দেশে একদিকে প্রচুর শিক্ষিত, অশিক্ষিত এবং অর্ধশিক্ষিত বেকার। আবার প্রচুর জমি পড়ে আছে পতিত। কৃষিতে দৃষ্টি দিচ্ছে না শ্রমশক্তি। আসছে না শিক্ষিতরাও। চাকরির পরীক্ষা পদ্ধতিতেও আছে নানা ধরনের গোঁজামিল। এসবের আমূল পরিবর্তন করা প্রয়োজন। বৈশি^ক মহামন্দা মোকাবিলায় প্রধানমন্ত্রী তরুণদের কৃষিমুখি-গ্রামমুখি হতে প্রতিনিয়ত বক্তব্য দিয়ে যাচ্ছেন তবে নেই কোন দিকনির্দেশনা ও প্রকল্প।
এসব সমস্যা সমাধানের বিষয়ে শেরে বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. শহীদুর রশিদ ভুঁইয়ার দিকনির্দেশলামূলক একটি সাক্ষাৎকার গত ১৬ নভেম্বর নিয়েছেন দৈনিক আনন্দবাজারের নিজস্ব প্রতিনিধি ফারুক আহমাদ আরিফ।
প্রশ্ন: বৈশ্বিক মহামন্দা মোকাবিলায় বিগত কয়েক মাস যাবত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তরুণদের কৃষিমুখি হতে বক্তব্য দিচ্ছেন। তবে নেই কোনো প্রকল্প ও নির্দেশনা। এক্ষেত্রে শিক্ষিক তরুণরাও কৃষিবিমুখ। তাদের কৃষিমুখি করতে রাষ্ট্রীয়ভাবে কি ধরনের পদক্ষেপ প্রযোজন?
ড. শহীদুর রশিদ ভুঁইয়া: কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে বা কৃষি নিয়ে যারা পড়াশোনা করেছে তাদের অনেকেই কৃষিসংক্রান্ত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কাজ করছে। যেমন কৃষি গবেষণা, শিক্ষা, সম্প্রসারণ, কৃষি মন্ত্রণালয় ও অন্যান্য কৃষিখাতে। হয়তো কিছু লোক বিসিএস, ব্যাংক অথবা অন্যান্য প্রতিষ্ঠানে কাজ করছে। তবে কৃষকের সন্তানরা কৃষক হচ্ছেন কিনা এটি প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে। আর সব তরুণ কৃষিতে আসবে সেটিও আশা করা যায় না। হাঁস, মুরগি, মাছ চাষ তরুণরাই করছে। মানুষ শিক্ষিত হলে কষ্টের কাজ কম করতে চায়। আর কৃষিকাজে প্রতিনিয়ত খোঁজ রাখতে হয়। একদিন না থাকলে ক্ষতি হয়ে যায়। কৃষিতে উৎসাহ বাড়াতে এক্ষেত্রে সরকারকে প্রণোদনা দিতে হবে। কৃষিতে আসলে সরকার যদি মূল্যায়ন ও অর্থায়ন করে, সার্টিফিকেট দেয় তবেই আসবে। আর যে কোনোদিন কৃষিকাজ করেনি সে তো আসবে না। আর এসেও লাভ করতে পারবে না।
প্রশ্ন: কৃষিতে ঋণ খুব কম। আবার যা দেয়া হয় তা এগ্রোফার্মগুলো পায়, সাধারণ কৃষকরা পাচ্ছে না। ফলে মানুষ কৃষিতে যেতে চাচ্ছে না। তাদের কীভাবে কৃষিমুখী করা যায়?
