দেশের দক্ষিণাঞ্চলের সর্বশেষ জেলা সাতক্ষীরার বিস্তীর্ণ বিল সবুজ-সোনালি ধানের মিষ্টি ধানের গন্ধ হারিয়েছে আগেই। সে জায়গা দখল করেছে সাদা সোনা খ্যাত চিংড়ির ঘের। বড় বড় বিলগুলো এখন আইল ঘেরা লোনা ও মিঠা পানির জলাশয়। তবে লবণ পানি সবুজ গ্রাস করে, নষ্ট করে আশপাশের ফসল- বদ্ধমূল এ ধারণার আমূল পরিবর্তন ঘটিয়েছে জেলার মাছচাষিরা। সাতক্ষীরার কৃষিসম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ঘামারবাড়ি) প্রচেষ্টায় বিগত কয়েকবছর ধরে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে মাছের ঘেরের পাড়ে সবজি চাষ। ‘সাথী ফসল’ হিসেবে শুরু হলেও এখন মূল ফসলের সঙ্গে পাল্লা দিচ্ছে সমানে সমান। মাচায় বা ঘেরের আইলে সবজি আর নিচে পানিতে মাছ চাষ হচ্ছে। আর এখানে উৎপাদিত সবজি পুরোটাই বিষমুক্ত। ফলে, এর চাহিদাও রয়েছে দেশজুড়ে। জেলায় বছর প্রতি যে পরিমাণ সবজি উৎপাদন হয়ে থাকে তার ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ উৎপাদিত হয় ঘেরের আইলে ও মাচা পদ্ধতিতে। ঘেরের আইলে সবজি চাষ লাভজনক হওয়ায় জেলার অধিকাংশ মৎস্য ঘেরে সবজির চাষাবাদ দিন দিন বাড়ছে। ফলে জেলার চাহিদা মিটিয়ে দেশের অন্যান্য জেলায়ও রপ্তানি হচ্ছে সাতক্ষীরার সবজি।
সাতক্ষীরা কৃষিসম্প্রসারণ অধিদপ্তর (ঘামারবাড়ি) সূত্রে জানা যায়, চলতি বছর জেলার ৮৭৫ হেক্টর জমির (মৎস্য ঘেরের ভেড়িঁ) আইলে বিভিন্ন প্রকারের সবজি চাষ হয়েছে। এবার সবচেয়ে বেশি সবজির চাষ হয়েছে সাতক্ষীরা সদর উপজেলায় আর সবচেয়ে কম চাষ হয়েছে দেবহাটা উপজেলার মৎস্য ঘেরের আইলে।
সাতক্ষীরা সদর উপজেলার মংস্য ঘেরের ৩৪০ হেক্টর জমির (মৎস্য ঘেরের ভেড়িঁ) আইলে সবজি চাষ হয়েছে, তালায় ১৬৫ হেক্টর, কলারোয়ার ৫৫ হেক্টর, আশাশুনি ৮০ হেক্টর, কালিগঞ্জে ১৩৫ হেক্টর, দেবহাটায় ২০ হেক্টর, ও শ্যামনগর উপজেলার মৎস্য ঘেরের ৮০ হেক্টর জমির আইলে সবজির চাষ হয়েছে। জেলার মোট চাষকৃত মৎস্য ঘেরের জমির আইলে হেক্টর প্রতি গড় ১৯ মেট্রিকটন হারে সবজি উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ১৬ হাজার ৬২৫ মেট্রিকটন।
জানা যায়, মৎস্য ঘেরের আইলে বিশেষ পদ্ধতিতে বাঁশ ও জাল দিয়ে ঝুলন্ত মাচা তৈরি করা হয়। তারপর বিষমুক্ত সবজির আবাদ করে বাড়ন্ত গাছ মাচার ওপর ছড়িয়ে দেওয়া হয়। এতে জায়গা কম লাগে ও অল্প পরিচর্যায় ভালো ফসল পাওয়া যায়। মৌসুমী ধান ও মাছ চাষ করে একসময় যাদের পরিবার-পরিজন নিয়ে কষ্টে দিন কাটত, লাভজনক সমন্বিত সবজি চাষে এখন তাদের মুখে হাসি ফুটেছে। ‘অল্প পুঁজিতে অনেক লাভ’— ফলে উৎসাহিত হয়ে এখন সমন্বিত এই চাষের দিকে ঝুঁকছেন অনেকেই।
