কৃষিশিক্ষা ও বাস্তব প্রয়োগ ও বর্তমান পরিস্থিতি বিষয়ে স্বাক্ষাৎকার দিয়েছেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্থাপন শাখার ডেপুটি রেজিস্ট্রার ও এম এস ইন এনভাইরনমেন্টাল সায়েন্স, পিএইচডি ফেলো কৃষিবিদ মুহাম্মদ মাহবুবুর রহমান (আলমগীর)। দৈনিক আনন্দবাজারের নিজস্ব প্রতিবেদক ফারুক আহমাদ আরিফ গত ১৮ নভেম্বর সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করেন।
প্রশ্ন: তরুণরা কেন কৃষিতে আসবে?
আলমগীর: কৃষিশিল্পে ক্ষতির কোনো সম্ভাবনা নেই। অর্থাৎ স্বল্প পুঁজিতে হাঁস, মুরগি, শাক-সবজি ও মাছ চাষ করতে পারে। ফুলের, সবজির চাষ করতে পারে। এখানে কম বিনিয়োগ হলেও চলবে। ফল চাষ করা যায়। এখন তো পেঁপে, পেয়ারা, কলা এসব চাষ হচ্ছে। উৎপাদিত ফসল বাজারজাত করতে যোগাযোগব্যবস্থা ভালো করতে হবে। বিপণন ব্যবস্থায় মনোযোগ দিতে হবে সরকারকে। কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য পেলে তরুণ এগিয়ে আসবে। বিদেশে রপ্তানি করতে হলে সে অনুযায়ী উৎপাদন করতে হবে। বেকারের সংখ্যা যেভাবে বাড়ছে সেটির কর্মসংস্থানে কৃষি অনেক উপকারে আসবে। কৃষিতে সাফল্য পেলে মানুষ অন্যকোন চাকরিতে যেতে চায় না।
প্রশ্ন: কৃষিচাষে ব্যয় কেমন?
আলমগীর: ময়মনসিংহ অঞ্চলে জমির মাপ হচ্ছে সাড়ে ৬ শতাংশে এক কাঠা। সেটি খোরাকি নিতে হয় বছরে ৫ হাজার (বন্ধক নিলে এক কাঠায় ২০-৫০ হাজার টাকা) টাকায়। ফসল হয় দুটি। সেক্ষেত্রে অর্ধেক বছরের জন্য আড়াই হাজার টাকা। প্রতি কাঠায় ৪টি চাষে তিনশ করে ১২০০ টাকা, ইউরিয়া সাড়ে ৬ কেজি ১৫০ টাকা, এমপি (পটাশ) সাড়ে ৬ কেজি ৩৯০ টাকা, টিএসপি সার দিতে হবে ৬ সাড়ে ২০ কেজি ৩৯০ টাকা। সর্বমোট সার ৯৩০ টাকা। শ্রমিক ব্যয় (রোপন, ঘাস পরিষ্কার, কাটা, মাড়াই-ঝাড়াই) ৮ জন গড়ে ৫০০ টাকা করে ৪ হাজার টাকা। ৮ হাজার ২৪০ টাকা ব্যয় হবে। ৫ মণ ধান হলে ১২শ টাকা করে ৬ হাজার টাকা। প্রতি ফসলে কৃষকের লোকসান ২ হাজার ২৪০ টাকা। সেক্ষেত্রে এক শতকে ব্যয় হচ্ছে ১ হাজার ২৬৮ টাকা। একশ শতক তথা এক একরে ব্যয় হবে এক লাখ ২৬ হাজার ৮০০ টাকা। ধানের ফলন হবে এক একরে পাঁচশ মণ। গড়ে ১২০০ টাকা করে বিক্রি করলে এক লাখ ২০ হাজার টাকা। আর ব্যয় হয়েছিল এক লাখ ২৬ হাজার ৮০০ টাকা। সেক্ষেত্রে একরে লোকসান হচ্ছে ২৬ হাজার ৮০০ টাকা। আর বিদেশ থেকে চাল এনে বিক্রি করে ৮০ বা ১০০ টাকা করে চিকন বলে। কিন্তু দেশিয়টি ধরা হয় না। আর কৃষকও তার নিজের শ্রমের মূল্য ধরে না। ধরলে প্রতি কেজি চাল একশ টাকার কম হতো না।
