সাঁওতালদের যেমন ভাষা আছে, তবে লিখিত বর্ণমালা নেই। তেমনি তাদের ধর্ম আছে, তবে কোনো আনুশাসনিক ধর্মগ্রন্থ নেই। দিনাজপুর জেলার অধিকাংশ সাঁওতাল ধর্মান্তরিত হয়ে খ্রিষ্টধর্ম গ্রহণ করলেও সাঁওতালদের নিজস্ব একটি ধর্ম রয়েছে। বর্তমান খ্রিস্টান মিশনারিদের দ্বারা তাদের মধ্যে খ্রিস্টধর্ম প্রচারিত হচ্ছে।
দেখে মনে হতে পারে দাদু-নাতিরা গল্পে মেতেছে। সেই হাজার বছরের পুরনো গল্প। হ্যাঁ গল্প, তবে এ গল্প থেকেই তৈরি হবে গবেষণা। দিনাজপুরের হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ এবং সমাজবিজ্ঞান বিভাগের একদল শিক্ষার্থী গবেষণার কাজে আসে দিনাজপুরের সদর উপজেলার একটি সাঁওতাল পল্লীতে।
এসেই বয়োজ্যেষ্ঠ সাঁওতালি সদস্যদের সঙ্গে গোল হয়ে মাটিতে বসে গল্পে গল্পে তথ্য সংগ্রহ করতে দেখা যায়। তাদের নিজস্ব সংস্কৃতি, আর্থ-সামাজিক ও উন্নয়নসহ বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ুয়া শিক্ষার্থীরা।
সাঁওতালি সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, খুব সম্ভবত সাঁওত বা সামন্তভূমিতে বাস করার কারণে সাঁওতাল নামে পরিচিত হয়ে পড়েছে। কোল ও মুন্ডারি ভাষার সঙ্গে সাঁওতালি ভাষার সাদৃশ্য রয়েছে। সাঁওতালদের সংস্কৃতিচর্চায় লিখিত সাহিত্যের বিকাশ না ঘটলেও লোকগীতি ও লোককাহিনীর সমৃদ্ধ ঐতিহ্য রয়েছে। সাঁওতালদের যেমন ভাষা আছে, তবে লিখিত বর্ণমালা নেই। তেমনি তাদের ধর্ম আছে কিন্তু কোনো আনুশাসনিক ধর্মগ্রন্থ নেই। বর্তমান খ্রিস্টান মিশনারিদের দ্বারা তাদের মধ্যে খ্রিস্টধর্ম প্রচারিত হচ্ছে।
দিনাজপুর জেলার অধিকাংশ সাঁওতাল ধর্মান্তরিত হয়ে খ্রিষ্টধর্ম গ্রহণ করলেও সাঁওতালদের নিজস্ব একটি ধর্ম রয়েছে। যার নিদিষ্ট কোনো নাম পাওয়া যায় নি। তবে এ ধর্ম কিছুটা হিন্দু ও কিছুটা বৌদ্ধ ধর্মের মিশ্রন বলে মনে হয়। সাঁওতালরা ভারতীয় উপমহাদেশের অন্যতম আদি বাসিন্দা, এরা কৃষি উৎপাদন ব্যবস্থা এবং কৃষিসংস্কৃতির জনক ও ধারক হিসেবে স্বীকৃত। সাঁওতাল সমাজ প্রধানত কৃষিজীবী। তবে, আর্থ-সামাজিক কারণে দারিদ্র্য তাদের নিত্যসঙ্গী। তাই বাধ্য হয়ে অতি অল্প বিনিময়মূল্যে এরা কৃষি শ্রমিক হিসেবে কাজ করে থাকে। এছাড়া এরা মাটি কাটে, মোটকথা দিনমজুরির কাজে নিজেদেরকে নিয়োজিত রাখে। এরা কঠোর পরিশ্রমে অভ্যস্ত।
সাঁওতাল সমাজে পুরুষের আধিপত্য অপেক্ষাকৃত বেশি। তবুও পারিবারিক জীবনে নারীর ভূমিকা কম নয়। জীবিকা অর্জনে বা কর্মজীবনে নারীর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। সাঁওতালদের ঘর ছোট, কিন্তু গৃহাঙ্গন অত্যন্ত পরিচ্ছন্ন। মাটির দেয়ালে নানারকম কারুকার্য চিত্র। সাঁওতাল নারীর সৌন্দর্যস্পৃহা ও শিল্পমনের পরিচয় তুলে ধরে। ঘরের আসবাবপত্রখুবই সাদামাটা যা তাদের সরল জীবনরীতির পরিচায়ক। সাঁওতাল সমাজ বর্তমান সময়ও ঐতিহ্যবাহী পঞ্চায়েতি ব্যবস্থায় পরিচালিত এবং গ্রাম প্রধানরা বিশেষ মর্যাদা ভোগ করে থাকে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা জানান, একটি কোর্সে গবেষণালব্ধ পেপার জমা দিতে হবে। তারেই অংশ হিসেবে এখানে আসা। আদিবাসীরা এতটা বন্ধুসুলভ যে আমরা আশ্চর্য হয়েছি। আমরা একেবারে তাদের সঙ্গে মিশে গিয়েছি। এতে করে আমরা অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংগ্রহ করতে পেরেছি।
সাঁওতাল সম্প্রদায়ের এক সদস্য বলেন, ছাত্র-ছাত্রীরা আমাদের বিভিন্ন দিক জানতে এসেছে। বর্তমানে আমাদের ভাষা থেকে শুরু করে আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতি হারিয়ে যাচ্ছে। এ বিষয়ে সরকারের সহযোগিতা কামনা করছি।








