অস্ত গেলো ফিফা ফুটবল বিশ্বকাপ ২০২২। শেষ হলো উত্তেজনা। থেমে গেছে জয়-পরাজয়ের বিশ্লেষণ। দুয়েক দিনের মধ্যেই বন্ধ হয়ে যাবে বাকযুদ্ধ। তবে শুরু হবে অর্থনীতির নতুন খেলা। বেড়ে যাবে বিশ্বকাপ জয়ী দেশের উৎপাদন, যা কাজ করবে শরীরে শর্করার মতো। গতি ফিরবে দেশটির অর্থনীতিতে। অতীতের গবেষণায় দেখা গিয়েছে যে, বিশ্বের বৃহত্তম ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় সাফল্য অর্থনৈতিক বৃদ্ধিকে বাড়িয়ে তোলে। ২০১৪ সালের একটি গবেষণাপত্র অনুসারে কেবলমাত্র ফিফা বিশ্বকাপ ফুটবলের কোয়ার্টার ফাইনালে পৌঁছলেই রপ্তানি বেড়ে যায়। বাণিজ্যেও আসতে পারে বৈচিত্র্য।
অর্থনীতিবিদেরা মনে করেন, খেলাধুলায় কোনো দেশ বিশ্বকাপ অর্জনের মতো সাফল্য পেলে তার আবেগীয় প্রভাব দেশের ভোক্তা ও বিনিয়োগকারীর অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তের ওপরে রাখে। ২০১৪ সালে ফোর্বস ম্যাগাজিনের এক লেখায় অ্যালেন সেন্ট জন লিখেন, ‘বিশ্বকাপ জয়ের পরবর্তী মাসগুলোতে অল্প সময়ের জন্য মানুষের উৎপাদনশীলতা তুঙ্গে থাকে। এরপর এটি ক্রমে ক্ষয়ে আসতে থাকে।
তবে বিশ্বকাপ জয় একটি দেশের অর্থনীতিতে ঠিক কী প্রভাব ফেলে, আজকে জানবো সেই বিশ্লেষণ। গত ৩০ বছরে মোট সাতটি বিশ্বকাপ ফুটবল প্রতিযোগিতা হয়েছে। এই সাত প্রতিযোগিতা জিতেছে মোট পাঁচটি দল- ব্রাজিল (১৯৯৪, ২০০২), ফ্রান্স (১৯৯৮, ২০১৮), ইতালি (২০০৬), স্পেন (২০১০) ও জার্মানি (২০১৪)। ডয়চে ভেলের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই সাতবারের মধ্যে ছয়বার দেখা গেছে, যারা বিশ্বকাপ ফুটবল প্রতিযোগিতা জিতেছে, সে বছর তাদের জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার বেড়েছে। ব্রিটেনের সারে বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক মার্কো মেল্লোর সাম্প্রতিক গবেষণাপত্র অনুসারে, ফুটবল বিশ্বকাপের পর চ্যাম্পিয়ন এবং রানার্স দুই দলেরই বিরাট আর্থিক লাভ হয়। অন্যান্য আর্থিক লাভের পাশাপাশি, রপ্তানির পরিমাণও বৃদ্ধি পায়। যেমন, ২০০২ সালে বিশ্বকাপ জয়ের পর দেখা গিয়েছিল যে ব্রাজিলের রপ্তানির পরিমাণ কয়েক গুণ বেড়ে গিয়েছে।
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ১৯৯৪ সালের ব্রাজিলের জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার দাঁড়ায় ৫ দশমিক ৯ শতাংশ, যা ছিল তার ১৯৯৩ ও ১৯৯৫ এবং ১৯৯৬ সালের চেয়ে বেশি। এরপর ২০০২ সালে প্রবৃদ্ধির হার ছিল ৩ দশমিক ১ শতাংশ, ২০০১ ও ২০০৩ সালে যা ছিল যথাক্রমে ১ দশমিক ৪ ও ১ দশমিক ১ শতাংশ। ১৯৯৪, ১৯৯৮, ২০০২- টানা তিন বিশ্বকাপ ফুটবলের ফাইনাল খেলে ব্রাজিল। এর মধ্যে প্রথম ও শেষবার তারা জিতলেও ১৯৯৮ সালে তারা হেরে যায়। সেবার বিশ্বকাপ জেতে ফ্রান্স। সে বছর ফ্রান্সের জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার দাঁড়ায় ৩ দশমিক ৬ শতাংশ, যা ছিল ১৯৯৭ ও ১৯৯৯ সালের চেয়ে বেশি। কিন্তু ২০১৮ সালের এই ধারার পুনরাবৃত্তি ঘটেনি, সে বছর তাদের জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার উল্টো কমে যায়; ২০১৭ সালের ২ দশমিক ৩ শতাংশ থেকে তা কমে দাঁড়ায় ১ দশমিক ৯ শতাংশ।