সরেজমিনে জেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, অধিকাংশ মৎস্য ঘের গুলোতে যতদূর চোখ যায় সবুজের হাতছানি। ঘেরের আইলে ও ঘেরের আইলের উপরে নির্মিত সারি সারি মাচায় ঝুলছে করলা, ঢেঁড়শ, পুঁইশাক, কুমড়া আর শসা। বর্ষাকালীন সবজির পাশাপাশি আগাম শীতকালীন সবজি চাষও শুরু করেছেন অনেকে।
সাতক্ষীরা-খুলনা মহাসড়ক সংলগ্ন তালা উপজেলার নগরঘাটা ইউনিয়নের মিঠাবাড়ি বিলে শতশত বিঘা জমির মৎস্য ঘেরে মাচা পদ্ধতিতে লাউ, কুমড়া ও করলার চাষাবাদ করা হয়েছে। মাচায় ঝুলছে হাজার হাজার করলা, শতশত লাউ ও কুমড়া। একই সাথে ঘেরের পাড়ে লাগানো হয়েছে পুঁইশাক ও ঢেঁড়স।
একই এলাকার অপর মৎস্য ঘের ব্যবসায়ী মোহর আলী জানান, তার প্রায় ১ একর জমিতে মৎস্য ঘেরের পাশাপাশি সবজি চাষ করেছেন। ঘেরের ভেরির চারপাশ দিয়ে ডাবল সিস্টেমে সবজির বেড়া দিয়ে সবজির মাচা দিয়েছেন জানিয়ে তিনি বলেন, আমার লক্ষ্য ঘেরের সবজি থেকে ৫০হজার টাকার বেশি মুনাফা অর্জন করার।
সাতক্ষীরা কৃষিসম্প্রসারণ অধিদপ্তর ঘামারবাড়ির উপপরিচালক নুরুল হুদা জানান, জেলার অধিকাংশ ঘেরের পাড়ে সবজি চাষ হচ্ছে। ঘের পাড়ে উৎপাদিত লাউ, উচ্ছে, শসা ও বরবটি ইতোমধ্যে জেলার বাজারগুলোতে আসতে শুরু করেছে। কৃষকেরাও ভালো দাম পাচ্ছেন। জেলার নিম্নাঞ্চলের মানুষের আয়ের একটা বিশাল অংশই এই ঘেরের পাড়ের সবজি চাষ থেকে আসে। একারনে আমরা কৃষকদের পাশে মাঠ পর্যায়ে সব সময় আছি। প্রান্তিক কৃষকদের সবজি বাগান পরিদর্শন করে তাদের সার্বিক সহযোগিতা অব্যাহতও রাখবেন বলে জানান তিনি।
সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ হুমায়ন কবির বলেন, বিগত কয়েক বছরে মৎস্য ঘেরের আইলে সবজি চাষে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এসেছে সাতক্ষীরায়। আর পদ্মা সেতু চালু হওয়ায় অতিতের তুলনায় ভবির্ষতে আরও কৃষি বিপ্লব ঘটবে এ অঞ্চলে। তাঁর মতে, সাতক্ষীরা সাদা সোনা খ্যাত চিংড়ির রাজধানী হিসেবে পরিচিত থাকলেও সবজি উৎপাদনে এ জেলার আলাদা একটি সুনাম রয়েছে। বছরের বিভিন্ন সময় এ জেলা থেকে উৎপাদিত সবজির প্রায় ৪০ শতাংশ উৎপাদিত হয় মৎস্য ঘেরের আইল থেকে। যেটা জেলার চাহিদা মিটিয়ে বিপুল পরিমাণ সবজি রাজধানীসহ পদ্মার ওপারের বিভিন্ন জেলায় যায়।








