বতর্মান সময়ে আজ ছাত্র ও শিক্ষকের মধ্যে বিশাল ব্যবধান লক্ষ্য করা যায়। শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘটনাটি তার প্রমাণ। ছাত্ররা দল পোষা হয়ে শিক্ষকদের অবমাননা করেছে, নিগৃহীত করেছে- জনগণ সবই দেখেছে অবাক বিস্ময়ে, সবই জেনেছে। আজকাল ভাইবোন, জামাতা কন্যা, পুত্র-পুত্রবধূ মিলেই একটা প্রাইভেট স্কুল বা প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যাবিদ্যালয় গড়ে তোলেন। এই প্রাইভেট প্রতিষ্ঠানটির কর্ণধাররাই এই প্রতিষ্ঠানটির মালিক হয়ে যান। প্রাইভেট মানেই তো ব্যক্তিগত সম্পত্তি। শিক্ষাকে বাণিজ্যিকীকরণে অধঃপতনের মূল হলো এই মালিকানাধীন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলি: প্রাইভেট স্কুল, কিন্ডারগার্টেন কোচিং সেন্টার প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় যাই বলুন না কেন? এই প্রতিষ্ঠানগুলির টিউশন ফি ও অন্যান্য ফি নির্ধারণের কোনো নিয়ম নীতিমালা নেই। নীতিমালা প্রণয়নের বিষয়টির দিকে দৃষ্টি দেয়া অত্যন্ত জরুরি।
একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণির পিছিয়ে পড়া ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য শিক্ষকরা আন্তরিকভাবে নিজেদের তাগিদেই ক্যাম্পাসে আলাদাভাবে ফ্রি কোচিং ব্যবস্থা করতেন। প্রয়োজনে অনেক ছাত্রের বাড়ি গিয়ে তাদের লেখাপড়ার খোঁজ খবরও নিতেন। ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য শিক্ষবৃন্দের অক্লান্ত পরিশ্রমের বিনিময়ে তাদের ভালো রেজাল্ট এবং স্কুলের সুনামে তাদের অভাবনীয় গর্ববোধ ছিল। এখনো সেইসব ছাত্রছাত্রীরা তাদের প্রতিষ্ঠিত স্বঅবস্থান থেকে দেখা হলে সেই আগের মতো শ্রদ্ধায় আনতো অভিবাদনে বুক ভরিয়ে দেয়। আমি গর্বিত হই আমার অর্থনৈতিক জীবনের প্রথম সকাল এবং প্রথম কর্মস্থল ছিল সৈয়দপুর ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল এন্ড কলেজ। গর্বিত হই আমার সন্তানদের প্রাথমিক ভিত্তি সেখান থেকেই রোপিত হয়েছিল। তারাও আজ সুপ্রতিষ্ঠিত।
কিন্তু হায়! বতর্মান সময়ে আজ ছাত্র ও শিক্ষকের মধ্যে বিশাল ব্যবধান লক্ষ্য করা যায়। শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘটনাটি তার প্রমাণ। ছাত্ররা দল পোষা হয়ে শিক্ষকদের অবমাননা করেছে, নিগৃহীত করেছে- জনগণ সবই দেখেছে অবাক বিস্ময়ে, সবই জেনেছে। আজকাল ভাইবোন, জামাতা কন্যা, পুত্র-পুত্রবধূ মিলেই একটা প্রাইভেট স্কুল বা প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যাবিদ্যালয় গড়ে তোলেন। এই প্রাইভেট প্রতিষ্ঠানটির কর্ণধাররাই এই প্রতিষ্ঠানটির মালিক হয়ে যান। প্রাইভেট মানেই তো ব্যক্তিগত সম্পত্তি। শিক্ষাকে বাণিজ্যিকীকরণে অধঃপতনের মূল হলো এই মালিকানাধীন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলি: প্রাইভেট স্কুল, কিন্ডারগার্টেন কোচিং সেন্টার প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় যাই বলুন না কেন? এই প্রতিষ্ঠানগুলির টিউশন ফি ও অন্যান্য ফি নির্ধারণের কোনো নিয়ম নীতিমালা নেই। নীতিমালা প্রণয়নের বিষয়টির দিকে দৃষ্টি দেয়া অত্যন্ত জরুরি।
