পানি সাশ্রয়ী ফসল চাষে ঝোঁক
কৃষিতে পরিবর্তন
- ধান চাষে সেচের ব্যয় বাড়ছে
- আম, পেয়ারা, সবজিতে ঝোঁক
কয়েক সপ্তাহ থেকে বরেন্দ্র অঞ্চলে সূর্য যেন আগুন ঝড়াচ্ছে। শুক্রবার (১৫ এপ্রিল) দীর্ঘ আট বছর পর রাজশাহীর তাপমাত্রা ৪১ ডিগ্রি ছাড়িয়েছিল। ওই দিন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয় ৪১ দশমিক ২ ডিগ্রি। এর আগে ২০১৪ সালের ২৫ এপ্রিল দিনটিতে রাজশাহীতে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড হয় ৪১ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এমন তীব্র তাপদাহে তপ্ত বরেন্দ্র ভূমি। আবহাওয়ার কারণে মাটির উপরের স্তর হয়ে পড়ছে শুষ্ক। অপরদিকে কমেছে বৃষ্টিপাত, নেমেছে ভূগর্ভস্থ পানি। সব মিলিয়ে বরেন্দ্রের কৃষিতে পরিবর্তন ঘটছে। যেসব ফসল অল্প পানি ব্যবহারে জন্মে সেসব ফসলের দিকে ঝুঁকছেন চাষিরা।
বরেন্দ্রের মাঠ। যতো দূর চোখ যায় বিস্তর এলাকা জুড়ে ধান আর ধান। এমন দৃশ্য বরেন্দ্রে স্বাভাবিক হলেও ধান উৎপাদনে পানি ব্যবহারে রয়েছে কপালে চোখ উঠে যাওয়ার মতো তথ্য। এক কেজি ধান উৎপাদনে এক হাজার ৫০০ লিটার থেকে ২ হাজার লিটার পানি খরচ হয়ে থাকে। যার বেশির ভাগ ব্যয় হয় ভূগর্ভস্থ পানি থেকে। পানি সংকটের কারণে চাষিরা ধানের বিকল্প আবাদের কথা ভাবতে শুরু করেছে।
সপ্তাহ ধরে রাজশাহীতে আগুন ঝরাচ্ছে সূর্য। তীব্র তাপপ্রবাহে সবুজ গাছপালাও যেন তপ্ত নিশ্বাঃস ছাড়ছে। প্রাণিকুলের হাঁসফাঁস অবস্থা। ঘরে-বাইরে কোথাও এতটুকু যেন স্বস্তি নেই। অব্যাহত তাপপ্রবাহে সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস উঠেছে। একটু বৃষ্টি ও শীতল হাওয়ার পরশ পেতে ব্যাকুল হয়ে উঠেছে মানুষ। এ চিত্র সম্প্রতি সময়ে প্রতি বছরের।
মার্চের মধ্যভাগ থেকে এপ্রিলের মধ্যভাগ পর্যন্ত তাপপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে রাজশাহীর ওপর দিয়ে। এর মধ্যে গত ৪ এপ্রিল মাত্র ০ দশমিক ৪ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়। এর আগে ও পরে দেশের বিভিন্ন স্থানে হালকা বৃষ্টি হলেও খরাপ্রবণ এলাকা রাজশাহীতে তার দেখা নেই। ফলে বৃষ্টির জন্য চারিদিকে হাহাকার পড়ে গেছে। টানা তাপদাহে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে জনজীবন। অসহনীয় রোদ, আর গরমে স্থবিরতা নেমে এসেছে কর্মজীবনেও। বাসা, অফিস কিংবা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান সবখানেই যেন গরম আর গরম। দিনের বেলায় দূরে থাক, রাতেও গাছের পাতা নড়ছে না।
