আধুনিক দেউলিয়া রাষ্ট্র---
শ্রীলঙ্কার সরকার কোনোদিক বিবেচনা না করে এক ডলার ২০৩ শ্রীলঙ্কার মুদ্রায় বেঁধে দিয়েছিল। অথচ বাজারে তখন এক ডলার বিক্রি হচ্ছে ২৪০ থেকে ২৬৬ শ্রীলঙ্কার মুদ্রায়। ফলে অধিকাংশ মানুষ বেশি রোজগারের আশায় কালো বাজারে বিদেশি মুদ্রা ভাঙিয়েছেন। যার জেরে দুই দিক থেকে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে শ্রীলঙ্কার ব্যাংক- প্রথমত, বৈদেশিক মুদ্রা থেকে তাদের রোজগার কমেছে। দ্বিতীয়ত, ব্যাংকে বিদেশি মুদ্রা, অর্থাৎ ডলারের পরিমাণ ক্রমশ কমতে থেকেছে। অমিরথালিঙ্গমের মতে, ৯০ শতাংশ বিদেশি মুদ্রা কালো বাজারে চলে গিয়েছে।
বহুদিন ধরেই ঋণের ভারে জর্জরিত শ্রীলঙ্কা। তদুপরি করোনার প্রভাবে পর্যটন খাতে আয় কমে যাওয়া, বৈদেশিক আয় কমে যাওয়া, অরগানিক কৃষির ফলে উৎপাদন কমে যাওয়ায় অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের মুখে পড়ে দ্বীপরাষ্ট্র শ্রীলঙ্কা। বর্তমান সরকারের অযোগ্যতা ও অদক্ষতার কারণেই আজ এই অবস্থায় এসে পৌঁছেছে বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদেরা। জ্বালানি তেল ও খাদ্য দ্রব্যের দাম বৃদ্ধির কারনে বিক্ষোভের মুখে পড়ে শ্রীলঙ্কা। মরার উপর খাঁড়ার ঘা। একদিকে কোভিড, অন্যদিকে রাজাপাকসে সরকারের ভুল নীতির কারণেই আজ শ্রীলঙ্কা এই অবস্থায় এসে দাঁড়িয়েছে। এর থেকে উঠে দাঁড়াতে সময় লাগবে বলেই মনে হচ্ছে।
শ্রীলঙ্কার বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে বলতে গিয়ে কলম্বো বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক অমিরথালিঙ্গম ডিডাব্লিউকে দেয়া সাক্ষাৎকারে তার বক্তব্য, ‘অনেকেই বলছেন, ঋণের জালে জড়িয়ে পড়েছে শ্রীলঙ্কা। সে কারণে এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। কিন্তু মনে রাখা দরকার, গত ৬৭ বছর ধরেই ঋণের জালে জড়িয়ে আমাদের দেশ। এ কোনো নতুন ঘটনা নয়। বর্তমান সমস্যা বুঝতে হলে সরকারের অপদার্থতার বিষয়টি বুঝতে হবে।’অবশ্য কোভিডও শ্রীলঙ্কাকে অর্থনৈতিক সংকটের দিকে আরো বেশি ঠেলে দিয়েছে বলেও তিনি মনে করেন।
তাঁর বক্তব্য থেকে আরো জানা যায় যে, প্রতিবছর পর্যটন থেকে শ্রীলঙ্কা পাঁচ থেকে সাত বিলিয়ন ডলার রোজগার করে। গত দুই বছরের কোভিডকালে সেই রোজগার কার্যত শূন্যে নেমে গেছে। শ্রীলঙ্কার মতো দেশের জন্য যা অপূরণীয় ক্ষতি। এছাড়াও বৈদেশিক মুদ্রা রোজগারের ক্ষেত্রে বিপুল ক্ষতি হয়েছে যার কারন কোভিড। বিদেশে কাজ করা বহু শ্রীলঙ্কার মানুষের