ড. শহীদুর রশিদ ভুঁইয়া: এখন সারা বিশে^ সংকট আছে। আমাদের কৃষকদের মধ্যেও সংকট আছে। বীজ, সার, কীটনাশক, ডিজেল ও অন্যান্য উপকরণগুলো দিতেই হবে। এসব না থাকলে কৃষক চাষ করবে কিভাবে? এগুলো সহজে দিতে হবে বা পেতে পারে সেই ব্যবস্থা করতে হবে। আর শুধু কৃষিকাজ করে কৃষক বা মানুষ বাঁচতে পারে সেই সংখ্যা খুব বেশি নয়। কৃষিতে থেকেও অকৃষিজ কাজে যুক্ত থাকে। যেমন রিকশা বা ভ্যানগাড়ি চালায়, ব্যবসা করে। এখন গ্রামীণচিত্র পাল্টে যাচ্ছে। যেহেতু লোকজন কম আসছে তাই যান্ত্রিকীকরণের বিষয়টি বড় করে দেখা হচ্ছে। যন্ত্র চালাতে কিছু লোক থাকবে বাকিটা যন্ত্র দিয়েই করতে হবে। সারা পৃথিবীতে এখন তাই হচ্ছে।
প্রশ্ন: উন্নত বিশ্বের অনেক দেশ কৃষিতে ভালো করছে। ওয়ার্ড লেভেলে কৃষিবিদ নিয়োগ দেয়া যায় কিনা? তারা ফিল্ডে থেকে কৃষকদের সঙ্গে কাজ করবে, এদের বেতন ও পদবি প্রথম, দ্বিতীয় শ্রেণী বা বিভিন্ন হবে।
ড. শহীদুর রশিদ ভুঁইয়া: এটা হওয়া দরকার। একটি ওয়ার্ডে দুই হাজার হেক্টর জমি আছে। তা চাষাবাদে এরা সহযোগিতা করবে। এখন ইউনিয়ন পর্যায়ে প্রাণি ডাক্তার নিয়োগ দেয়া হচ্ছে। কৃষিবিদও নিয়োগ দেয়া হোক। এক একটি ইউনিয়নে কৃষি বিসিএস কর্মকর্তা নিয়োগ দিলে কৃষক যে পরামর্শ ও সহযোগিতা পাবে রাষ্ট্র সেখানে অনেক লাভবান হবে। উৎপাদন বাড়বে। দেখা যাবে কর্মকর্তাদের যে বেতনটা দেয়া হচ্ছে তার পরামর্শের কারণে, সহযোগিতার কারণে ফসল বেশি হবে। প্রকৃতপক্ষে রাষ্ট্রই লাভবান হবে।
প্রশ্ন: ক্লাসের গবেষণাগুলো কৃষকপর্যায়ে নিয়ে যেতে কি ধরনের পদক্ষেপ প্রয়োজন?
ড. শহীদুর রশিদ ভুঁইয়া: যেকোন গবেষণা/প্রযুক্তি মাঠপর্যায়ে যেতে অনেকগুলো ধাপ পার হতে হয় বা ব্যবস্থা আছে। আপনি একটি ভালো জাত উদ্ভাবন করলেন, সেটি অনেকগুলো সিট করবেন। জাতীয় বীজ সেক্টরে দিবেন। তারা অনুমতি দিলে বিএডিসি বা বেসরকারি কোন প্রতিষ্ঠান উৎপাদন করে মানুষের কাছে নিয়ে যাবে। আর বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে যে অর্থায়ন (গবেষণার বাজেট) করা হয় তা এতই অপ্রতুল যা দিয়ে প্রায়শই কোন প্রযুক্তির সঙ্গে যুক্ত করা যায় না। যত গবেষণা হয় তার ৫ শতাংশ প্রযুক্তির সঙ্গে যুক্ত বাকি ৯৫ শতাংশই বাইরে। এমএসসির শিক্ষার্থীর গবেষণা ছাড়া ডিগ্রিই সম্পন্ন হবে না। এসব ছোট ছোট গবেষণাগুলো প্রযুক্তি পেতে অসম্ভব হয়। যেকোন সেক্টরে প্রযুক্তির জন্য দীর্ঘমেয়াদী গবেষণা করতে হয়। যেসব চেয়ে ভালো গবেষণা করবে, ভালো কাজ করবে তাকে সেইভাবে সর্বোচ্চ মূল্য দিবে বা মূল্যায়ন করবে। তবে আমাদের দেশে সেই ব্যবস্থা অনেকটাই নেই। একজন শিক্ষক যদি শিক্ষকতাকে চাকরি বা গবেষক গবেষণাকে চাকরি মনে করলে অগ্রসর হবে না। আমাদের অনেক ক্ষেত্রে পরিবর্তন করতে হবে।
প্রশ্ন: কাজি পেয়ারায় দেশে ১০ হাজারের বেশি মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। এ ধরনের অনেক কার্যক্রম আছে। সেগুলো মাঠপর্যায়ে আনা যায় নিশ্চয়!
ড. শহীদুর রশিদ ভুঁইয়া: কাজী পেয়ারার বীজ থাইল্যান্ড থেকে এনে এখানে চারা করা হয়। যখন দেখা গেলো এটি বড় বড় হয় তখন এটি আরো কিছু যুক্ত করা হয়েছে। এটি এখানকার গবেষণার ফলশ্রুতিতে উন্নত হয়নি। তবে এদেশের মাটিতে ভালো ফলন হয়েছে। পরে এটি নিয়ে কাজ করা হয়েছে। এটিকে আরো উন্নত করা, বাঁচিয়ে রাখা, ফলন বৃদ্ধি, জায়গা প্রসার করা। এটি এখানকার মৌলিক কোন গবেষণা নয়।
প্রশ্ন: সরকার শুধু বক্তব্য দিচ্ছে কোন দিকনির্দেশনা নেই। কি ধরনের পদক্ষেপ নিলে তরুণরা কৃষিতে ঝাপিয়ে পড়বে?
