শুমারি শুরু হয়। সেই শুমারিতে জনসংখ্যা ছিল ৭ কোটি ১৫ লাখ। ডিজিটাল বাংলাদেশের সঙ্গে সমন্বয় করে দেশে ও বিশে^ও প্রথম ডিজিটাল শুমারি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। আগে আদম শুমারি নাম থাকলেও বর্তমানে এটিকে জনশুমারি হিসেবে নামকরণ করা হয়েছে।
জনশুমারি সম্পর্কে জাতিসংঘের ঘোষণা বিষয়ে তিনি বলেন, ‘একটি দেশ বা সীমানাবেষ্টিত অঞ্চলের সকল ব্যক্তির জনতাত্ত্বিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক তথ্য সংগ্রহ, সংকলন এবং প্রকাশের প্রক্রিয়াই হলো জনশুমারি’।
তিনি বলেন, ১৫ হতে ২১ জুন পর্যন্ত দেশে অনুষ্ঠিতব্য জনশুমারিটি ওয়েবভিত্তিক ইন্টিগ্রেটেড সেন্সাস ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম-আইসিএমএস প্রস্তুতসহ জিওগ্রাফিক্যাল ইনফরমেশন সিস্টেম-জিআইএস পদ্ধতি ব্যবহার করে গণনা এলাকার বিভিন্ন পর্যায়ের কন্ট্রোল ম্যাপ প্রস্তুত করা হয়েছে।
জনশুমারির তথ্য সংগ্রহের জন্য ৩ লাখ ৭০ হাজার গণনাকারী, ৬৪ হাজার সুপারভাইজার ও ৪ হাজার ৫০০ কর্মকর্তা-কর্মচারী সরাসরি সম্পৃক্ত থাকবে। এ ছাড়াও বিবিএসের বাইরে সরকারি দপ্তরের ৯ শতাধিক কর্মচারী জোনাল অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন।
প্রকল্প পরিচালক বলেন, বিবিএসে সার্বক্ষণিক যোগাযোগের জন্যে ০৯৬০২৯৯৮৮৭৭ এই নাম্বারে একটি অত্যাধুনিক কল সেন্টার স্থাপন করা হয়েছে। সেখানে ৪০ জন কর্মী ২৪ ঘণ্টায় শুমারি বিষয়ে তথ্য আদান-প্রদান করবে।
দীপংকর রায় বলেন, আমাদের আয়ু বাড়ছে। এক্ষেত্রে বয়স থ্রি ডিজিটে নিয়ে আসা হচ্ছে যা আগে ছিল টু ডিজিটে। এবার ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর আলাদা করে তথ্য নেয়া হবে। তা ছাড়া বিদেশিদের জাতীয়তার ভিত্তিতে তথ্যও আনা হবে। প্রতিটি পরিবারে ২০ মিনিটের মতো সময় লাগবে তথ্য সংগ্রহের ব্যাপারে। আর প্রতিজন গণনাকারী ব্যক্তি ১২০ জনের মতো লোকের তথ্য সংগ্রহ করবে বাড়ি বাড়ি গিয়ে। তিনি বলেন, ভ্রাম্যমাণদের গণনায় অন্তর্ভুক্ত করা হবে।
আনন্দবাজার/শহক