চাকরি চলে গেছে। কাজের পরিসর কমেছে। পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রা নিয়ে সংস্কারের নামে চরম গাফিলতি করেছে রাজাপাকসের সরকার। এই অর্থনীতিবিদ বলেন, ‘সরকার বৈদেশিক মুদ্রা বিনিময়ের রেট নিজেদের মতো করে রেগুলেট করার চেষ্টা করেছে। সেটা করতে গিয়ে তারা কালোবাজারির সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে।’
অর্থনীতিবিদের বক্তব্য থেকে জানা যায়, শ্রীলঙ্কার সরকার কোনোদিক বিবেচনা না করে এক ডলার ২০৩ শ্রীলঙ্কার মুদ্রায় বেঁধে দিয়েছিল। অথচ বাজারে তখন এক ডলার বিক্রি হচ্ছে ২৪০ থেকে ২৬৬ শ্রীলঙ্কার মুদ্রায়। ফলে অধিকাংশ মানুষ বেশি রোজগারের আশায় কালো বাজারে বিদেশি মুদ্রা ভাঙিয়েছেন। যার জেরে দুই দিক থেকে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে শ্রীলঙ্কার ব্যাংক- প্রথমত, বৈদেশিক মুদ্রা থেকে তাদের রোজগার কমেছে। দ্বিতীয়ত, ব্যাংকে বিদেশি মুদ্রা, অর্থাৎ ডলারের পরিমাণ ক্রমশ কমতে থেকেছে। অমিরথালিঙ্গমের মতে, ৯০ শতাংশ বিদেশি মুদ্রা কালো বাজারে চলে গিয়েছে।
শ্রীলঙ্কার অন্যতম নিরপেক্ষ প্রতিষ্ঠান অ্যাডভোকাটা ইনস্টিটিউটের কর্মকর্তাকে ডন ভিমাঙ্গা ডয়চে ভেলেকে জানিয়েছেন, অধ্যাপক অমিরথালিঙ্গমের সঙ্গে তিনি সহমত। তার বক্তব্য, শ্রীলঙ্কার প্রাইমারি ব্যালেন্স বরাবরই ঋণাত্মক ছিল। ট্রেড ডেফিসিটও দীর্ঘদিন ধরে ঋণাত্মক। তা সত্ত্বেও এমন অর্থনৈতিক সংকট তৈরি হবে, এমনটা মনে হয়নি। কিন্তু বর্তমান সরকারের ভুল নীতি পুরো অর্থনৈতিক ব্যবস্থাটাই ধসিয়ে দিয়েছে। তার কথায়, ‘ব্যাংকের হাতে বিদেশি মুদ্রা নেই। ফলে তারা ঋণ পরিশোধ করতে পারছে না। বিদেশ থেকে ওষুধ, তেল, কয়লা, খাবার ইত্যাদি কিছুই রপ্তানি করতে পারছে না। ফলে বাজারে জিনিসের দাম আকাশছোঁয়া। অধিকাংশ জিনিস পাওয়া যাচ্ছে না। বিদেশি সাহায্য না এলে এই পরিস্থিতি থেকে শ্রীলঙ্কা উঠে দাঁড়াতে পারবে না। এবং এর জন্য সম্পূর্ণ দায়ী বর্তমান সরকার।’
অর্থনীতিবিদ ও বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য হলো রাজাপকসে পরিবার সমস্ত অর্থনীতির তত্ত্বকে উপেক্ষা করে প্রতিদিন ঋণের বোঝা বাড়িয়ে গেছে কিন্তু তা পরিশোধের উপায় চিন্তা করেনি। যার জেরে এই ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। বর্তমান সরকারের চীনমুখী নীতিও অর্থনৈতিক সংকট আরো প্রবল করেছে। চীনের থেকে বিপুল পরিমাণ ঋণ নিয়েছে শ্রীলঙ্কা। সেই ঋণের টাকায় সমুদ্রবন্দর এবং বিমানবন্দর তৈরি হয়েছে। ঋণের টাকায় তৈরি হয়েছে ক্রিকেট স্টেডিয়াম। অথচ সেখান থেকে যতটা রোজগারের কথা সরকার ভেবেছিল, তার অর্ধেকও হচ্ছে না। ফলে আয়ের চেয়ে বেশি অর্থ ব্যয় হয়েছে ঋণ পরিশোধ করতে।