২০০৬ সালের বিশ্বকাপ জেতা ইতালির ক্ষেত্রেও এই ধারা দেখা যায়। সেবার তাদের প্রবৃদ্ধির হার দাঁড়ায় ১ দশমিক ৮ শতাংশ, ২০০৫ ও ২০০৬ সালে যা ছিল যথাক্রমে শূন্য দশমিক ৮ ও ১ দশমিক ৫ শতাংশ। ২০১৪ সালে বিশ্বকাপ জেতা জার্মানির ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। সে বছর দেশটির প্রবৃদ্ধির হার দাঁড়ায় ২ দশমিক ২ শতাংশ, ২০১৩ সালে যা ছিল শূন্য দশমিক ৪ ও ২০১৫ সালে যা ছিল ১ দশমিক ৫ শতাংশ। ২০১০ সালের বিশ্বকাপের সময় বিশ্ব অর্থনীতি কেবল মন্দা কাটিয়ে উঠছে। সেবার বিশ্বকাপ জেতে স্পেন। দেখা গেল, সেই মন্দার সময়ও সেই বছর স্পেনের প্রবৃদ্ধির হার বেড়ে দাঁড়াল শূন্য দশমিক ২ শতাংশ, যা আগের বছরের চেয়ে ৪ শতাংশীয় বেশি এবং ২০১১ সালের ১ শতাংশীয় পয়েন্ট বেশি।
২০১৮ সালে সেমিফাইনালে ক্রোয়েশিয়ার কাছে ২-১ গোলে হেরে বিশ্বকাপ থেকে বাদ পড়ে যায় ইংল্যান্ড। ওই ম্যাচের আগপর্যন্ত ইংল্যান্ডের জয়ের কথা চিন্তা করে কিছুটা অর্থনৈতিক উন্নতির চিন্তা করছিল থ্রি লায়ন ভক্তরা। ব্যাংক অব ইংল্যান্ডের তৎকালীন গভর্নর মার্ক কানরি তো সরাসরি বলে দিয়েছিলেন, ইংল্যান্ড জিতলে সেটা হবে ব্রিটিশ অর্থনীতির জন্য সার্বিকভাবে একটি 'নিখাদ, নির্ভেজাল অর্থনৈতিক মঙ্গল'।
করোনা মহামারির সময় ভুল নীতির কারণে আর্জেন্টিনার মানুষের দুর্ভোগ বেড়েছিল। সামগ্রিকভাবে অর্থনৈতিক সমস্যা পাহাড়সম হয়ে উঠেছে। মুদ্রার বিনিময় হার নিয়ন্ত্রণ করার কারণে কালোবাজারের সঙ্গে সরকারি হারের ব্যবধান প্রায় দ্বিগুণ হয়ে উঠেছে। দেশটির মুদ্রা পেসোর ওপর মানুষের আস্থা স্রেফ কর্পূরের মতো উবে গেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভও কমে গেছে। চলতি ডিসেম্বর মাসে দেশটির মূল্যস্ফীতির হার ১০০ শতাংশে উঠতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এতে অনেক মানুষ দেশ ছাড়তে বাধ্য হচ্ছেন। দেশটির বামঘেঁষা সরকার আন্তর্জাতিক বাজারব্যবস্থা থেকে বিচ্ছিন্ন। তা সত্ত্বেও নানা ধরনের ভর্তুকি দিয়ে যাচ্ছে তারা। এতে বাড়ছে ঋণ; ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসের ভাষায়, এই ঋণ টেকসই নয়।
বেহাল অর্থনীতি থেকে উত্তরণে কোনোভাবেই মিলছে না সুরাহা। তাই প্রাণপণ চেষ্টা বিশ্বকাপ জেতাটা। জিততে পারলেই বড় সুরাহা মিলবে। তাই, এই আশাতেই কাপ জয়ের স্বপ্নে বিভোর ছিলেন আর্জেন্টিনাবাসী। গবেষকদের মতে, ফ্রান্সের চেয়ে আর্জেন্টিনার আর্থিক হাল অনেকটাই খারাপ। তাই বিশ্বকাপ জয়ে আর্জেন্টিনার আর্থিক হাল খানিকটা হলেও ফেরার আশা আছে। মেল্লোর মতে, বিশ্বকাপ জিতলে ব্রাজিলের মতোই উপকৃত হতে পারে আর্জেন্টিনা। কাতারে এই বছরের টুর্নামেন্টের সময়টা অন্যবারের বিশ্বকাপের সময়ের চেয়ে ভিন্ন। এই সময়ে উত্তর-গোলার্ধে শীতকাল। আর, এটা আগের অন্যান্যবারের চেয়ে আর্জেন্টিনার অর্থনৈতিক অবস্থাকে বিশেষ ভাবে প্রভাবিত করতে পারে।
তবে, বিশ্বকাপ জেতার কারণেই যে সব আর্থিক সমস্যা মিটে যাবে, তা কিন্তু না। ফ্রান্স একটি জ্বালানি সংকট এবং ধর্মঘটের সঙ্গে ধারাবাহিক লড়াই করে চলেছে। আর, আর্জেন্টিনার মুদ্রাস্ফীতি ইতিমধ্যেই ১০০ শতাংশের কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছে। দেশটি বর্তমানে খরায় ভুগছে। এতে পরের বছর ফসল রপ্তানি হ্রাস পেতে পারে। আর, এক্ষেত্রেই মেলো ইতিহাস ঘেঁটে বলেছেন, পূর্বের অর্থনৈতিক সমস্যা বিশ্বকাপ জয়ের পরও কোনও দেশের আর্থিক লাভের পরিমাণকে আশানুরূপ করতে না-ও পারে।
২০১৪ সালের বিশ্বকাপের সময় ফোর্বস ম্যাগাজিনের কলামিস্ট অ্যালেন সেন্ট জন বলেন, বিশ্বকাপ জেতার পরপর দেখা যায়, স্বল্প সময়ের জন্য হলেও উৎপাদনশীলতা বেড়ে যায়। এটি অনেকটা শরীরে শর্করার মাত্রা বেড়ে যাওয়ার মতো, এতে হঠাৎ করে কিছুক্ষণের জন্য শরীরের শক্তি বেড়ে যায়, কিন্তু এর পরপরই শরীর নেতিয়ে পড়ে।
আনন্দবাজার/শহক








