- রাশিয়ার সামরিক অভিযানে হতাহত শতাধিক
- সাইবার পরিসরেও হামলার শিকার ইউক্রেন
বৃহস্পতিবারের ভোরটি অন্যদিনের মতো ছিল না ইউক্রেনের। এদিন সকাল ছয়টায় দেশটিতে সামরিক অভিযান চালানোর নির্দেশ দিয়েছেন রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। তার আগে ভোর ৫টায় বেলারুশের প্রেসিডেন্ট আলেক্সান্ডার লুকাশেঙ্কোকে ফোন করেন তিনি। এ দিন টেলিভিশনে হাজির হয়ে পুতিন ঘোষণা করেন ‘আমি ইউক্রেনে সামরিক অভিযানের সিদ্ধান্ত নিয়েছি’।
অবশ্য কয়েক সপ্তাহ যাবত ইউক্রেনে রুশ হামলার ব্যাপারে আশঙ্কা করা হচ্ছিল। অবশ্য ২১ ফেব্রুয়ারি পূর্ব ইউক্রেনের রুশপন্থী বিদ্রোহীদের দুই অঞ্চল দোনেৎস্ক ও লুহানস্ককে স্বাধীন রাষ্ট্রের স্বীকৃতি দেন পুতিন।
গতকাল প্রেসিডেন্ট পুতিন সামরিক অভিযান পরিচালনার নির্দেশ দেওয়ার পর ইউক্রেনের কয়েকটি শহরে বিভিন্ন দিক থেকে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে রাশিয়ার সামরিক বাহিনী। আক্রমণ শুরুর প্রথম এক ঘণ্টায় ইউক্রেনের ৪০ জনের বেশি সৈন্য এবং ১০ বেসামরিক নাগরিকের প্রাণহানি ঘটেছে। অন্যদিকে, ইউক্রেনে বলছে, পাল্টা প্রতিরোধে রাশিয়ার অন্তত ৫০ দখলদার সৈন্য নিহত হয়েছেন।
বিস্ফোরণ ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মধ্যে ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভের বাসিন্দারা রয়েছে আতঙ্কে। প্রাণ বাঁচাতে তাদের অনেকেই পাতালরেলের স্টেশনে ছুটছে। হামলা থেকে বাঁচতে এই স্টেশনকে নিরাপদ মনে করছে কিয়েভবাসী। খবর বিবিসির। তবে স্থল হামলা চালিয়েই থেমে থাকেনি রাশিয়া। ইউক্রেন সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ওয়েবসাইটগুলোও সাইবার হামলার শিকার হয়েছে। সিএনএন অনলাইনের প্রতিবেদনে এই তথ্য জানানো হয়।
বিবিসির পূর্ব ইউরোপের প্রতিনিধি সারাহ রেইনসফোর্ড ইউক্রেনের দনবাস অঞ্চলের ক্রামাতোরস্ক শহর থেকে খবর সংগ্রহ করছেন। তিনি বলেন, সামনে কী হবে, তা ভেবে শহরটির বাসিন্দারা শোকাহত ও আতঙ্কিত। অনেকেই বাসে শহর ছেড়ে পালাচ্ছে। কিয়েভের পরিস্থিতি সম্পর্কে এখনো স্পষ্ট করে কিছু বলা যাচ্ছে না।
লুহানস্ক ও দোনেৎস্ককে ছয় দেশের স্বীকৃতি: রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিন বলেন, সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে দনবাসে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া দরকার। দনবাসের স্বাধীন দুটি প্রজাতন্ত্র আমাদের কাছে সাহায্য চেয়ে অনুরোধ করেছে। জাতিসংঘ সনদের সপ্তম অধ্যায়ের ৫১ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সেখানে বিশেষ সামরিক অভিযান পরিচালনার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।
হতাহত: ইউক্রেন জানিয়েছে, তাদের সৈন্যরা রাশিয়ার অন্তত ৫০ দখলদার সৈন্যকে হত্যা করেছে। ইউক্রেনের বিভিন্ন শহর লক্ষ্য করে রাশিয়ার সামরিক বাহিনীর অভিযান শুরুর কয়েক ঘণ্টার মধ্যে কিয়েভ এই দাবি করে। ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলে রাশিয়ার পাঁচটি বিমান এবং একটি হেলিকপ্টার ভূপাতিত করার দাবি জানিয়েছে দেশটির সামরিক বাহিনী। পরবর্তীতে আরও একটি বিমান ধ্বংস করা হয়েছে বলে জানিয়েছে ইউক্রেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রণালয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম টুইটারে দেওয়া এক বার্তায় ইউক্রেনের সশস্ত্র বাহিনী বলেছে, শচস্ত্য শহর এখন ইউক্রেনের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। রাশিয়ার ৫০ দখলদার সৈন্য নিহত হয়েছে। ক্রামতোর্স্ক জেলায় রাশিয়ার আরেকটি বিমান ধ্বংস করা হয়েছে। এটি নিয়ে ছয়টি বিমান ধ্বংস করা হয়েছে।
রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, একেবারে নিখুঁত অস্ত্র ব্যবহার করে ইউক্রেনের বিমান বাহিনীর ঘাঁটি এবং সামরিক স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।
রাশিয়া-ইউক্রেন কূটনৈতিক সম্পর্ক বিছিন্ন
রাশিয়ার সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন করার ঘোষণা দিয়েছেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভ্লোদিমির জেলেনস্কি। রাশিয়ার সামরিক আক্রমণ শুরুর পর বৃহস্পতিবার টেলিভিশনে দেওয়া এক ভাষণে এই ঘোষণা দিয়েছেন তিনি।
রুশ সৈন্যদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে দেশের জনগণকে অস্ত্র হাতে তুলে নেওয়ার পাশাপাশি ইউক্রেনের সশস্ত্র বাহিনীকে সহায়তার আহ্বান জানান জেলেনস্কি। এছাড়া ইউক্রেনকে রক্ষায় ইচ্ছুক কারো ওপর পূর্বে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়ে থাকলে এখন তা প্রত্যাহার করে নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তিনি।
শত্রুরা গুরুতর ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে এবং এই ক্ষতি আরও বাড়বে বলে সতর্ক করে দিয়ে জেলেনস্কি বলেছেন, দেশের সরকার ইউক্রেনের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় ইচ্ছুক প্রত্যেকের কাছে ‘ইতোমধ্যে অস্ত্র বিতরণ শুরু’ করছে।
পুরো ইউক্রেন দখলের ইচ্ছা নেই: পুতিন
সদ্য স্বাধীনতার স্বীকৃতি দেওয়া ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলীয় গণপ্রজাতন্ত্রী দনেৎস্ক এবং লুহানস্ককে কিয়েভের আগ্রাসন থেকে রক্ষার জন্য দেশটিতে বিশেষ সামরিক অভিযান শুরুর নির্দেশ দিয়েছেন বলে দাবি করেছেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। এছাড়া ইউক্রেন দখলে নেওয়ার রাশিয়ার কোনো পরিকল্পনা নেই বলে বৃহস্পতিবার দাবি করেছেন তিনি।
বৃহস্পতিবার রাষ্ট্রায়ত্ত টেলিভিশনে দেওয়া ভাষণে পুতিন বলেন, সামরিক অভিযানের চূড়ান্ত উদ্দেশ্য হলো- গত আট বছর ধরে কিয়েভ শাসকদের গণহত্যার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হওয়া লোকজনকে রক্ষা করা। একই সঙ্গে ইউক্রেনকে অসামরিকীকরণ এবং নাৎসিবাদমুক্ত করবে মস্কো। এছাড়া যারা বেসামরিক নাগরিকদের বিরুদ্ধে বহুমুখী নৃশংসতা চালিয়েছে তাদের বিচারের মুখোমুখি করা হবে।
পুতিন আরো বলেন, ইউক্রেনের পুরো ভূখণ্ড দখলে নেওয়ার কোনো সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা নেই মস্কোর। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট বলেন, ইউক্রেনের ভূখণ্ডগুলো দখলের পরিকল্পনা আমাদের নেই। আমরা কারও ওপর জোর করে কোনো কিছু আরোপ করতে যাচ্ছি না। কিয়েভের সৈন্যরা এখনও রাশিয়ার স্বাধীন ঘোষণা করা দনেৎস্ক এবং লুহানস্ক অঞ্চলের বিশাল অংশের নিয়ন্ত্রণ করছে।
মানবতার দোহাই, যুদ্ধ বন্ধ করুন
রুশ প্রেসিডেন্টকে ‘মানবতার দোহাই’ দিয়ে জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস বলেছেন, ইউক্রেনে রাশিয়ার সামরিক অভিযান আমার মেয়াদের সবচেয়ে ‘দুঃখজনক ঘটনা’। জাতিসংঘ মহাসচিব বলেন, আমি প্রেসিডেন্ট পুতিনের উদ্দেশে হৃদয়ের গভীর থেকে বলতে চাই- প্রেসিডেন্ট পুতিন, আপনাকে মানবতার দোহাই, যুদ্ধ বন্ধ করুন, ইউক্রেন থেকে আপনার সৈন্যবহর ফিরিয়ে নিন এবং সেখানে শান্তি স্থাপনের জন্য দায়িত্বশীল হোন। ইতোমধ্যে গত কয়েক বছরে ওই অঞ্চলে বহু মানুষের মৃত্যু হয়েছে।