পরিস্থিতি এমনই হয়েছে যে, চীনকে সমুদ্র বন্দর ৯৯ বছরের লিজে দিয়ে দিতে হয়েছে। কার্ডিফ বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক ইন্দ্রজিৎ রায়ের মতে, শ্রীলঙ্কার পরিস্থিতি বুঝিয়ে দেয় সার্ক আসলে কতটা অকেজো। ‘দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলিকে নিয়ে সার্ক তৈরি হয়েছিল অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলা করার জন্য। কিন্তু শ্রীলঙ্কার পরিস্থিতি বুঝিয়ে দিচ্ছে, সংকট মোকাবিলায় প্রতিবেশীদের বিশেষ কিছু করার থাকে না।’ তাঁর মতে, ভারত-পাকিস্তান-চীনের সম্পর্কের টানাপড়েন সার্কের মূল ভিত নাড়িয়ে দিয়েছে।
ভারতীয় যোজনা কমিশনের অবসরপ্রাপ্ত আমলা অমিতাভ রায় ডয়চে ভেলেকে জানিয়েছেন, ‘২০১৮ সালে শেষ শ্রীলঙ্কা গেছি। তখনো মনে হয়নি এমন পরিস্থিতি হতে পারে। শ্রীলঙ্কার সরকার যত বেশি চীনমুখী হয়েছে, আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলির কাছ থেকে তাদের ঋণ পাওয়ার পরিমাণও তত কমেছে। এই পরিস্থিতির সঙ্গে তার সরাসরি সম্পর্ক আছে বলেই মনে হচ্ছে।’ তিনি আরো বলেন, শ্রীলঙ্কার বর্তমান সরকার কার্যত একটি পরিবারের হাতে কুক্ষিগত।
তাদের দুর্নীতির কথা সামনে এসেছে। বিদেশেও তাদের বিপুল পরিমাণ সম্পত্তির কথা শোনা যাচ্ছে। এই সবকিছুই শ্রীলঙ্কাকে ক্রমশ এই ভয়াবহ পরিস্থিতি সর্বশেষ বিক্ষোভ ও ভয়াবহ দাঙ্গার দিকে ঠেলে দিয়েছে।
কলম্বোর দুই বিশেষজ্ঞের বক্তব্য, ভারত যেভাবে শ্রীলঙ্কার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে, তা থেকে স্পষ্ট, শ্রীলঙ্কাকে এই পরিস্থিতি থেকে ঘুরে দাঁড়াতে গেলে ফের ভারতমুখী নীতি নিতে হবে। তবে একইসঙ্গে তাদের বক্তব্য, ভারত গ্রান্ট দিয়ে শ্রীলঙ্কাকে বাঁচানোর জায়গায় নেই। ভারতের অর্থনীতি তত মজবুত নয়। ভারত সফট লোন বা ঋণ দিয়ে শ্রীলঙ্কাকে সাময়িক সাহায্যের ব্যবস্থা করছে। শ্রীলঙ্কার ব্যাংকে বৈদেশিক মুদ্রা বাড়ানোর জন্য রিজার্ভ ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়া ৪০০ মিলিয়ন ডলার কারেন্সি সোয়াপের ব্যবস্থা করেছে। কিন্তু এসব কোনো কিছুই সুদূরপ্রসারী সুবিধা দেবে না। শ্রীলঙ্কাকে ঘুরে দাঁড়াতে হলে অর্থনৈতিক সংস্কারের প্রয়োজন।
লেখক: কবি ও প্রাবন্ধিক, সুনামগঞ্জ








