কাজুবাদাম দেশের সম্ভাবনাময়, রপ্তানিযোগ্য এবং উচ্চমূল্যের একটি ফসলের নাম। প্রচুর পরিমাণে প্রোটিন এবং বিভিন্ন ধরনের প্রয়োজনীয় ভিটামিন ও খনিজ সে সঙ্গে ঔষধি গুণাগুণ থাকায় বিশ্ববাজারে রয়েছে কাজুবাদামের ব্যাপক চাহিদা। দেশে এক কেজি প্রক্রিয়াজাত বাদাম ১০০০ থেকে হাজার থেকে ১২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
গ্রীষ্মকালীন এ ফসলটির চাষাবাদ এশিয়া এবং আফ্রিকা মহাদেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকায় বিশ্বের উন্নত দেশগুলো পুষ্টিকর এই কৃষিপণ্যটির জন্য মূলত এই দুই মহাদেশের দেশগুলোর ওপর নির্ভরশীল। বর্তমানে ফসলটি চাষে দেশে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। ফসলটি ব্যাপকভাবে চাষাবাদ করা গেলে খুলবে বৈদেশিক রপ্তানির দুয়ার। কারণ বৃক্ষ জাতীয় ফলের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে কাজুবাদামের রয়েছে তৃতীয় স্থানে আর বাদামজাতীয় ফসলের মধ্যে কাজুবাদাম রয়েছে প্রথম স্থানে। এ কারণে ফসলটি উৎপাদনের কারণে দেশে নতুন সম্ভাবনার উঁকি দিয়েছে বলে জনান গবেষক ও কৃষি বিজ্ঞানীরা।
কৃষি বিজ্ঞানীদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, কাজুবাদামে উপস্থিত প্রোটিন, অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, খনিজ এবং ভিটামিন নানাভাবে শরীরের উপকারে কাজে লাগে। শুধু তাই নয়, কাজুবাদামে ভিটামিনের মাত্রা এত বেশি থাকে যে একে প্রাকৃতিক ভিটামিন ট্যাবলেট নামেও পরিচিত। নিয়মিত কাজুবাদাম খেলে, তাহলে শরীরে নানা পুষ্টিকর উপাদানের ঘাটতি দূর হয়। খাদ্য মানের দিক দিয়ে কাজুবাদাম অতি পুষ্টিকর এবং স্বাস্থ্যকর। এতে শতকরা ২১ ভাগ আমিষ, ৪৭ ভাগ স্নেহ, ২২ ভাগ শর্করা, ২.৪ ভাগ খনিজ পদার্থ ০.৪৫ ভাগ ফসফরাস, ০.৫৫ ভাগ ক্যালসিয়াম এবং প্রতি ১০০ গ্রাম বাদামে ৫ মিলিগ্রাম লোহ, ৭৩০ মিলিগ্রাম ভিটামিন বি-১, ১১০ মিলিগ্রাম রাইবোফ্লোবিন রয়েছে। প্রচুর শর্করা, আমিষ, স্নেহ, খনিজ পদার্থ, ভিটামিনসহ অন্যান্য স্বাস্থ্য রক্ষায় উপকারী অনেক ফাইটোক্যামিক্যাল্স রয়েছ যা স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী বলেও জনান তারা।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য থেকে জানা গেছে, ২০১৮-২০১৯ বছরে দেশে কাঁচা কাজুবাদামের উৎপাদন ছিল ৯৬২ মেট্রিক টন, যা ২০১৯-২০ বছরে বৃদ্ধি পেয়ে দাঁডায় ১৩২৩ মেট্রিক টনে। সম্প্রতি কৃষি মন্ত্রণালয় অপ্রচলিত ফসলের সম্প্রসারণের লক্ষ্যে ‘কাজুবাদাম ও কফি গবেষণা, উন্নয়ন ও সম্প্রসারণ’ শীর্ষক ২১১ কোটি টাকার আরেকটি প্রকল্প হাতে নিয়েছে যার কারণে কৃষকদের মাঝেও ফসলটি চাষে আগ্রহ তৈরি করেছে। আবার এদিকে দেশে কাজুবাদামের প্রক্রিয়াজাত সহজতর করা এবং প্রক্রিয়াজাত শিল্প গড়ে তোলার জন্য কাঁচা কাজুবাদাম আমদানির ওপর শুল্কহার ৯০ শতাংশ থেকে