‘বাঙালিয়ানা, বাঙালিত্ব, আমি বাঙালি এই বোধ। আমি বাঙালি বলিয়া যে একটা সত্ত্বা আছে, এই জ্ঞান। বেশি সংস্কৃত পড়িলে লোকে ব্রাহ্মণ হইতে চায়, ঋষি হইতে চায়। সেটা খাঁটি বাংলার জিনিস নয়; তাহার সঞ্চার পশ্চিম হইতে। বেশি ইংরাজি পড়িলে কী হয় তাহা আর বলিয়া দিতে হইবে না।… বাঙালিয়ানার অর্থ এই যে, বাংলার যা ভালো তাহা ভালো বলিয়া জানা, আর যাহা মন্দ তাহা মন্দ বলিয়া জানা। ভালো লওয়া ও মন্দ না লওয়া তোমার নিজের কাজ। কিন্তু জানাটা প্রত্যেক বাঙালির দরকারি কাজ।
জানিতে হইলে বুদ্ধিপূর্বক বাংলা দেশটা কী দেখিতে হইবে, বাংলায় কে থাকে দেখিতে হইবে, বাংলার আচার ব্যবহার, রীতি-নীতি, সমাজ-সংসার, উৎসব-আনন্দ, দুঃখ-শোক, কুস্তি লাঠিখেলা টোল পাঠশালা দেখিতে হইবে। ইহার গান গীতি পয়ার পাঁচালী, নাচ খেমটা, কীর্তন ঢপ যাত্রা কবি সব দেখিবে হইবে। আবার এখনকার কালে যাহা যাহা বদলাইতেছে, তাহাও দেখিতে হইবে। খবরের কাগজ, মাসিক পত্র, কনসার্ট, থিয়েটার, ইস্কুল, কলেজ, আপিস, আদালত সবই দেখিতে হইবে। বাংলার এবং বাঙালি জাতির সমস্ত জীবনটা ভালো করিয়া দেখিতে হইবে, তবেই তুমি বাঙালি খাইবে (উইকিপিডিয়া)।
মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর বাংলা ও বাঙালি সম্পর্কে এমন খোলামেলা, বিশদ অথচ সংক্ষিপ্ত মূল্যায়ন-ভবিষ্যত দর্শন বক্তব্য সেকালে তো বটেই একালেও কমই পাওয়া যায়। বাঙালি তো বাঙালি। নিজের অস্তিত্বের খোঁজ করা আবশ্যক। বাংলা সংস্কৃতির অন্যতম হলো বাংলার পুঁথি। সেই পুঁথির পেছনেই ছুটে বেড়িয়েছেন এই মহান শিক্ষানুরাগী। চর্যাপদ আবিষ্কারের সুবাদে মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী সারা বিশ্বেই সুপরিচিত। ২৪ জন বৌদ্ধ বাউল কবির লিখিত এ উল্লেখযোগ্য গ্রন্থটি বাংলা সাহিত্য ভাণ্ডারে এক মহামূল্যবান রত্ন। বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে তার অবদান অসামান্য। তার তৈল বিষয়ক রাসাত্মক রচনাটি অনেকেই পড়েছেন। তিনি জন্মগ্রহণ না করলে বাংলা সাহিত্যের ঐতিহ্যের বড় অংশই অনাবিষ্কৃত থেকে যেতো। বাংলা যে সাহিত্য মানে এবং সৌন্দর্যে অতুলনীয় তা প্রমাণ হয়তো সম্ভব হতো না। এই মহান অনুসন্ধিৎসকের জন্যই সাহিত্যের বহু মূল্যবান সৌন্দর্য বেরিয়ে এসেছে।
তার প্রকৃত নাম ছিল হরপ্রসাদ ভট্টাচার্য। প্রাচীন পুঁথি সংগ্রহ করা ছিল তার নেশা। তিনি ১৮৫৩ সালের ৬ ডিসেম্বর অভিভক্ত ভারতের খুলনা জেলার কুমিরা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম রামকমল ন্যায়রত্ন। তার প্রাথমিক শিক্ষা সমাপ্ত হয় নিজ গ্রামেই। তিনি ছাত্র হিসেবে অত্যন্ত মেধাবী ছিলেন। যার স্বাক্ষর রেখেছেন শিক্ষা ও কর্মজীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে। তিনি বৈচিত্র্যপূর্ণ প্রতিভার অধিকারী ছিলেন। তিনি কলকাতার সংস্কৃত কলেজিয়েট স্কুল ও প্রেসিডেন্সি কলেজে পড়াশোনা করেন। সফলভাবে সব পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে তিনি ১৮৭৭ সালে সংস্কৃতে সম্মান অর্জন করেন।
