- উত্তরে জমজমাট বোরো ধানের চারা কেনাবেচার হাট
- বীজতলা থেকে চায়ের দোকানে উঠে এসেছে চারা
- এক মুঠো চারার দাম পাঁচ টাকা, বিঘায় প্রয়োজন তিন হাজার ৩০০ টাকার চারা
- চারার সংকট নেই, দাবি কৃষি বিভাগের
‘ভালো বীজে ভালো ফলন’ শ্লোগানটি আধুনিক কৃষির সঙ্গে যোগ হলেও ফসল আবাদের পূর্বেই প্রস্তুতি হিসেবে বীজ সংরক্ষণ বা চারা তৈরি কৃষকের চিরায়ত ঐতিহ্য। রোপা আমন কিংবা বোরো ধানের চারা রোপনের নির্দিষ্ট সময়ের এক থেকে দেড়মাস আগে কৃষকরা বীজতলায় চারা তৈরি করেন। আগেকার দিনে প্রয়োজনের চেয়ে বেশি জমিতে বীজতলা করায় চারার ঘাটতি তেমন হতো না। এখনকার দিনে কৃষকরা জমির স্বল্পতা ও বীজের উচ্চ মূল্যের কারণে প্রয়োজন অনুযায়ী হিসেব করেই চারা তৈরি করেন। তারপরও প্রাকৃতিক দূর্যোগসহ কোনো কারণে যদি চারার সংকট হয় সে ক্ষেত্রে অন্য কৃষকের বীজতলা কিনে নিয়ে ঘাটতি মোকাবেলা করাই ছিল কৃষকের অনেক আগের গল্প।
বর্তমান সময়ের গল্পটা একটু অন্য রকম। কার বীজতলায় চারা আছে, কোন্ জাতের বীজের চারা কিংবা চারার বয়স কত-এতসব খুঁজে দেখার সময় নেই ব্যস্ত কৃষকের। তাইতো ক’বছর ধরে উত্তরাঞ্চলের হাট-বাজারে বিশেষ করে আমন ও বোরো মৌসুমে ধানের চারা কেনা-বেচা হচ্ছে। প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র কৃষকসহ বর্গা চাষিরা বীজতলা করার মতো জমি না থাকাসহ ঝক্কি-ঝামেলা এড়াতে বাজারে কেনা চারার ওপরই নির্ভর করেন। এ সুযোগকে পুঁজি করে চারার বাজার জমজমাট করে তুলেছে ব্যবসায়ীরা। আরো এক ধাপ এগিয়ে রংপুরের গঙ্গাচড়ায় এ বছর বীজতলা থেকে বোরো ধানের চারা উঠে এসেছে চায়ের দোকানে। প্রতি গন্ডা (চার মুঠা) চারা বিক্রি হচ্ছে ২০ টাকায়।
প্রতি বছর শৈত্যপ্রবাহ ও ঘন কুয়াশার কারণে কোল্ড ইনজুরীতে বোরো ধানের চারার কিছুটা ক্ষতি হয়। বোরো আবাদের ভরা মৌসুমে চারা সংকটের কারণে প্রতি রাতে বীজতলা থেকে চুরি হয় ধানের চারা। দু’একজন কৃষক অনেক কষ্টে চারা রক্ষা করলেও তার দাম আকাশচুম্বি। এ কারণে প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র কৃষকরা শেষ সময়ে বোরো আবাদ নিয়ে শংকিত হয়ে পড়েন।
১০ কিলোমিটার দূরের নবনীদাস গ্রাম থেকে পায়ে হেঁটে রংপুরের বেতগাড়ি হাটে এসে আব্দুল হাকিম নামক এক কৃষক অন্যকে জিজ্ঞেস করছিলেন, ‘বাহে বেছনহাটি (যেখানে চারা কেনা-বেচা হয়) কোন্টে? বেছনের ঘাটতি পড়ছেতো!’ ওই কৃষকের সঙ্গে সেখানে গিয়ে দেখা গেল, প্রচুর কেনাবেচা হচ্ছে বোরো ধানের চারা। বীজতলা থেকে চারা উত্তোলন করে আাঁটি (মুঠো) বেঁধে বিক্রির জন্য হাটে আনা হয়েছে। নিজেদের ঘাটতি পূরণে এখান থেকে চারা কিনে বস্তা কিংবা ডালিতে করে নিয়ে যাচ্ছেন প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র কৃষকরা। গঙ্গাচড়ার বড়াইবাড়ী হাটে গিয়ে জানা যায়, চায়ের দোকানে বোরো ধানের চারা বিক্রি হচ্ছে। কৌতুহল বশত: ওই দোকানে গিয়ে দেখা যায়, কৃষকরা সেখান থেকে কিনে নিচ্ছেন প্রয়োজন অনুযায়ী চারা। চারা কিনতে আসা মন্ডলেরহাট এলাকার কৃষক বেলাল হোসেন জানান, কোথাও চারা মিলছে না। এখানে প্রতি গন্ডা চারার মুঠা বিক্রি হচ্ছে ২০ টাকা দরে। অর্থাৎ এক মুঠা দাম পড়ে পাঁচ টাকা। প্রতি শতক জমিতে ৫ গন্ডা (২০ মুঠা) চারা প্রয়োজন। পাইকান এলাকার কৃষক ইব্রাহীম আলী জানান, প্রতি বিঘা (৩৩ শতাংশ) জমিতে চারা রোপন করতে প্রায় ৬৬০ মুঠা চারা প্রয়োজন। যার দাম পড়ে তিন হাজার ৩০০ টাকা। দোকানদার আব্দুল জলিল জানান, বীজতলা থেকে চারা চুরি হওয়ায় বিপাকে পড়েন তিনি। তাই তার চায়ের দোকানে এনে বিক্রি করছেন।
রংপুর নগরীর লালবাগ হাটে গিয়ে দেখা যায়, বিক্রির জন্য চারা উঠলেও দাম বেশি হওয়ায় সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন না কৃষকরা। এখানেও প্রতি গন্ডা চারা ২০ টাকার নিচে মিলছে না। চারা কিনতে আসা পাশ্ববর্তী বড়বাড়ি এলাকার কৃষক ওছমান আলী জানান, জমিতে রোপনের জন্য তিনি বীজতলা করেছিলেন। কিন্তু কুয়াশায় নষ্ট হয়ে গেছে। তাই বাধ্য হয়ে চারা কিনতে হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘আলু তুলি (উত্তোলনের পর) ওই জমিত বোরো নাগবার কতা। তয় এত দামে চারা কিনলে হামার পোষবার নয় (লাভ হবে না)।’
কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা যায়, চলতি মৌসুমে রংপুর অঞ্চলের পাঁচ জেলায় পাঁচ লাখ তিন হাজার ৫৫০ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এরমধ্যে রয়েছে রংপুরে এক লাখ ৩০ হাজার ৯৫০ হেক্টর, গাইবান্ধায় এক লাখ ২৭ হাজার ৮৪৫ হেক্টর, কুড়িগ্রামে এক লাখ ১৫ হাজার ৫৫৫ হেক্টর, লালমনিরহাটে ৪৭ হাজার ৬৫০ হেক্টর এবং নীলফামারীতে ৮১ হাজার ৫৫০ হেক্টর। বোরো আবাদের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে এই পাঁচ জেলায় ২৩ হাজার ৯০ হেক্টর জমিতে বীজতলা করা হয়েছে। এক হেক্টরের বীজতলার চারা দিয়ে ২০ হেক্টর জমি রোপন করা সম্ভব। ১৫ মার্চ পর্যন্ত বোরো আবাদের সময় আছে উল্লেখ করে সূত্র জানায়, যে হারে চারা লাগানো হচ্ছে তাতে ওই সময়ে লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যাবে। অন্যান্য বছরের তুলনায় এবারে চারার তেমন ঘাটতি নেই। আলু উত্তোলনের পর শেষ পর্যায়ে পরিকল্পনা ছাড়াই বোরো চাষ করছেন এমন দু’চারজন কৃষকের চারার ঘাটতি পড়লেও তারা বিভিন্ন স্থান থেকে তা সংগ্রহ করে নিচ্ছেন।