কমিয়ে মাত্র ৫ শতাংশ করা হয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বাংলাদেশে ইতোমধ্যে বেশ কয়েকটি কাজুবাদাম প্রক্রিয়াজাত প্লাট স্থাপিত হয়েছে এবং বর্তমানে দেশীয় কাজুবাদামের যে উৎপাদন তা এই কারখানাগুলোর জন্য যথেষ্ট নয়। নীলফামারী জেলায় জ্যাকপট কাজুবাদাম ইন্ডাস্ট্রি নামে একটি প্রক্রিয়াজাত ফ্যাক্টরি গড়ে উঠে। ২০১৯ সালে গ্রিন গ্রেইন গ্রুপ চট্টগ্রামের পতেঙ্গায় আধুনিক মানের একটি কাজুবাদাম প্রক্রিয়াজাত শিল্প গড়ে তোলে। বাংলাদেশ স্টিল রি-রোলিং মিলস (বিএসআরএম) কাজুবাদাম প্রসেসিং প্লান্ট স্থাপনের জন্য চট্টগ্রামের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব শিল্পনগরে ১৫ একর জমি লিজের জন্য বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের কাছে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। বান্দরবন ও রাজশাহীতেও একটি করে প্রক্রিয়াজাত কারখানা গড়ে উঠেছে।
কৃষি তথ্য সার্ভিসের পরিচালক (অবঃ) কৃষিবিদ রেজওয়ানুল ইসলাম মুকুল বলেন, বাংলাদেশে কাজুবাদামের অভ্যন্তরীণ চাহিদা দিন দিন বাড়ছে। ২০১৪-১৫ সালে দেশে মাত্র ১৮,০০০ কেজি প্রক্রিয়াজাত কাজুবাদাম আমদানি হয়, যা ২০১৮-২০১৯ সালে বেড়ে দাঁড়ায় ৫ লাখ ৮০ হাজার টনে। ২০১৯-২০ সালে কাজুবাদাম আমদানি হয় সাড়ে ৬ লাখ মেট্রিক টন অথচ বাংলাদেশ কাজুবাদাম উৎপাদনের এক সম্ভাবনাময় উর্বর ভূমি। বর্তমানে কাজুবাদামের আন্তর্জাতিক বাজারমূল্য রয়েছে প্রায় ১৪.৯ বিলিয়ন ডলার যেখানে, ভিয়েতনাম এককভাবে ৪ বিলিয়ন ডলারের কাজুবাদাম রপ্তানি করে থাকে। বাংলাদেশ ২০১৯-২০ সালে ভিয়েতনামে ও ভারতে কাঁচাকাজুবাদাম যেখানে রপ্তানি করেছে মাত্র ৩ দশমিক ৫৭ লাখ ডলারের, সেখানে প্রস্তুত বাদাম আমদানিই করেছে ভিয়েতমান থেকে ৮৫৭ টন। আমদানি-রপ্তানির এই পরিসংখ্যান থেকে কাজুবাদামের অর্থনৈতিক গুরুত্ব অনুধাবন করাটা খুব একটা কঠিন কাজ নয়। ২০২০ সালের উৎপাদন হিসাব অনুযায়ী বাংলাদেশে কাজুবাদামের ফলন প্রতি হেক্টরে ১ দশমিক ৩২৩ টন।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের তিন পার্বত্য জেলা বান্দরবন, রাঙ্গামাটি ও খাগড়াছড়ির মোট আয়তন ১৩,৩৪,৪০০ হেক্টর যার মাত্র ৫ শতাংশ সমতল ফসলি জমি এবং বাকিটা পাহাড়ী এলাকা। কাজুবাদাম চাষের জন্য যে রকম মাটি, তাপমাত্রা ও বৃষ্টি দরকার তার সম্পূর্ণ বৈশিষ্ট্য রয়েছ এই পাহাড়ী এলাকায়। তিন পাবর্ত্য জেলার কমপক্ষে ২২ শতাংশ জমিতে এখনি কাজুবাদাম চাষের সুযোগ রয়েছে। পাশাপাশি দেশের অন্যান্য সীমান্তবর্তী পাহাড়ী এলাকার মাটিও কাজুবাদাম চাষের অনুকূলে। অর্থাৎ সঠিক পরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে যেতে পারলে ভিয়েতনামের সফলতার গল্প শুনতে হবে না বরং বাংলাদেশ আগামী দিনে ভিয়েতনামের জায়গায় প্রতিষ্ঠিত হতে পারবে।
আনন্দবাজার/শহক









