বিডার ২৪ দফা পরিকল্পনা
- বিদেশি বিনিয়োগ সহজ করতে উদার নীতিগ্রহণ
- ওএসএসের মাধ্যমে সেবার একত্রীকরণ
- উদার নীতিগ্রহণ, দু’বছর পর পর সম্মেলন
দেশে প্রথমবারের মতো আয়োজিত আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ সম্মেলন থেকে পাওয়া তিনশ কোটি টাকার বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে ২৪ দফা পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা)। এ বিষয়ে গতকাল সোমবার রাজধানী ঢাকার হোটেল রেডিসন ব্লু-ওয়াটার গার্ডেনে পোস্ট-ইভেন্ট ওয়ার্কশপের আয়োজন করা হয়। এতে অবকাঠামো উন্নয়নসহ প্রধানমন্ত্রীর বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি ও বিনিয়োগসহায়তা নীতিসহ দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের বাংলাদেশে বিনিয়োগের আগ্রহের বিষয়টি তুলে ধরা হয়।
২০২১ সালের ২৮ ও ২৯ নভেম্বর ঢাকায় আয়োজিত আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ সম্মেলনে প্রাধান্য দেয়া ১১টি খাতের মধ্যে রয়েছে তৈরি পোশাক ও বস্ত্র, বৈদ্যুতিক, ইলেকট্রনিক্স উৎপাদন, প্লাস্টিক, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, কৃষি ব্যবসা, স্বাস্থ্যসেবা ও ফার্মাসিউটিক্যালস, পুঁজিবাজার, আর্থিক পরিষেবা, পরিবহন ও লজিস্টিকস, পাওয়ার অ্যান্ড এনার্জি, চতুর্থ শিল্পবিপ্লব ও ব্লু ইকোনমি।
বিডার আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ বিভাগের পরিচালক আরিফুল ইসলাম এ ব্যাপারে মূলপ্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। তিনি আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ সম্মেলন থেকে পাওয়া বিনিয়োগ প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে বিনিয়োগ পরিবেশ সংস্কার সংক্রান্ত ২৪টি সুপারিশমালা ও সেগুলো বাস্তবায়নে পরিকল্পনা তুলে ধরেন। একই সঙ্গে ভারত, চীন, জাপান, সৌদি আরব ও যুক্তরাজ্য সরকারের শীর্ষ প্রতিনিধিদের বিনিয়োগ সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি এবং সুনির্দিষ্ট গন্তব্য হতে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে বিডার পদক্ষেপ ও পরিকল্পনা সম্বন্ধে নানা দিক বিশ্লেষণ করেন। সেই সঙ্গে সেক্টর ও প্রতিষ্ঠান উল্লেখসহ তিনশ কোটি টাকার বেশি বিনিয়োগ চুক্তি, সমঝোতা স্মারক এবং ঘোষণাপত্রও তুলে ধরেন।
এ সময় বিনিয়োগ বিকাশে বিশেষজ্ঞ অংশগ্রহণকারীরা জরুরি পরামর্শ প্রদান করেন। তাদের পরামর্শের ভিত্তিতে ২৪টি সংস্কারমূলক সুপারিশ তৈরি করা হয়। অবকাঠামো, আর্থিকখাত এবং পুঁজিবাজার, সেবা, ম্যানুফ্যাকচারিংখাতের উন্নয়ন সংশ্লিষ্ট সুপারিশমালা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে জমা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।
অবকাঠামোতে পরিকল্পনাগুলো হলো-
১. বিদ্যুৎ সঞ্চালনে বেসরকারিখাতের অনুমোদন সংক্রান্ত নীতি তৈরিকরণ।
২. লজিস্টিক খরচ কমাতে জাতীয় লজিস্টিক কৌশল প্রণয়ন এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীদের ইক্যুইটি ক্যাপ পুনর্বিবেচনাকরণ।
৩. পরিবহনখাতকে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগের জন্য উন্মুক্তকরণ।
৪. বন্দর তদারকি ও পরিচালনায় প্রাইভেট সেক্টরের অংশগ্রহণ এবং এফডিআই’র জন্য বন্দর উন্নয়নসহ উন্মুক্তকরণ, বন্দরের জন্য ল্যান্ডলর্ড মডেল গ্রহণ এবং দ্রুত পরিচালনার জন্য আইটি সিস্টেম একীভূতকরণ।
৫. বিদেশি মালিকানার বিধিনিষেধ শিথিল করে আন্তর্জাতিক লজিস্টিক বিনিয়োগকারীদের জন্য প্রবেশের বাধাদূরকরণ, সরবরাহ এবং গুদামজাতকরণের জন্য উন্নত মোবাইল নেটওয়ার্কভিত্তিক ডিজিটাল ট্রাকিং চালুকরণ ও গুনগতমান উন্নত করা প্রয়োজন।
