- প্রতিদিন বিক্রি অর্ধকোটি টাকা
- পুঁটি মাছ রফতানিতে আয় ৫০ কোটি টাকা
করোনা সংকট কাটিয়ে আবারও ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছেন দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম সৈয়দপুর শুঁটকি আড়তের ব্যবসায়ীরা। দেশের আভ্যন্তরীণ বাজারে শুঁটকির চাহিদা বাড়ায় আড়তে ক্রেতা-শ্রমিকদের উপস্থিতিতে প্রাণচাঞ্চল্য ফিরেছে। সরগরম হয়ে উঠেছে বিকিকিনির প্রতিদিনের আয়োজন।
জানা যায়, বৈশ্বিক মহামারি করোনার প্রভাবে প্রায় দেড় বছর ব্যবসা বন্ধ ছিল ঐতিহ্যবাহী এ শুকনা মাছের বাজার। এ সময় ন্যূনতম ১০০ টন শুঁটকি পঁচে যায়। যার বাজারমূল্য ছিলো ১০ থেকে ১২ কোটি টাকা। দীর্ঘ মেয়াদে শুঁটকি সংরক্ষণের প্রয়োজনীয় হিমাগার সুবিধা না থাকায় এমন ক্ষতিরমুখে পড়তে হয় ব্যবসায়ীদের। অপরদিকে করোনার আগে ১২০ ট্রাক পুঁটি মাছের শুঁটকি ভারতে রপ্তানি করা হয়। কোভিড-১৯ পরিস্থিতির কারণে সেই শুঁটকি বিক্রির টাকাও এখন পর্যন্ত ছাড় না হওয়ায় চরম পুঁজি সংকটে পড়েছে রপ্তানিকারকরা। এতে প্রায় সব ব্যবসায়ীই ব্যাংক ঋণে বেশামাল হয়ে পড়েছেন। আগের মজুদকৃত শুঁটকি নষ্ট হওয়ায় যেমন বিক্রি করা যাচ্ছিল না তেমনি নতুন করে আমদানি করাও সম্ভব হচ্ছিল না। এমন পরিস্থিতিতে নিজস্ব প্রচেষ্টায় পারস্পারিক সোমঝোতার ভিত্তিতে দেশীয় ক্ষেত্রগুলো থেকে নতুন শুঁটকি বাকিতে লেনদেনের মাধ্যমে নবউদ্যোমে শুরু করেন ব্যবসায়ীরা।
এভাবে আয়কৃত সীমিত মুনাফা দিয়েই চলছে ঋণ পরিশোধ করাসহ কর্মচারীর মজুরী প্রদান ও ব্যবসার পরিধি বৃদ্ধির সংগ্রাম। সাফল্যের মুখও দেখতে পাচ্ছেন তারা। পাশাপাশি সরকারি প্রণোদনার অধীনে ঋণ পরিশোধের মেয়াদ বৃদ্ধি ও রেয়াত সুবিধা পেয়ে হাফ ছেড়ে বেঁচেছে ব্যাংক ঋণগ্রহীতারা।
ব্যবসায়ী নেতারা বলছেন, ১৯৮০ সাল থেকে সৈয়দপুরে বাস টার্মিনালের পাশ ঘেঁষে গড়ে ওঠে এ শুঁটকির বাজার। কারও কারও কাছে এটি শুঁটকির বন্দর হিসেবে পরিচিত। এখানে প্রায় ৭০ জন ব্যবসায়ী শুঁটকির ব্যবসার সাথে জড়িত। এর মধ্যে মোকাম রয়েছে ১৩ টি।
এগুলোতে প্রায় শতাধিক জাতের শুটকি মাছ বিক্রি করা হয়। এখানে দেশ বিদেশের পাইকারী ও খুচরা ব্যবসায়ীরা আসেন প্রতিদিন। দৈনিক প্রায় অর্ধ কোটি টাকার ব্যবসা হয়। তাই এখানে প্রায় ৫ শতাধিক শ্রমিক খুঁজে পেয়েছে তাদের উপার্জনের পথ।