একজন অভিভাবকের সঙ্গে শিক্ষা বিষয়ে আলোচনার সময় তিনি জানালেন, প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি পরীক্ষা দিয়ে তিনি নাতনিকে ভর্তি করেছেন ভিকারুন্নেসা নূন স্কুলে। তবে ভর্তির পর বাচ্চা পেট ব্যথা, মাথা ব্যথা নানান অজুহাতে স্কুলে যেতে চায় না, অনেক বুঝিয়ে স্কুলে পাঠাতে হয়। রীতিমতো স্কুল ভীতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। তার ক্লাস ডায়েরি খুলে দেখি প্রতিদিনের পাতায় কোনো কমেন্ট বা নির্দেশনা কিছুই লেখা নাই। কয়েক মাস এভাবে কেটে গেলে একদিন তিনি ক্লাস টিচারের সঙ্গে দেখা করলেন। ক্লাসে দু’জন করে টিচার থাকেন একসঙ্গে বাচ্চাদের সামাল দিতে। ক্লাস টিচার আমার নাতনির কথা বললেন- ও তো ছোট কিছু পারে না। ওকে কোচিং দিতে হবে- নির্ধারিত টিচারের ঠিকানা দিয়ে দিলেন। তারপর যা হোক নির্ধারিত টিচারের কাছে দিতে হলো। তিনি আরও জানালেন: মোহাম্মদপুরে কচুরিপানার মতো কতগুলি কোচিং সেন্টার গড়ে উঠেছে।
তাজমহল রোডে ও রাজিয়া সুলতানা রোডে দুটা বিল্ডিং নিয়ে ‘মেধাককুঞ্জ’ প্রতি ফ্লোরে চার রুম, প্রত্যেক রুমে ৫০/৬০ জন ছাত্র-ছাত্রী একসঙ্গে দুই তিন ঘণ্টা পড়ে। জনপ্রতি মাসিক ২০০০ টাকা কোচিং ফি’। মেধাকুঞ্জকে মেধা বিপনী বললেও ভুল হবে না আমার তো মনে হয়। তাজমহল রোডে ‘পাঠশালা’ ‘বর্ণমালা’ ‘ধানসিঁড়ি’ ‘অর্কিড’ কত নামের কোচিং সেন্টার। ইকবাল রোডের চারপাশে কোচিং সেন্টারের মেলা। প্রথম শ্রেণি থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত। এছাড়াও শ্রেণি শিক্ষক, বিষয় শিক্ষক অনেকেই তাদের নিজ বাড়িতে কেউ ভাড়া বাড়ি নিয়ে ওয়ান ও ক্লাস টুর বাচ্চাদের পাঠদান করে নোট শিট দিয়ে দিচ্ছেন। ওয়ান ও টু এর বাচ্চারা নোটশিটের কী বোঝে বলুন তো? শিশুদের শিক্ষাদানের এ পরিবেশের বেহাল অবস্থায় মালিক শিক্ষকদের প্রাইভেট বাণিজ্য রমরমা, দেখার কেউ নেই।
প্রাথমিক শিক্ষাই হলো সব শিক্ষার ভিত্তি। তবে বর্তমান পরিস্থিতি হলো- প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শ্রেণি মিলিয়ে দেশের প্রায় ৫৬ লাখ শিশু বিদ্যালয়ে যায় না। ঝরে পড়ার হারও আরও অনেক বেশি। তার ওপর কোচিং বাণিজ্য ও প্রশ্নপত্র ফাঁস ও এ ধরনের নানাবিধ কারণে সংখ্যাধিক শিশু ও শিক্ষার্থীরা প্রতিভা বিকাশের সুযোগ থেকে বঞ্চিত ও অবহেলিত হচ্ছে। বিপ্লবী চে গুয়েভারার উক্তি উল্লেখ করে বলতে চাই, শিক্ষা ব্যবস্থা তৃণমূল পর্যায়ে নিয়ে যেতে হবে, যেখানে গরীব থেকে ধনী একই শিক্ষায় শিক্ষিত হবে, এমন নয় যে যাদের টাকা আছে শুধু তারাই শিক্ষিত হবে।
