কুষ্টিয়ার কুমারখালী পৌরসভার তেবাড়িয়া এলাকার দুই বন্ধু মিঠুন বিশ্বাস (২৫) ও নিমাই কর্মকার (২৪)। দুজন গড়ে তুলেছেন ব্যাগ তৈরির একটি কারখানা। যেটি স্থানীয়ভাবে ‘ফুলব্যাগের কারখানা’ নামে পরিচিত।
কারখানায় উৎপাদিত ব্যাগ স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে যাচ্ছে দেশের বিভিন্ন স্থানে। কাপুর, ফাইবার, কভার ও ফোম দিয়ে সেলাই করা এ ফুলব্যাগ দামে বেশ সহজলভ্য। দিন দিন জনপ্রিয়তা পাচ্ছে ব্যাগগুলো।
অসহায়, বিধবা ও স্বামী-পরিত্যক্তা ও সুবিধাবঞ্চিত নারীরা এ ব্যাগ তৈরির কারখানায় কাজ করেন। তাদের পাশাপাশি পুরুষরাও করছেন এ কাজ। এতে একদিকে যেমন তারা স্বাবলম্বী হচ্ছেন, অন্যদিকে উৎপাদিত ব্যাগ স্থানীয় ও দেশীয় বাজারে চাহিদা পূরণ করছে।
২০১৮ সালের শেষের দিকে পৌরসভার ৮নম্বর ওয়ার্ডের তেবাড়িয়া এলাকায় ফুলব্যাগ তৈরির কারখানা প্রতিষ্ঠা করেন মিঠুন ও নিমাই। শুরুতে প্রতিমাসে ১ হাজার থেকে ১২০০ পিস ব্যাগ তৈরি করতেন তারা। প্রতিটি ব্যাগ তৈরিতে খরচ হত ১০০ থেকে ১২০ টাকা। যা বাজারে বিক্রি হয় ১৩০ থেকে ১৪০ টাকা দরে।
বর্তমানে মিঠুন ও নিমাইয়ের সঙ্গে কাজ করেন ১৭ জন কারিগর। প্রতি মাসে প্রায় পাঁচ থেকে সাড়ে পাঁচ হাজার ফুলব্যাগ তৈরি করেন। যার বাজার মূল্য প্রায় আট লাখ টাকা। প্রত্যেক কারিগর প্রতিমাসে ১২ থেকে ১৫ হাজার টাকা আয় করেন।
কুমারখালী পৌরবাজারের কসমেটিকস ব্যবসায়ী বিশ্বনাথ বলেন, হাতে তৈরি পণ্যগুলো সব সময় ক্রেতাদের আকৃষ্ট করে। ফুলব্যাগেও বেশ আকৃষ্ট হচ্ছে ক্রেতারা। দেখতে সুন্দর, কালারফুল, পরিবহন সহজ ও সুলভমূল্য হওয়ায় বেচা-বিক্রি বেশি হয়।
মমিনুল ইসলাম নামে আরেক ব্যবসায়ী বলেন, ফুল ব্যাগগুলো অল্প দামে পাওয়া যায়। বেশি বিক্রির পরিকল্পনা করেই আমরা এগুলো তৈরি করি। পণ্যের মান ঠিক রেখে ভালো ও মজবুত ব্যাগ সবার হাতে পৌঁছে দিতে পেরে আমরাও খুশি।
কারখানা শ্রমিক ডলি বলেন, দেশে ফুল ব্যাগের চাহিদা অনেক। গুণগত মান ভালো হওয়ায় দিন দিন এর চাহিদা বেড়েই চলেছে। এ কাজ করে প্রতিদিন ৪০০ থেকে ৬০০ টাকা আয় করা সম্ভব। প্রতিমাসে প্রায় ১৫ থেকে ১৮ হাজার টাকা আয় করি। আগে অভাব থাকলেও এখন পরিবার নিয়ে সুখে দিন যাচ্ছে।
এক সময় বেকার যুবক হারুণ কোন কাজ না করে ঘুরে ফিরে সময় কাটাতেন। এখন তিনিও ফুল ব্যাগের কারখানা কাজ করেন। শুধু তিনি নয়, তার পরিবারের সদস্যরাও তার সঙ্গে এ কাজে যোগ দেন। হারুন শেখ বলেন, এ কাজ করে প্রতিদিন হাজার টাকা ইনকাম করা যায়। বাড়ির সবাই মিলে এ কাজ করি। আমাদের এলাকায় পুরুষের পাশাপাশি নারীরা এ কাজ করে স্বাবলম্বী হচ্ছেন বেশি।
ফুলব্যাগ তৈরির উদ্যোক্তা মিঠুন কুমার বলেন, দুই বন্ধু মিলে ২০১৮ সালের শেষের দিকে ব্যাগ তৈরির কাজ শুরু করি। আগে জেলার বাইরে অন্যের কারখানায় কাজ করতাম। এখন নিজেই উদ্যোক্তা হয়েছি। আমি, আমার বন্ধুসহ বর্তমানে ১৭ জন কাজ করছি। প্রতিমাসে প্রায় পাঁচ থেকে সাড়ে পাঁচ হাজার ব্যাগ তৈরি হয়। যার আনুমানিক বাজার মূল্য আট লাখ টাকা।
তিনি আরও বলেন, প্রত্যেক কারিগর প্রতিমাসে ১২ থেকে ১৫ হাজার টাকা আয় করেন। অনেকে ২০ হাজার টাকাও পায়। ইচ্ছে আছে ব্যবসাটা আরও বড় করার। কিন্তু অর্থনৈতিক সমস্যার কারণে তা সম্ভব হচ্ছেনা।
পৌরসভার ৮নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর তুহিন শেখ বলেন, কুমারখালী একটি শিল্প এলাকা। তেবাড়িয়ায় ফুলব্যাগ তৈরি করে বেকার ও অসহায় মানুষগুলো স্বাবলম্বী হচ্ছে। সুযোগ পেলে সবাই অর্থনীতিতে বড় অবদান রাখতে পারে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) বিতান কুমার মন্ডল বলেন, আমাদের জনসংখ্যার বেশির ভাগই যুবসমাজ। আমি আনন্দিত যে কুমারখালীতে বেশ কিছু উদ্যোক্তা তৈরি হচ্ছে।
তেবাড়িয়া গ্রামের মিঠুন ও নিমাই দুই বন্ধু ফুলব্যাগ ও কুসুম কভার তৈরি করে স্বাবলম্বী হচ্ছে। সেই সঙ্গে তারা এলাকার নারীদের স্বাবলম্বী করে তুলছে। এ ধরনের উদ্যোক্তাদের সাধুবাদ জানাই। তিনি আরও বলেন, সোমবার তাদের কারখানা পরিদর্শন করেছি। তাদের কাজকে সহজ ও প্রসারিত করতে সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থা করা হবে। তাদের তৈরি পণ্য বাজারে আরও সম্প্রসারিত করতে উপজেলা প্রশাসন সহযোগিতা করবে।
আনন্দবাজার/শহক








