- বোরো চাষের সময়সীমা শেষ
- ১৫ মার্চের পর রোপিত চারা আউশ হিসেবে গণ্য হবে
- লোকসানের শঙ্কা থাকলেও ফাঁকা জমিতে চারা রোপনে ব্যস্ত চাষিরা
‘হাউস (শখ) করি এবার আউশের আবাদ করি। ফলন কী হয় হউক, ধান চাষে লসতো (লোকসান) হইবে। আবাদ না করি ভুঁই (জমি) ফ্যালে থুইয়া লাভ কী!’ বোরো চাষের সময় শেষ হলেও আলু উত্তোলনের পর ধানের চারা লাগানোর জন্য জমি তৈরিকালে এমন কথা বলেন রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার নবনীদাস গ্রামের চাষি নয়ন মিয়া। এমনি করে বোরো ধানের চারা রোপন শেষ হলেও সেচ সংকটসহ নানামূখী সমস্যায় এ বছর বোরো চাষে লোকসানের বোঝা বাড়ার শঙ্কায় রয়েছেন উত্তরের চাষিরা। তারপরও আলু, তামাকসহ ক্ষেত থেকে বিভিন্ন ফসল উত্তোলনের পর জমি ফাঁকা না রেখে আউশ আবাদে ঝুঁকছেন তারা।
কৃষি বিভাগ জানায়, বোরো রবি মৌসুমের ফসল। গত ১৫ মার্চ ছিল বোরো আবাদের শেষ সময়। এরপর গম, আলু, সরিষা ও তামাক উত্তোলনের পর ওই জমিতে যে চারা রোপন হচ্ছে তা খরিপ-১ মৌসুমের রোপা আউশ হিসেবে গণ্য হবে। চলতি মৌসুমে রংপুর কৃষি অঞ্চলের পাঁচ জেলায় এবারে পাঁচ লাখ পাঁচ হাজার ২৩৫ হেক্টর জমিতে বোরো চাষ করা হয়েছে। এতে প্রায় ২৩ লাখ মেট্রিক টনের বেশি চাল উৎপাদন হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
সরেজমিনে বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, বোরো ধানের চারা রোপন শেষ হতে না হতেই আগাম রোপনকৃত ক্ষেতের পরিচর্যায় ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন চাষিরা। অনেক কষ্টে চারা রোপন করলেও জ্বালানী তেলের দাম বৃদ্ধিতে সেচ নিয়ে উৎকণ্ঠায় রয়েছেন তারা। কাউনিয়া উপজেলার শহীদবাগ এলাকার বোরো চাষি সাজু মিয়া বলেন, ‘ফলন বেশি হলেও বোরো চাষে খরচ অনেক বেশি। কিন্তু ধানেরতো দাম নেই!’ গঙ্গাচড়া উপজেলার গজঘন্টা ইউনিয়নের কিশামত হাবু গ্রামের বোরো চাষি ওসমান আলী বলেন, ধানের দাম না থাকায় বোরো চাষিদের এমনিতে লোকসান গুণতে হবে। তার উপর সেচ সংকটে উৎপাদন কম হলে না খেয়ে চাষিদের মরতে হবে। নবনীদাস গ্রামের বোরো চাষি শমসের আলী জানান, জ্বালানী তেলের মূল্য বৃদ্ধি পাওয়ায় গতবারের তুলনায় এ বছর প্রায় দ্বিগুণ টাকা খরচ হচ্ছে জমিতে সেচ দিতে। তিনি বলেন, ‘চারা রোপন করে বেকায়দায় পড়েছি। এখন ঠিকমত সেচ দিতেও পারছি না। শ্যালোমেশিনের প্রতি ঘন্টা পানির দাম নেওয়া হচ্ছে ১০০ টাকা।’ অন্যদিকে মাঠে রোপনকৃত বোরো ক্ষেতগুলো গাঢ়সবুজ রঙ ধারণ করেছে। ফাঁকে ফাঁকে দেরিতে লাগানো আলু ও তামাক উত্তোলনের পর চাষিরা আউশের চারা রোপন করছেন। রংপুর নগরীর উত্তম এলাকার আবুল কাশেম ও আব্দুর রহমান বলেন, ‘হামরা বোরো-আউশ বুজি না। জমি ফাঁকা আছে তাই চারা নাগে থুই। ফলন যা হয় হইবে।’
চাষিদের সাথে কথা বলে জানা যায়, এক বিঘা জমিতে বোরো আবাদে এ বছর কমপক্ষে খরচ হবে ১২ হাজার ৭০০ টাকা। এর মধ্যে রয়েছে বীজসহ বীজতলা তৈরিতে ৫০০ টাকা, জমি তৈরিতে এক হাজার টাকা, চারা রোপনে এক হাজার টাকা, রাসায়নিক সার এক হাজার ৫০০ টাকা, নিড়ানী খরচ এক হাজার ৫০০ টাকা, সেচ প্রদান দুই হাজার টাকা, কীটনাশক ৫০০ টাকা, গোবর সার ৫০০ টাকা, কর্তন এক হাজার টাকা, মাড়াই ও পরিবহন খরচ এক হাজার ২০০ টাকা এবং জমির ভাড়া বাবদ দুই হাজার টাকা। চাষিরা জানান, প্রতি বিঘা জমিতে গড় ফলন ১৮ মণ ধরা হলেও মৌসুমের শুরুতে ৬০০ টাকা মণ ধরে যার মূল্য দাঁড়ায় ১০ হাজার ৮০০ টাকা। এতে প্রতি বিঘা জমির ধান উৎপাদনে এক হাজার ৯০০ টাকা লোকসান গুণতে হবে।
এদিকে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর রংপুর আঞ্চলিক কার্যালয় সূত্র জানায়, চলতি মৌসুমে রংপুর কৃষি অঞ্চলে পাঁচ লাখ তিন হাজার ৫৫০ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদের লক্ষ্যমাত্র ধরা হয়েছিল। এরমধ্যে নীলফামারীতে ৮১ হাজার ৫৫০ হেক্টর, রংপুরে এক লাখ ৩০ হাজার ৯৫০ হেক্টর, গাইবান্ধায় এক লাখ ২৭ হাজার ৮৪৫ হেক্টর, কুড়িগ্রামে এক লাখ ১৫ হাজার ৫৫৫ হেক্টর ও লালমনিরহাট জেলায় ৪৭ হাজার ৬৫০ হেক্টর। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয় ২২ লাখ সাত হাজার ১৩২ মেট্রিক টন চাল। তবে আবাদের শেষ দিন ১৫ মার্চ পর্যন্ত প্রায় পাঁচ লাখ পাঁচ হাজার ২৩৫ হেক্টর জমিতে বোরো চাষ হয়েছে। ১৫ মার্চের পর থেকে খরিপ-১ মৌসুমে রোপা আউশ লাগানো শুরু বলেও সূত্র জানায়।