(আর কৃষকের শ্রমসহ ব্যয় ধরলে হবে এক কাঠায় সেচ এক হাজার। এক কাঠায় খড় হবে দুই হাজার টাকা। সেক্ষেত্রে ১ হাজার ২৪০ টাকা লস। কৃষক নিজের শ্রমের ব্যয় ধরে না। ধরলে যা হতো ৯০দিন গড়ে একশ টাকা করে ৯ হাজার টাকা ও কৃষাণির পারিবারিক শ্রমের ৫দিনের গড় মূল্য এক হাজারসহ মোট ১০ হাজার টাকা। কৃষি উৎপাদনে ৯ হাজার ২৪০ ও কৃষকের ১০ হাজার টাকাসহ সর্বমোট ব্যয় ১৯ হাজার ২৪০ টাকা। সেখানে খড়সহ পাওয়া যায় ৮ হাজার টাকা। ১৯ হাজার ২৪০ টাকা হতে ৮ হাজার টাকা ব্যয় বাদ দিলে ১১ হাজার ২৪০টাকা লোকসান।)
প্রশ্ন: পদবি ঠিক রেখে (অর্থাৎ প্রথম/দ্বিতীয় বা যোগ্যতানুযায়ী পদায়ন করে) কৃষি কর্মকর্তাদের ওয়ার্ডে নিয়োগ দেয়া যায় কিনা?
আলমগীর: এটি ভালো প্রস্তাব। অবশ্য সরকার প্রতিটি ইউনিয়নে একজন করে কৃষি কর্মকর্তা নিয়োগ দিতে পদক্ষেপ নিচ্ছে। এটি করতে পারলে ভালো কাজ হবে। তা ছাড়া কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, কৃষিসেবার ওয়েবসাইটে অনেক বিষয়ে তথ্য দেয়া আছে। এগুলো শিক্ষিত লোকদের জন্য। সাধারণ/অশিক্ষিত কৃষকরা এ থেকে উপকৃত হতে পারছে না। তাদের অনেকেই এন্ড্রয়েড সেট ব্যবহার করে না। তবে শিক্ষিতরা ছাদবাগানসহ কৃষিকাজ করছে।
প্রশ্ন: খনিজপণ্য ছাড়া সব শিল্পের কাঁচামাল কৃষি থেকে আসে। তবে বাংলাদেশ কৃষি উৎপাদন না করে বাহির থেকে আমদানি করে থাকে। এক্ষেত্রে দেশের অঞ্চলভেদে যেসব ফসল উৎপন্ন হয় তাতে সরকার বিনিয়োগ করতে পারে কিনা?
আলমগীর: দেশের যে অঞ্চলে যেসব ফসল ভালো হয় বা হতে পারে সে অনুায়য় তা উৎপন্ন করতে সরকার প্রকল্প নিয়েছে। সারাদেশকে ৩০টি জোনে ভাগ করা হয়েছে। এসব অঞ্চলের কৃষকদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছে কখন, কিভাবে কত পরিমাণ সার, বীজ ব্যবহার করতে হবে। তবে জমিতে কোনভাবেই বিষ না দেয়া ভালো। এতে জমি নষ্ট হয়। পরবর্তীতে তা ফসলের সঙ্গে আমাদের দেহে ঢুকে ক্ষতি করে। আর আমাদের দেশের কৃষিতে সকল প্রকার কাঁচামাল উৎপন্ন হয় না। তাই যা হয় সেখানে আরো বিনিয়োগ করা যেতে পারে।
প্রশ্ন: প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কয়েক মাস যাবত তরুণদের চাকরির পেছনে না ঘুরে কৃষিকাজে সংযুক্ত হতে আহ্বান জানাচ্ছেন। প্রতি ইঞ্চি জমি চাষের আওতায় আনতে উদ্বুদ্ধ করছেন। কিন্তু আমরা যে হিসেব পেলাম সেখানে শুধু লোকসান। তাহলে তরুণরা কেন কৃষি আসবে?
