বৃদ্ধদের নিরাপত্তা--
- এক হাজার টাকা চাঁদায় পেনশন ৬৪৭৭৬ টাকা
- ৩০ বছরে চাঁদা শুরু হলে পেনশন ১৮৯০৮ টাকা
- স্বায়ত্বশাসিত প্রতিষ্ঠানে ব্যাপারে সিদ্ধান্ত বিবেচনাধীন
জীবনের শেষ লগ্নে নিরাপদে থাকতে সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থা চালু করতে চাচ্ছে সরকার। এ নিয়ে কৌশলপত্র প্রণয়ন করা হয়েছে। প্রয়োজনে এতে আরো কিছু সংযোজন ও বিয়োজন করা হবে। সেখানে ৪০ বছর চাঁদা দিয়ে ২০ বছরের পেনশন পাবেন নাগরিকরা। তবে সর্বনিম্ন চাঁদার বয়স রাখা হয়েছে ১০ বছর।
এ বিষয়ে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল এমপি এসব কথা বলেছেন, সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থা প্রবর্তন হলো জাতির জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একটি উপহার। ২০০৮ সালের নির্বাচনি ইশতেহারে তিনি দেশের বয়স্ক জনগোষ্ঠীকে একটি টেকসই ও সুসংগঠিত সামাজিক নিরাপত্তা কাঠামোর আওতায় বৃদ্ধকালীন সুরক্ষা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে জাতীয়ভাবে সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থা প্রবর্তনের অঙ্গীকার করেছিলেন।
গতকাল বুধবার অর্থনৈতিক বিষয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির পঞ্চম এবং সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির সপ্তম সভা শেষে তিনি এসব কথা বলেন। অর্থমন্ত্রী বলেন, প্রধানমন্ত্রীর অঙ্গীকার অনুযায়ী সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থা প্রবর্তনের জন্য কার্যক্রম হাতে নেয়া হয়েছে। তিনি ২০১৯-২০২০ অর্থবছরের বাজেট বক্তৃতায় সর্বজনীন পেনশন পদ্ধতি চালুর সুনির্দিষ্ট ঘোষণা প্রদান করেছিলেন। সেই ধারাবাহিকতায় আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট এবং সক্ষমতা বিবেচনায় নিয়ে সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থা প্রবর্তনের জন্য একটি কৌশলপত্র প্রণয়ন করা হয়েছে।
অর্থমন্ত্রী বলেন, কৌশলপত্রটি প্রধানমন্ত্রীর সামনে উপস্থাপন করা হয়। সেখানে তিনি কিছু নির্দেশনা প্রদান করেছেন। নির্দেশনাগুলো অন্তর্ভুক্ত করে শিগগিরই একটি সর্বজনীন পেনশন আইন প্রণয়ন করা হবে। যাতে পূর্ণাঙ্গ রূপরেখা পাওয়া যাবে। এটি নিয়ে এখন কাজ করা হচ্ছে।
মুস্তফা কামাল বলেন, বাংলাদেশ বর্তমানে ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডের সুবিধা ভোগ করছে। আমাদের বর্তমান গড় আয়ুষ্কাল ৭৩ বছর যা ২০৫০ সালে ৮০ বছর এবং ২০৭৫ সালে ৮৫ বছর হবে বলে প্রক্ষেপণ করা হয়েছে। এ থেকে প্রতীয়মান হয় আগামী তিন দশকে একজন কর্মজীবী ব্যক্তি অবসর গ্রহণের পরও গড়ে ২০ বছর আয়ু থাকবে। দেশে বর্তমানে ডিপেনডেন্সি রেশিও ৭ দশমিক ৭ শতাংশ, যা ২০৫০ সালে ২৪ শতাংশে এবং ২০৭৫ সালে ৪৮ শতাংশে উন্নীত হবে। গড় আয়ুষ্কাল বৃদ্ধি ও ক্রমবর্ধমান ডিপেনডেন্সি রেশিও বিবেচনায় বৃদ্ধ বয়সীদের নিরাপত্তা হিসেবে সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থা খুবই জরুরি।