রাজশাহী আবহাওয়া পর্যবেক্ষণাগারের জ্যেষ্ঠ আবহাওয়া পর্যবেক্ষক রেজওয়ানুল হক জানান, কয়েক সপ্তাহ ধরে রাজশাহীর তাপমাত্রা বাড়ছেই। শুক্রবার বেলা ৩টায় রাজশাহীতে সর্বোচ্চ তাপামাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ৪১ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। যা বিগত ৮ বছরের রেকর্ড। তিনি বলেন, সাধারণত তাপমাত্রা ৩৬ থেকে ৩৮ হলে মৃদু তাপপ্রবাহ, ৩৮ থেকে ৪০ হলে মাঝারি তাপপ্রবাহ এবং ৪০ থেকে ৪২ হলে তীব্র তাপপ্রবাহ বলে ধরা হয়। এছাড়া সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৪২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ওপরে উঠলে তাকে অতিতীব্র তাপপ্রবাহ হিসেবে ধরা হয়।
এমন আবহাওয়ার কারণে মাটির উপরের স্তর উত্তপ্ত হয়ে পড়ছে। অপর দিকে ভূগর্ভস্থ পানি নেমে গেছে। যার কারণে বরেন্দ্রে অঞ্চলের দীর্ঘদিনের আবাদ ধান চাষ থেকে সরে আসছে চাষিরা। ধানের শিকড় মাটি খুব বেশি গভীরে প্রবেশ করে না। যার কারণে সেচ খরচ বেড়েছে। গত এক যুগে একটু একটু করে অনেকখানি বদলে গেছে বরেন্দ্রের কৃষি। পানির সমস্যা একদিকে যেমন প্রকট হয়ে উঠছে অন্যদিকে তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ার কারণে মাটির উপরের স্তর তপ্ত হয়ে উঠছে। যার কারণে বেশি সেচ জনিত ফসলগুলোতে বাড়ছে খরচে।
রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০১১ সালে রাজশাহীতে আম বাগানের জমির পরিমাণ ছিল সাড়ে আট হাজার হেক্টর। যা এখন ১৮ হাজার হেক্টর। পেয়ারা বাগান ছিল ৬৮২ হেক্টর, এখন ৫ হাজার হেক্টর। বেড়েছে সবজির চাষ। ২০১০ সালে রাজশাহীতে বিভিন্ন ধরনের সবজি চাষ হয় ১৯ হাজার ৪০৮ হেক্টর জমিতে। আর ২০২০ সালে সবজি চাষ হয় ২৭ হাজার ৩৩৯ হেক্টর জমিতে। এ পরিসংখ্যান থেকে বোঝা যায় যে ধান থেকে চাষিরা সরে আসছে আবহাওয়াজনিত কারণে।
রাজশাহীর তানোর উপজেলার পাঁচন্দর গ্রামের কৃষক আসাদুজ্জামান মিঠু জানান, মাত্র বছর দশ আগে ধানে যে পরিমাণে সেচ লাগতো এখন তার চেয়ে দ্বিগুন লাগে। বৃষ্টি নেই। আবহাওয়ার উত্তাপ বেশি হওয়ার কারণে মাটি দ্রুত শুকিয়ে যাচ্ছে। সে কারণে সেচের পরিমান বাড়ছে। কৃষক মিঠু জানান, পানির চাহিদা বেড়ে যাওয়ার কারণে এক সঙ্গে সব জমিতে ধান চাষ করা সম্ভব হচ্ছে না। একটি গভীর নলকূপের অধিনে যে জমি থাকে তার অর্ধেক ধান চাষ করা হয়, অন্য জমিগুলোতে কম পানি লাগে এমন রবি শস্য লাগানো হয়। যাতে পানির সমন্বয় হয়। কিন্তু তাতেও সমাধান হচ্ছে না। এ অঞ্চলে সময়ে বৃষ্টির দেখা মেলে না।
রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক) বলেন, বেশ কয়েক বছর থেকে বরেন্দ্র অঞ্চলে বোরো ধানের বদলে অন্য ফসল চাষে উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে। পানি সাশ্রয়ী ফসলের চাষ বাড়াতে মাঠ পর্যায়ে উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
রাজশাহী রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের সাধারণ সম্পাদক জামাত খান বলেন, পানির সমন্বয় ব্যবহার প্রয়োজন। পানি অপচয় আমাদের বরেন্দ্র অঞ্চলে ক্ষতি ডেকে আনছে। আমাদের গভীরভাবে সচেতন হওয়ার সময় এসেছে।