আলমগীর: শিক্ষিত তরুণরা যখন কৃষিতে আসবে তখন খাদ্যদ্রব্যের (চালের) দাম বেড়ে যাবে। কারণ তারা প্রকৃত (সকল ব্যয়) হিসেবটা করবে। কম দামে বিক্রি করবে না। তখন হয়তো সরকারিভাবে দাম নির্ধারণ করে দিতে হবে। আর তরুণরা ধান চাষ না করে সবজি চাষ করবে। কারণ এক কাঠায় ৬ হাজার টাকার ধান হলেও ১৫-২০ হাজার টাকার সবজি বিক্রি করা সম্ভব। তবে ধান হচ্ছে মূল ফসল। সেক্ষেত্রে প্রণোদনা বা ভর্তুকি অথবা কৃষিযন্ত্রের দাম কমিয়ে দিতে হবে। অথবা ন্যায্য দাম নির্দিষ্ট করতে হবে সরকারকে।
প্রশ্ন: প্রণোদনা বা ভর্তুকি কি স্থায়ী সমাধান?
আলমগীর: তাহলে বেশি দামে বিক্রি করতে হবে। তাতে এক মণ দামের দাম হবে ২ হাজার টাকা। প্রতিকেজি ৫০ টাকা পড়বে।
প্রশ্ন: রাশিয়া, ইউক্রেন, নেদারল্যান্ডসহ অনেক উন্নত দেশ কৃষিতে লাভ করছে। সেটি কীভাবে হচ্ছে?
আলমগীর: সেসব দেশে সারসহ আনুসঙ্গিক ব্যয় কম। কারণ তারা সার নিজেরা উৎপাদন করে। সেচের দাম কম।
প্রশ্ন: আজ হতে ২০ বছর আগেও প্রচুর শস্য নিজেরা ফলাতো। ঘরের চাল বা মাচার উপর লাউ, কুমড়াসহ অন্যান্য সবজি করতো। এখন সেটি নেই। এমনকি এখন কৃষক নিজেরা বীজ সংরক্ষণ করে না। এর কারণ কী?
আলমগীর: দেশ যখন উন্নত হয় তখন একশ্রেণি অলস হয়ে যায়। অর্থাৎ তারা নিজেরা পরিশ্রম না করে বসে বসে খেতে চায়। আমাদের চা-দোকানে যত মানুষ বসে থেকে সময় নষ্ট করে তারা কাজ করলে কি অবস্থাটা দাঁড়াতো! দেশের অর্ধেন জনসংখ্যা নারী। তারা ঘরের ছাদে, চালে বা বাড়ির আঙ্গিনায় সবজি করলে অনেক উৎপাদন হতো। পরিবাবে কাজে আসতো। হাইব্রিডের কারণে এটি হচ্ছে না।
প্রশ্ন: শহরে ছাদবাগান হচ্ছে কিন্তু গ্রামীণ নারীরা কাজ করছে না?
আলমগীর: এটি সচেতনতার অভাবে হচ্ছে। শহরের লোকগুলো শিক্ষিত বেশি তারা হিসেব কষে। সামান্য জমিও ফাঁকা রাখছে না। কিন্তু গ্রামের অনেকের জমি নেই। টিভি দেখে অনেক কিছু শিখে কিন্তু গ্রামে হয়তো কৃষি অনুষ্ঠান না দেখে অন্যকিছু দেখে। তাতে সচেতনতা বাড়ে না। এদেশের মাটি খুব উর্বর। বীজ বপন করলেই ফসল হয়। যা বিশ্বের অন্যকোনো দেশে খুব কম। যার জমি নেই সেও কিন্তু সরকারি রাস্তায় চাষ করতে পারে। এতে কোনো মানুষ বাধা দিতে আসবে না। কৃষি কর্মকর্তা আছে কিন্তু সাধারণ মানুষকে বোঝায় না। তারা চাকরির মতো শুধু বেতন নিচ্ছে মানুষের সঙ্গে সম্পৃক্ত নয়।
প্রশ্ন: কৃষির সঙ্গে আবহাওয়ার সংযুক্তি থাকলেও আবহাওয়া অফিসের তথ্যের সঙ্গে কৃষকের যোগাযোগ নেই। এখন সব মোবাইলে রেডিও আছে? এক্ষেত্রে কীভাবে সমন্বয় করা যায়? আবহাওয়া উপযোগী চাষপদ্ধতির দিকে সরকার কেন যাচ্ছে না?
আলমগীর: সরকার আবহাওয়া উপযোগী চাষপদ্ধতির ব্যাপারে কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। সেগুলো উপকূল এলাকায়। সেখানে কি ধরনের ফসল ফলানো যায় ইত্যাদি।
আনন্দবাজার/শহক