ড. শহীদুর রশিদ ভুঁইয়া: সরকারের এ সংক্রান্ত যেসব কর্মসূচি আছে, বীজ দেয়া, সার, কীটনাশক দেয়া। সেখানে কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ, পাট ও বস্ত্র মন্ত্রণালয়, এসবের সংস্থা বা অধিদপ্তরগুলো রয়েছে তাদের মধ্যে সমন্বয় থাকতে হবে, মডালিটি ডেভেলপ করতে হবে। যেমন দু’জন কৃষকের সঙ্গে ১০ জন শিক্ষার্থীকে যুক্ত করা হয়। তাদের প্রশিক্ষণ-অর্থায়ন করা হয়। উপকরণ দেয়া হয় ও পরবর্তীতে একটি সার্টিফিকেট দেয়া হয় আর সেটি চাকরির ক্ষেত্রে কাজে লাগে তাহলে তরুণরা ঝাপিয়ে পড়বে।
প্রশ্ন: ড. মুহাম্মদ কুদরাত-এ-খুদা শিক্ষা কমিশনে বলা হয়েছিল এদেশ যেহেতু কৃষিপ্রধান সেহেতু শিক্ষার্থীদের কৃষির সঙ্গে সম্পৃক্ত করতে হবে। প্র্যাক্টিকেল নাম্বার থাকবে কৃষিতে যুক্ত করার ক্ষেত্রে। এখন জনসাধারণের সঙ্গে যুক্ত করতে অন্তত ৩০ শতাংশ নাম্বার থাকার দরকার কৃষক তথা মাঠপর্যায়ের মানুষদের সঙ্গে যুক্ত করতে।
ড. শহীদুর রশিদ ভুঁইয়া: বাস্তবে এটি আমরা পারিনি। যদিও আমাদের প্রতিটি সাবজেক্টে ১০০ মধ্যে ৫০ শতাংশ থিওরি ও ৫০ শতাংশ প্র্যাক্টিকেল মার্ক রয়েছে ও তা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। তবে জনসাধারণের সঙ্গে যুক্ত করতে সেটি নেই। সেখানে প্রথম কথা হলো সেখানে আমরা দক্ষতার সঙ্গে করাতে পারছি কিনা। দ্বিতীয়ত শিক্ষার্থীদের চিন্তাই হলো যে বিসিএস কর্মকর্তা হবে। সেজন্য অনার্সের প্রথম দিন থেকেই কোন দেশের রাজধানীর নাম কি, মুদ্রার নাম কি এসব পড়তে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। প্রযুক্তি শিখতে চায় না। কারণ সে জানে এগুলো তার বিসিএসে কাজে আসবে না। প্রতিটি শিক্ষায় যদি চাকরি নিশ্চয়তা থাকে তাহলে সে নিজের বিষয় নিয়ে সন্তুষ্ট থাকবে।
প্রশ্ন: চাকরির ক্ষেত্রে প্রথম শ্রেণি থেকে স্নাতকোত্তর পর্যন্ত যা পড়ে আসা হয় তা থেকে ৮০ শতাংশ প্রশ্ন অর্থাৎ ব্যক্তি যে বিষয়ে পড়ে এসেছে সে সেই বিষয়ে পরীক্ষা দেবে তাহলে কেমন হয়?
ড. শহীদুর রশিদ ভুঁইয়া: নিজস্ব পড়াশোনার বিষয় থেকে ৮০ শতাংশ নাম্বার থাকবে এটি আমি দৃঢ়ভাবে সমর্থন করি। যে ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে পড়ালেখা করলো তার পরীক্ষা সেটিকে ভিত্তি করে হবে। সে পড়ায় ফাঁকি দিলে এখানে পারবে না। এ রকম ব্যবস্থা যদি বিসিএস ও অন্যান্য ক্ষেত্রে চালু করা যায় তাহলে আমূল পাল্টে যাবে। তাই বর্তমান পরীক্ষা পদ্ধতি পাল্টাতে হবে। দেশের কল্যাণে দ্রুততার সঙ্গে রাষ্ট্রকে এসব বিষয়ে ভাবা দরকার।
ফারুক আহমাদ আরিফ: সময় দেয়ার জন্য ধন্যবাদ
ড. শহীদুর রশিদ ভুঁইয়া: আপনাদেরও ধন্যবাদ।
আনন্দবাজার/শহক