এমএ পরীক্ষায় প্রথম হয়ে তিনি শাস্ত্রী উপাধি লাভ করেন। পরবর্তীতে তার কাজের ব্যাপ্তি শুধু বিস্তৃত হতে থাকে। তার কর্মজীবন শুরু হয় শিক্ষকতা দিয়ে। ১৮৭৮ সালে তিনি হেয়ার স্কুলে শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। ১৮৮৩ সালে সংস্কৃত কলেজে অধ্যাপনা শুরু করেন। ধীরে ধীরে গবেষণায় মনোনিবেশ করেন। তার প্রথম গবেষণাপত্রটি ভারত মহিলা নামে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় সম্পাদিত বঙ্গদর্শন পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। তিনি এশিয়াটিক সোসাইটির রাজেন্দ্রলালের সহকারী হিসেবে কাজ করতেন। রাজেন্দ্রলালের মৃত্যুর পর তিনি সেখানে সংস্কৃত পুঁথি অন্বেষণ বিভাগের পরিচালক হন। কাজ করতে থাকেন সংস্কৃত পুঁথি নিয়ে। চলতে থাকে গবেষণা। এই সংস্কৃত পুঁথি নিয়ে কাজ করতে করতেই তিনি বাংলা পুঁথির ব্যাপারে আগ্রহী হয়ে ওঠেন। অবশ্য তিনি যদি এসময় বাংলা পুঁথির বিষয়ে আগ্রহী না হয়ে উঠতেন তাহলে চর্যাপদ আবিষ্কৃত হতে আরও কত বছর লাগতো তা কে জানে!
তিনি এই পুঁথির সন্ধানেই নেপাল গিয়েছিলেন। সেখানকার রাজদরবারেই মেলে চর্যাপদ বা চর্যাগীতি। তিনি এসব পুঁথি আবিষ্কারের পর গবেষণা শুরু করেন। শেষে তিনি প্রমাণ করেন এই চর্যাপদই হলো বাংলা সাহিত্যের আদিমতম নিদর্শন। বাংলা সাহিত্য চর্চা যে কত বছর আগে শুরু হয়েছে তা জানাটা খুব জরুরি ছিল। চর্যাপদ আবিষ্কারের মাধ্যমেই তা প্রমাণিত সত্য হয়ে সামনে আসে। ১৯০৭ সালে আবিষ্কারের পর থেকে চর্যাপদ নিয়ে তিনি দীর্ঘসময় গবেষণা করেন। ১৯১৬ সালে তিনি চর্যাপদের পুঁথি নিয়ে রচিত তার গবেষণাপত্র হাজার বছরের পুরাণ বাঙ্গালা ভাষায় রচিত বৌদ্ধ গান ও দোঁহা নামে প্রকাশ করেন।
হরপ্রসাদ শাস্ত্রী ইংরেজি, সংস্কৃত প্রভৃতি ভাষায় বহু গ্রন্থ রচনা করেছেন। তিনিই ইংরেজি বিষয়ে মগধান লিটারেচার, সংস্কৃত কালচার ইন মর্ডান ইন্ডিয়া ও ডিসকভারি অফ লিভিং বুদ্ধিজন ইন বেঙ্গল ইত্যাদি রচনা করেন। তার কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি রয়্যাল এশিয়াটিক সোসাইটির সম্মানিত সদস্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডি.লিট ইত্যাদি পুরস্কারে ভূষিত হন। তিনি ১৯৩১ সালের ১৭ নভেম্বর মৃত্যু বরণ করেন।
লেখক: প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট, পাবনা
আনন্দবাজার/শহক