প্রস্তাবিত সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থার উল্লেখযোগ্য দিকগুলোর মধ্যে রয়েছে-
১. ১৮-৫০ বছর বয়সী সব কর্মক্ষম নাগরিক সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থায় অংশগ্রহণ করতে পারবে।
২. বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশি কর্মীরা এ কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্ত হতে পারবে।
৩. সরকারি ও স্বায়ত্বশাসিত প্রতিষ্ঠানে কর্মরত কর্মচারীদের আপাতত নতুন জাতীয় পেনশন ব্যবস্থার বাহিরে রাখা হয়েছে। ভবিষ্যতে এ বিষয়ে সরকার যথাযথ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে।
৪. জাতীয় পরিচয়পত্রকে ভিত্তি ধরে দেশের ১৮ থেকে ৫০ বছর বয়সী সকল নাগরিক পেনশন হিসাব খুলতে পারবে।
৫. প্রাথমিক এ পদ্ধতি স্বেচ্ছাধীন থাকবে যা পরবর্তীতে বাধ্যতামূলক করা হবে।
৬. ধারাবাহিকভাবে কমপক্ষে ১০ বছর চাঁদা প্রদান সাপেক্ষে মাসিক পেনশন পাওয়ার যোগ্যতা অর্জন করবে।
৭. প্রতিটি নাগরিকের জন্য একটি পৃথক পেনশন হিসাব থাকবে ফলে চাকুরি পরিবর্তন করলেও পেনশন হিসাব অপরিবর্তিত থাকবে।
৮. এ পেনশন পদ্ধতিতে প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণের সুযোগ থাকবে। তবে এ ক্ষেত্রে কর্মী বা প্রতিষ্ঠানের চাঁদা জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষ কর্তৃক নির্ধারিত হবে।
৯. মাসিক সর্বনিম্ন চাঁদার হার নির্ধারিত থাকবে।
১০. তবে প্রবাসী কর্মীদের সুবিধার্থে ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে চাঁদা জমা দিতে পারবে।
১১. সুবিধাভোগী বছরে ন্যূনতম বাৎসরিক জমা নিশ্চিত করবে। অন্যথায় তার হিসাব সাময়িকভাবে স্থগিত হবে এবং পরবর্তীতে বিলম্ব ফিসহ বকেয়া চাঁদা প্রদানের মাধ্যমে হিসাব সচল করা হবে।
১২. সুবিধাভোগী আর্থিক সক্ষমতার ভিত্তিতে চাঁদা হিসেবে বর্ধিত অর্থ (সর্বনিম্ন ধাপের অতিরিক্ত যে কোন অংক) জমা করতে পারবে।
১৩. পেনশনের জন্য নির্ধারিত বয়সসীমা (৬০ বছর) পূর্তিতে পেনশন তহবিলে পুঞ্জিভূত লভ্যাংশসহ জমার বিপরীতে নির্ধারিত হারে পেনশন প্রদেয় হবে।
১৪. পেনশনারগণ আজীবন অর্থাৎ মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত পেনশন সুবিধা ভোগ করবেন।
১৫. নিবন্ধিত চাঁদা জমাকারী পেনশনে থাকাকালীন ৭৫ বছর পূর্ণ হওয়ার পূর্বে মৃত্যুবরণ করলে জমাকারীর নমিনি অবশিষ্ট সময়কালের (মূল জমাকারীর বয়স ৭৫ বছর পর্যন্ত) জন্য মাসিক পেনশন প্রাপ্য হবেন।
১৬. পেনশন স্কীমে জমাকৃত অর্থ কোন পর্যায়ে এককালীন উত্তোলনের সুযোগ থাকবে না। তবে আবেদনের প্রেক্ষিতে জমাকৃত অর্থের সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশ ঋণ হিসেবে উত্তোলন করা যাবে যা সুদসহ পরিশোধ করতে হবে।
