সহস্র গর্ভবতী মা যখন সন্তান জন্মদানের সময় প্রসবজনিত অথবা প্রসবোত্তর জটিলতায় মৃত্যুবরণ করেন, হাজার হাজার সদ্যোজাত এবং বাড়ন্ত সম্ভাবনাময়ী শিশু যখন অকালে জীবন হারায় একটি দেশ ও সমাজের জন্য এর থেকে বেশি বেদনার আর কী হতে পারে? বাংলাদেশে প্রতি বছর সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে কিংবা প্রসব পরবর্তী জটিলতায় প্রতি লাখে মৃত্যুবরণ করেন ১৭৩ জন মা এবং ০-৫ বছর বয়সী শিশু মারা যায় প্রতি হাজারে ২৪ জন। আর এই মৃত্যুর সিংহভাগই হয় মা ও তার পরিবারের সদস্যদের সঠিক জ্ঞান ও সতর্কতার অভাবে। কেমন হয় যদি এই অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যুসংখ্যা কমিয়ে দেয়া যায়? আজকে বলবো সেই সম্ভাবনার কথা।
আগামী ২৪-২৫ আগস্ট কানাডার টরন্টো ইউনিভার্সিটিতে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে - ‘The 13th international Conference on Maternal and Child Health Handbook" অর্থাৎ মা ও শিশুর স্বাস্থ্য তথ্য বইয়ের ওপর ১৩তম আন্তর্জাতিক সম্মেলন। কনফারেন্স চেয়ারপারসন বাংলাদেশের গর্ব ইউনিভার্সিটি অব টরন্টোর ক্লিনিক্যাল পাবলিক হেলথের অধ্যাপক ড. সাফি ভূইয়া। ড. সাফি ভূইয়া ডাক্তারি পড়েছেন স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ ঢাকায়। পরবর্তীতে মাহিডল ইউনিভার্সিটি, ব্যাংকক, থাইল্যান্ডে জনস্বাস্থ্যে এমপিএইচ, ওসাকা ইউনিভার্সিটি জাপান থেকে পিএইচডি এবং টরন্টো মেট্রোপলিটন ইউনিভার্সিটি থেকে এমবিএ ডিগ্রি সম্পন্ন করেন। ২০১২ সালে টরন্টো ইউনিভার্সিটিতে অধ্যাপনা শুরু করার আগে তিনি জাপানের ওসাকা ইউনিভার্সিটিতে বিজ্ঞানী হিসেবে প্রায় দীর্ঘ দশ বছর কর্মরত ছিলেন।
মা ও শিশু স্বাস্থ্য তথ্য বইয়ের কার্যক্রম যাত্রা শুরু হয় জাপানে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে। এতে গর্ভকালীন, প্রসবকালীন এবং প্রসব পরবর্তী সময়ে মায়ের যত্ন, অবশ্য পালনীয় নিয়মসমূহের তথ্য ও করণীয়গুলো সচিত্র সাবলীল বর্ণনা দেয়া থাকে, যা দেখে একজন গর্ভধারিনী কিংবা তার পরিবার নিরাপদ প্রসবের সমস্ত প্রস্তুতি নিতে পারবে। শুধু তাই নয় এই বইয়ে সন্নিবেশিত থাকে নবজাতকের জন্ম থেকে পাঁচ বছর বয়স পর্যন্ত সুস্থভাবে বেঁচে থাকার ও বেড়ে ওঠার সহায়ক সমস্ত তথ্য যা সন্তানের অভিভাবকদের জন্য একটি চূড়ান্ত নির্দেশনা।