শুঁটকি ব্যবসায় চট্টগ্রাম দেশের প্রথম স্থানে রয়েছে। অর্থনৈতিক দিক বিবেচনা করলে তার দ্বিতীয় স্থানে সৈয়দপুর। এখানে চট্টগ্রাম, খুলনা, পাবনা ও বরিশাল, বরগুনা, সাতক্ষীরাসহ দেশের বিভিন্ন শুঁটকির মোকাম থেকে সামুদ্রিক ও দেশীয় শুকনা মাছ (শুঁটকি) আমদানি করা হয়। এরপর এসব মাছ দেশের বিভিন্ন প্রান্তের ব্যবসায়ীরা কিনে নিয়ে যান। প্রতি মাসে সৈয়দপুরে শুঁটকি ব্যবসায় কয়েক কোটি টাকার লেনদেন হয়। আমদানি নয়, সৈয়দপুরের আড়ত থেকে বছরে প্রায় দেড়শত ট্রাক শুঁটকি রপ্তানি করা হয় ভারতে। শুধুমাত্র পুঁটি মাছ রপ্তানি করেই ৫০ কোটি টাকার বেশি আয় করা হয়।
আড়তের অনেক পুরাতন ব্যবসায়ী ছফর উদ্দীন মুন্সী জানান, করোনার পর থেকে এ ব্যবসায় চলছে চরম মন্দাভাব। করোনার মহামারীর মধ্যেও অনেকে পুঁটি মাছের শুঁটকি গুদামজাত করে ফেলে রাখায় ক্ষতির মুখে পড়েছেন। ব্যাংক ঋণ পরিশোধ করতে না পারায় ইতোমধ্যে দেউলিয়া হয়েছেন ২০ শতাংশ ব্যবসায়ী। এছাড়াও ব্যাংকের চাপের কারণে অনেক ব্যবসায়ী এখন এলাকাছাড়া। এতে বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছিল ঐতিহ্যবাহী এ শুঁটকির বন্দরটি।
দেশী মাছের মধ্যে পুঁটি, সোল, চিংড়ি, লইট্টা, ফ্যাসা মাছের শুঁটকি অনেক সাশ্রয়ী মূল্যে বিক্রি হচ্ছে। নিম্নে ১০০ টাকা থেকে ৫০০ টাকা কেজি দরের মধ্যেই পাওয়া যাচ্ছে এসব মাছ। গতবারের চেয়ে এ দাম প্রায় অর্ধেক। তবে চ্যালা মাছ বার্মা থেকে না আসায় এখনও দাম বেশ চড়া। তিনি বলেন, সব সংকট ক্রমেই দূর হয়ে যাচ্ছে। তাই আমরা আশা করছি এই শুটকির বন্দর অতীতের মতো আবারও প্রাণচাঞ্চল্যতা ফিরে পাবে।
সৈয়দপুর উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা সানী খান মজলিস বলেন, উত্তরাঞ্চলে সবচেয়ে বড় শুঁটকি মাছের আড়তে বছরে কমপক্ষে সাড়ে ৪ হাজার টন মাছ বিক্রি হয়। আমদানি নির্ভর মাছের বাজারে সুখের খবর হচ্ছে, সৈয়দপুর থেকে কয়েক কোটি টাকার পুঁটি মাছ রপ্তানিও করা হয়। তবে করোনার কারণে ব্যবসায়ীরা কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। সরকারিভাবে তাদের ৪ শতাংশ সুদে ঋণের ব্যবস্থা করা হচ্ছে।
সৈয়দপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শামীম হুসাইন বলেন, মাছ সংরক্ষণের জন্য সরকারিভাবে দেশের কোথাও হিমাগার নেই। এ কারণে সরকারিভাবে এখানে হিমাগার করার সুযোগ নেই। তবে বেসরকারিভাবে কেউ করতে চাইলে তাকে সহযোগিতা করা হবে।









