শুধু যে মনই ভোলায় তা নয়, দেশের ভোজ্য তেলের চাহিদা মেটাতে জুড়ি নেই সূর্যমুখীর। অর্থকরী ফসল হিসেবেও জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে চাষিদের কাছে। সরকারের কৃষি বিভাগের প্রণোদনায় তাই দেশের বিভিন্ন এলাকায় এর বাণিজ্যিক চাষ হচ্ছে।
কিশোরগঞ্জের হাওর অধ্যুষিত উপজেলা ভাটির রানীখ্যাত মিঠামইন। হাওরের এ উপজেলায় পর্যটকদের মনভোলাচ্ছে সূর্যমুখী। একদিকে বাম্পার ফলন, অন্যদিকে বাড়তি আয়। এ কারণেই কৃষকদের সূর্যমুখী ফুল আবাদে বাড়ছে আগ্রহ। দিন দিন সূর্যমুখী চাষের পরিধিও বাড়ছে মিঠামইনে। উৎপাদন খরচ যেমন কম তেমনি বীজ বাজারজাতকরণে চাহিদা অনেক বেশি। এতে আয় বেড়েছে চাষিদের। চলতি বছরে ভালো ফলন হওয়ায় হাসির ঝিলিক ফুটে উঠেছে কৃষকের মুখে।
আগে যেখানে শুকনো মৌসুমে ধান চাষ হতো, সেই মাঠেই এখন চাষ হচ্ছে সূর্যমুখী ফুলের। দিগন্তজোড়া মাঠে মনোমুগ্ধকর ফুলের সমারোহ। মিঠামইনের ঘাগড়া ইউনিয়নের কয়েকটি গ্রামে মাঠের পর মাঠ জুড়ে চোখ জুড়ানো সূর্যমূখীর হলুদ রূপ। যে রূপ শুধু স্থানীয় মানুষ বা চাষিদেরই দৃষ্টিকাড়ে না, জেলা বিভিন্ন জায়গা থেকে পর্যটকরা ছুটে আসেন সৌন্দর্য উপভোগ করতে।
মাঠের পর মাঠ জুড়ে আকাশের দিকে মুখ করে থাকা হলুদ ফুলের সমারোহ যেন অন্যরকম ঘোরলাগা ভালোলাগ তৈরি করে। দূর থেকে দেখলে মনে হয় যেন কেউ দিগন্তজুড়ে হলুদ গালিচা পেতে রেখেছেন। তবে যে মনই শুধু ভোলায় এমনটা নয়, অর্থকরী ফসল হিসেবে সূর্যমুখী ফুল থেকে চাষিদের আয়ও হয় অনেক বেশি। দেশের ভোজ্য তেলের চাহিদা মেটাতে জুড়ি নেই সূর্যমুখীর। সরকারের কৃষি বিভাগের প্রণোদনায় তাই দেশের বিভিন্ন এলাকায় বাণিজ্যিক চাষ করা হচ্ছে।
মিঠামইনের হোসেনপুর গ্রামের সূর্যমুখী চাষি জামাল উদ্দিন বলেন, হাওরে ছয় মাস পানি থাকে। আর বছরের বাকি ছয় মাস বোরো ধান আবাদ করি। তবে গত বছর থেকে কৃষি অফিস সূর্যমুখী ফুল চাষের পরামর্শ দিচ্ছে। কৃষি অফিসের পরামর্শে চলতি বছর এই ফুলের চাষ করেছি। বোরো আবাদের চেয়ে সূর্যমুখী ফুল চাষে খরচ কম, লাভ বেশি আর ফলনও ভালো।
মিঠামইন উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. রাফিউল ইসলাম জানান, চলতি বছর মিঠামইন উপজেলায় ১০০ বিঘা জমিতে সূর্যমুখী ফুলের চাষ হয়েছে। এর বীজ থেকে ভোজ্য তেল ও গাছ থেকে জ্বালানির চাহিদা মিটবে। আমরা সরেজমিনে কৃষকদের পাশে থেকে এই ফুল চাষের আবাদে উৎসাহ ও পরামর্শ দিচ্ছি।
হাওরে সূর্যমুখী চাষের ব্যাপারে স্থানীয় কয়েকজন কৃষকদের সঙ্গে কথা হলে তারা বলেন, হাওরে সূর্যমুখীর এতো ভালো ফলন হবে, আমরা ভাবতেও পারিনি। ফলন দেখে খুব ভালো লাগছে। ভবিষ্যতে আমরা সূর্যমুখী ফুলের চাষ করব।
দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে হাওরে ঘুরতে আসা পর্যটকদের সঙ্গে কথা বললে তারা জানান, বর্ষা মৌসুমে শুধু হাওরে নৌকায় চড়ে পানির সৌন্দর্য দেখতে আসতাম। এখন চোখ জুড়ানো পাকা সড়ক নির্মাণ আর শীত মৌসুমে সবুজের মাঝে হলুদের সমারোহ দেখতে আসি।
কিশোরগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক কৃষিবিদ ছাইফুল আলম জানান, জমির নিবিড়তা বৃদ্ধির জন্য ভিন্ন ভিন্ন ফসল আবাদে হাওরের কৃষকদের অভ্যস্ত করা হচ্ছে। অন্য ফসলের চেয়ে সূর্যমুখী ফুল চাষে খরচ কম। এতে সার ও ওষুধ কম লাগে। খুব বেশি পরিচর্যাও করতে হয় না। তা ছাড়া অন্যান্য তেলবীজের তুলনায় সূর্যমুখী ফুলে বেশি তেল পাওয়া যায়।
কিশোরগঞ্জ জেলা কৃষি বিভাগ সূত্রমতে, প্রতি তিন বিঘা জমিতে সূর্যমুখী ফুল চাষে খরচ হয় প্রায় ১২ হাজার টাকা। এর বীজ থেকে তৈরি তেল বাজারের অন্যান্য তেলের চেয়ে উন্নতমানের, পুষ্টিগুণও বেশি। এ ফুল থেকে উৎপাদিত তেলের দাম বেশি হওয়ায় কৃষকেরা লাভের মুখ দেখছেন। তাই এই সুর্যমূখী ফুল আবাদে জেলার কৃষকদের মাঝে আগ্রহ বাড়ছে।
আনন্দবাজার/শহক