৬. জাতীয় পারফরম্যান্স স্ট্যান্ডার্ড অনুযায়ী প্রতিযোগিতামূলক স্থায়ী সবুজ অর্থনৈতিক অঞ্চলের নির্দেশিকা তৈরি এবং প্রয়োগ নিশ্চিতকরণ।
৭. উন্নত বাংলাদেশ বিনির্মাণের লক্ষ্যে অধিক পরিমাণ এফডিআই আকৃষ্ট করতে আন্তর্জাতিক সর্বোত্তম সুযোগ সুবিধা সম্বলিত পিপিপি কাঠামোকে আধুনিকীকরণ।
আর্থিকখাত এবং পুঁজিবাজার সংক্রান্ত পরিকল্পনাগুলো-
১. নন-পারফর্মিং লোন (এনপিএল) রেজোলিউশন এবং এনপিএল বাজার সৃষ্টির জন্য পর্যাপ্ত নীতিগত ব্যবস্থা গ্রহণ।
২. শিল্প অর্থায়নের চাহিদা মেটাতে বিদেশি বাণিজ্যিক ঋণ গ্রহণকে উৎসাহিত করতে বৈদেশিক মুদ্রার ব্যবস্থাকে আরও উদারীকরণ নীতি গ্রহণ।
৩. ব্যবসায়িক পুনর্গঠন এবং কোভিড-১৯ পরবর্তী পুনরুদ্ধারের জন্য দেউলিয়া আইনকে আধুনিকরণ।
৪. এসএমইখাতে পর্যাপ্ত বিনিয়োগ নিশ্চিতকরণ এবং সুরক্ষিত বিল প্রণয়নকরণ।
৫. ব্যাসেল আইআইআই এবং আইএফআরএস-৯ মেনে চলার জন্য বিদেশি বিনিয়োগকারীদের ব্যাংকিং এবং বিমা পরিষেবা এবং আর্থিক প্রতিবেদন এবং তত্ত্বাবধানে বিনিয়োগ করার অনুমতি দেওয়ার জন্য আর্থিকখাতে বিস্তৃত সংস্কার গ্রহণ করতে হবে।
৬. নতুন নতুন আর্থিক উপকরণ প্রবর্তনের জন্য এবং বন্ড বাজারের আকর্ষণ নিশ্চিত করতে সক্ষমতা বৃদ্ধিকরণ।
৭. ঋণ এবং ইক্যুইটি বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে পুঁজিবাজারের আধুনিকীকরণ এবং বিনিয়োগগকারীদের সুরক্ষার জন্য প্রবিধান ও নির্দেশিকা তৈরীকরণ।
৮. জাতীয় টেকসই (লেবেলযুক্ত) বন্ড এর গাইডালাইন পপ্রণয়ন, বিকাশ এবং সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।
৯. ইসলামী ব্যাংকিং সেবা এর জন্য প্রবিধান এবং নির্দেশিকা তৈরিকরণ।
সেবাখাতের পরিকল্পনাগুলো-
১. আইটি সেক্টরে এফডিআই আকৃষ্ট করার জন্য নির্দেশিকা ও নিয়ন্ত্রক কাঠামো তৈরি করতে হবে এবং ফ্রিল্যান্সিংকে উৎসাহিত করার জন্য যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ।
২. আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলিকে বাংলাদেশে তাদের কার্যক্রম খোলার অনুমতি দেওয়ার জন্য শিক্ষা আইন পুনর্বিবেচনাকরণ।
ম্যানুফ্যাকচারিংখাতের পরিকল্পনাগুলো-
১. উৎপাদন খাতে আন্তর্জাতিক পরিবেশ ও সামাজিক মানদণ্ড গ্রহণ।
২. উচ্চ সম্ভাবনাময় রপ্তানি পণ্যের জন্য ট্যারিফ এবং প্যারা ট্যারিফ (হ্রাস) যুক্তিযুক্তকরণ।
৩. আন্তর্জাতিক মান পূরণের জন্য খাদ্য নিরাপত্তা এবং খাদ্যের গুণমানের মান নিশ্চিতকরণ।
সাধারণখাতে পরিকল্পনাগুলোর মধ্যে রয়েছে-
১. সকল ওয়ান-স্টপ সার্ভিসকে একত্রিত করে এবং ব্যবসা-সম্পর্কিত পরিষেবাগুলোকে একীভূত করে একটি একক ওয়ান স্টপ শপ তৈরি করতে হবে।
২. সকল সরকার-টু-ব্যবসা পরিষেবা এবং প্রবিধানগুলির জন্য স্বচ্ছতা এবং পদ্ধতিগত স্পষ্টতা নিশ্চিতকরণ।
৩. উদ্ভাবনী ব্যবসাকে সব ধরনের সহযোগিতা করার জন্য যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।
এছাড়াও বেশি করে বিনিয়োগ বিকাশের লক্ষ্যে নিয়মিত দ্বি-বার্ষিকভাবে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ শীর্ষ সম্মেলনের আয়োজন, সম্মেলনের জন্য কার্যকারী তহবিল গঠনের পরিকল্পনা করা হয়। বিনিয়োগের সম্ভাবনার ক্ষেত্রেগুলো চিহ্নিতকরণ তার ভিত্তিতে নেটওয়ার্কিং ব্যবস্থা গড়ে তোলা ছাড়াও ব্যবসায়িক চুক্তি-সমঝোতা স্মারক এবং বিনিয়োগ ঘোষণার সময় পরিশ্রুতির সুরক্ষিত করার ব্যাপারে আলোচনা হয়।
বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান মো. সিরাজুল ইসলাম ভার্চুয়ালি (অসুস্থ থাকায়) সভায় যোগ দেন। প্রধান অতিথি ছিলেন বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি ও বিশেষ অতিথি ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি উন্নয়ন বিষয়ক উপদেষ্টা সালমান ফজলুর রহমান প্রমুখ।