১৭. কমপক্ষে ১০ বছর চাঁদা প্রদান করার পূর্বে নিবন্ধিত চাঁদা প্রদানকারী মৃত্যৃবরণ করলে জমাকৃত অর্থ মুনাফাসহ তাঁর নমিনিকে ফেরত দেয়া হবে।
১৮. পেনশনের জন্য নির্ধারিত চাঁদা বিনিয়োগ হিসেবে গণ্য করে কর রেয়াতের জন্য বিবেচিত হবে এবং মাসিক পেনশন বাবদ প্রাপ্ত অর্থ আয়কর মুক্ত থাকবে।
১৯. এ ব্যবস্থা স্থানান্তরযোগ্য ও সহজগম্য।
২০. অর্থাৎ কর্মী চাকুরি পরিবর্তন বা স্থান পরিবর্তন করলেও তার অবসর হিসাবের স্থিতি, চাঁদা প্রদান ও অবসর সুবিধা অব্যাহত থাকবে।
২১. নিম্ন আয়সীমা নিচের নাগরিকদের ক্ষেত্রে পেনশন স্কীমে মাসিক চাঁদার একটি অংশ সরকার অনুদান হিসেবে প্রদান করতে পারে।
২২. পেনশন কর্তৃপক্ষসহ সংশ্লিষ্ট অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের ব্যয় সরকার নির্বাহ করবে।
২৩. পেনশন কর্তৃপক্ষ ফান্ডে জমাকৃত টাকা নির্ধারিত গাইডলাইন অনুযায়ী বিনিয়োগ করবে (সর্বোচ্চ আর্থিক রিটার্ন নিশ্চিতকরণে)।
অনুমানভিত্তিক একটি হিসাবের কথা উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, যদি মাসিক চাঁদা ১০০০ টাকা, মুনাফা ১০ শতাংশ ও আনুতোষিক ৮ শতাংশ ধরা হয় তাহলে ১৮ বছর বয়সে যদি কেউ চাঁদা প্রদান শুরু করে এবং ৬০ বছর বয়স পর্যন্ত তা চালু থাকে তাহলে উক্ত ব্যক্তি অবসরের পর ৮০ বছর বয়স পর্যন্ত প্রতি মাসে ৬৪ হাজার ৭৭৬ টাকা পেনশন পাবেন।
যদি ৩০ বছর বয়সে চাঁদা প্রদান শুরু করেন এবং ৬০ বছর পর্যন্ত তা অব্যাহত থাকে তাহলে অবসরের পর প্রতিমাসে ১৮ হাজার ৯০৮ টাকা পেনশন পাবেন। তবে চাঁদার পরিমাণ ১০০০ টাকার বেশি হলে আনুপাতিক হারে পেনশনের পরিমাণও বেশি হবে। এ হিসাব একটি আনুমানিক হিসাব। প্রকৃত অবস্থা আইন ও বিধি প্রণয়ন এবং পেনশন কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠার পর বিস্তারিত জানা যাবে।
এর আগে অর্থনৈতিক বিষয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির অনুমোদনের জন্য ৩টি এবং সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির অনুমোদনের জন্য ৪টি প্রস্তাব উত্থাপন করা হলে সবগুলো প্রস্তাবই পাস করা হয়। সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভার প্রস্তাবনাগুলোর মধ্যে খাদ্য মন্ত্রণালয়ের একটি, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের একটি, নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের একটি এবং সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের একটি প্রস্তাবনা ছিল।
সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির অনুমোদিত চারটি প্রস্তাবে মোট অর্থের পরিমাণ ১,৪৪৪ কোটি ৩৯ লক্ষ ২৫ হাজার ২১৩ টাকা। মোট অর্থায়নের মধ্যে জিওবি হতে ব্যয় হবে ১,২৯২ কোটি ৪৩ লক্ষ ২৫ হাজার ২১৩ টাকা এবং এডিবি ঋণ ১৫১ কোটি ৯৬ লক্ষ টাকা।