বইটিতে আরো যুক্ত করা আছে মা ও শিশুর বিভিন্ন সময়ে হওয়া স্বাস্থ্য সমস্যাগুলো রেকর্ড রাখার ছক, যেনো তা পরবর্তীতে অন্য চিকিৎসার ক্ষেত্রে কার্যকরী ভূমিকা রাখতে পারে। জাপান তাদের গর্ভবতীদেরকে বাধ্যতামূলক এই বইয়ের তথ্য ও রেকর্ড ব্যবহারের মাধ্যমে মাতৃ মৃত্যুর হার কমিয়ে প্রতি লাখে ৩.৪ জন এবং শিশু মৃত্যুর হার প্রতি হাজারে ১.৭ জনে আনতে পেরেছে। বইটি ব্যবহার শুরু করার আগে এই হার ছিলো যথাক্রমে ১৬৭.৫ ও ৭.৭। এই অভাবনীয় সাফল্য জাপানকে শুধু স্বাস্থ্য খাতকেই টেকসই করেনি, সাথে বৃদ্ধি করেছে নারীর ক্ষমতায়ন ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি।
কালের বিবর্তনে বইটির উপযোগিতা জাপান থেকে ছড়িয়ে পড়েছে বিশ্বের অনেক দেশেই। বর্তমানে ৪৩টি দেশ মা ও শিশুর জীবনকে সুরক্ষিত করতে বিভিন্ন পরিসরে বইটি ব্যবহার করছে। বাংলাদেশে মা ও শিশু স্বাস্থ্য তথ্য বই প্রচলনের স্বপ্নদ্রষ্টা ড. সাফি ভূইয়া। ২০০২ সালে জাপানের ওসাকা ইউনিভার্সিটিতে অধ্যায়নরত থাকাকালীন সময়ই তাঁর পিএইচডি সুপারভাইজার, জাপানের মা ও শিশু স্বাস্থ্য তথ্যবই প্রচলনের অন্যতম কর্ণধার অধ্যাপক ড. নাকামুরা ইয়াসুদীর তত্ত্ববধায়নে এবং তিনি প্রথম জাপানের অর্থায়নে বাংলাদেশ সরকারের স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতায় তৎকালীন আজিমপুর মা ও শিশু স্বাস্হ্য প্রশিক্ষণ ইনিস্টিউট, ঢাকায় গর্ভবতী মায়েদের পরীক্ষামূলকভাবে মা ও শিশু স্বাস্থ্য বই বিতরণ করা শুরু করেন।
এই চিকিৎসা গবেষণার ফলাফলে দেখা যায় যে সব মায়েরা স্বাস্থ্য তথ্য বইটি ব্যবহার করেননি তাদের তুলনায় যারা ব্যবহার করেছেন তারা ডাক্তারের কাছে তুলনামূলকভাবে বেশিবার গর্ভকালীন নিয়ম অনুযায়ী নিজেদের চেকআপ করিয়েছেন, তাদের প্রসব কালীন ও প্রসবত্তোর জটিলতা অব্যবহারকারীদের থেকে অনেক কম হয়েছে এবং সুস্থ নবজাতক জন্ম দেয়ার হারও তাদের মধ্যে বেশি। আশাব্যঞ্জকভাবে বই ব্যবহারকারীদের মধ্যে মা ও শিশু মৃত্যহারও ছিলো অব্যবহারকারীদের থেকে অনেক কম।
এ প্রসঙ্গে ড. ভূইয়া বলেন, বাংলাদেশে মাতৃ ও শিশু মৃত্যুর হার’ অধিক হওয়ার সব থেকে প্রধান কারণ হলো মা ও তার পরিবারের গর্ভকালীন পালনীয় এবং করণীয় বিষয় সম্পর্কে সঠিক জ্ঞানের অভাব। সেই সাথে নারীদের সামাজিক পশ্চাদপদতা ও বিভিন্ন সামাজিক কুসংস্কার তো আছেই। মা ও শিশু স্বাস্থ্য তথ্য বইটি ব্যবহার করলে গর্ভবতী মা নিজেই তার নিজের যত্ন নেবার সঠিক দিকনির্দেশনা পাবে।
তিনি বলেন, আমি মা ও শিশুদের নিয়ে কাজ করার সময় দেখেছি অনেকে মেয়েরাই কমফোর্ট ও সহযোগিতা পাওয়ার জন্য সন্তান প্রসবের আগে তাদের বাবা-মার বাড়ি যায় যেখান থেকে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স খুবই দূরে। অথচ তার স্বামীর বাড়ি থেকে হেলথ কমপ্লেক্স হাতের নাগালে। সামান্য এমন অজ্ঞতার কারনে ভুল সিদ্ধান্তে সময়মতো চিকিৎসার অভাবে অনেক মাকে চোখের সামনে মরতে দেখেছি, বিভিন্ন সামাজিক কুসংস্কারেও প্রান হারাতে দেখেছি অনেক মাকে। মায়ের জীবন বাঁচাতে হলে মাকে তার গর্ভকালীন স্বাস্থ্য সম্পর্কে শিক্ষা দিতে হবে। তাহলে সে নিজেই তার নিজের মৃত্যঝুঁকি এড়াতে উদ্যোগ নিবে এবং সুস্থ্য শিশু জন্ম দিতে পারবে।
সেই সাথে বেশিরভাগ শিশুর পরিবারেরই নবজাতকের যত্ন ও তার বেড়ে ওঠার করনীয় সম্পর্কেও সঠিক ধারনা নেই। বিশেষ করে আমাদের দেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোতে দরিদ্রতা ও শিক্ষার অভাবে মানুষের মধ্যে এই সমস্যা আরো প্রকট, যার বলিদান হয়ে বিভিন্ন রোগ ও অপুষ্টিতে ভুগে অকালে প্রান হারায় অগুনিত সম্ভাবনাময়ী শিশু।
মা ও শিশুদের এই অকালমৃত্যকে আমরা অনেকাংশেই কমাতে পেরেছি। আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মাতৃ ও শিশু মৃত্যুহার কমাতে পারার সফলতার জন্য এমডিজি এওয়ার্ড পেয়েছেন যা আমাদের জন্য একটি বড় অর্জন এবং অনুপ্রেরণা। ২০৩০ সালের মধ্যে বৈশ্বিক টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রা (Sustainable Development Goals) অর্জন করতে হলে আমাদের এই অনুচিত মৃত্যুহারকে আরো কমিয়ে আনতে হবে। যার একটি প্রধান হাতিয়ার হতে পারে মা ও শিশুর স্বাস্থ্য তথ্যবইটি। আর এই বইটি তৈরি মূল্য হবে ৫০ টাকার মতো। অর্থাৎ মাত্র ৫০ টাকায় সুরক্ষতি হবে মা ও তার শিশুর জীবন। তিনি আরও বলেন বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা, ইউনিসেফ, জাইকাসহ বিভিন্ন স্বাস্থ্য সংস্থা এই বইকে সব দেশে সার্বজনীন ভাবে ব্যবহার করার স্বীকৃতি দিয়েছে। সুযোগ পেলে তিনি বাংলাদেশেও এই বই নিরবচ্ছিন্ন প্রচলনে কারিগরি সহায়তা চালিয়ে যেতে চান।
মা ও শিশুর স্বাস্থ্য তথ্যবইটি প্রত্যেক দেশ তার মাতৃ ও শিশু স্বাস্থ্যসমস্যা, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটের ওপর ভিত্তি করে নিজস্ব ভাষায় তৈরী করে ব্যবহার করতে পারে। আর এতে যেহেতু সবকিছু সচিত্র বর্ননা থাকে সেহেতু অল্প বা অশিক্ষিত মায়েরাও তা সহজেই বুঝতে পারবে। প্রতিটি জীবন মূল্যবান। সুস্থ মাই একমাত্র সুস্থ শিশুর জন্ম দিতে পারেন এবং আর সেই সুস্থ শিশুরাই আগামী দিনের বাংলাদেশ। মাত্র ৫০ টাকায় যদি মা ও শিশুর সুস্থ জীবন নিশ্চিত করা যায়, যদি অকাল মৃত্যুকে রুখে দেয়া যায় তবে আর দেরী কেনো? এখনই সময়...।
লেখক: এমবিবিএস, এমপিএইচ (এপিডেমিওলজি) শিক্ষার্থী, নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ। বাংলাদেশ প্রতিনিধি, আন্তর্জাতিক এমসিএইচ হ্যান্ডবুক কনফারেন্স কমিটি।