১০ সেপ্টেম্বর, ২০১৫ সালে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতীয় সংসদে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে যথার্থই বলেছিলেন, ‘এই যে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যিালয় ধানমন্ডিতে এক বিল্ডিংএ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়, গুলশানে এক ছাদের নিচে কয়েকটি। বড় বড় নাম, গাল ভরা বুলি, এদের কোনো একাউন্টিবিলিটি নেই। ঠিক যেন ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে উঠা কোচিং সেন্টারগুলিরও একই অবস্থা। জবাবদিহিতা নেই। দেখার কেউ নেই।
আমাদের দেশে বৃটিশ আমলে বহু বেসরকারি স্কুল-কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। বিত্তশালী ও বিদ্যোৎসাহী মানুষ জায়গা জমি টাকা পয়সা দান করে সত্ত্ব ত্যাগ করে অনেক প্রতিষ্ঠান গড়েছিলেন। তবে প্রতিষ্ঠাতা বা তার উত্তারাধিকারীরা এগুলির কোনো মালিকানা কোনো কালে দাবি করে নাই। ২০১০ সালে প্রণীত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইনে স্পষ্টই বলা আছে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হবে অলাভজনক। দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জন ও গতিশীল সমাজ সৃষ্টিতে দক্ষমানব সম্পদের বিকল্প নেই। আর দক্ষতা উন্নয়নের ক্ষেত্রে শিক্ষা উন্নয়নের বিকল্প নেই।
প্রাথমিক শিক্ষাই হলো সব শিক্ষার ভিত্তি। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি হলো- প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শ্রেণি মিলিয়ে দেশের প্রায় ৫৬ লাখ শিশু বিদ্যালয়ে যায় না। (ইউনেস্কো ২০১৪) ঝরে পড়ার হারও আরও অনেক বেশি। তার ওপর কোচিং বাণিজ্য ও প্রশ্নপত্র ফাঁস ও এ ধরনের নানাবিধ কারণে সংখ্যাধিক শিশু ও শিক্ষার্থীরা প্রতিভা বিকাশের সুযোগ থেকে বঞ্চিত ও অবহেলিত হচ্ছে। বিপ্লবী চে গুয়েভারার উক্তি উল্লেখ করে বলতে চাই, শিক্ষা ব্যবস্থা তৃণমূল পর্যায়ে নিয়ে যেতে হবে, যেখানে গরীব থেকে ধনী একই শিক্ষায় শিক্ষিত হবে, এমন নয় যে যাদের টাকা আছে শুধু তারাই শিক্ষিত হবে।
শিক্ষা প্রতিটি নাগরিকের মৌলিক অধিকার। নাগরিকের মৌলিক অধিকার রক্ষা করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। প্রকৃত অর্থে শিক্ষাকে অধিকার হিসাবে প্রতিষ্ঠা করতে হলে, শিক্ষা ক্ষেত্রে জাতিকে কলঙ্কমুক্ত করতে হলে, প্রাইভেট পাবলিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, দাবি বিলাসবহুল ও ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল বা কলেজ এবং সাধারণ স্কুল কলেজের মধ্যে সবরকম বৈষম্য বাতিল করে একমুখী শিক্ষা ব্যবস্থা চালু করতে হবে। সর্বত্র একমানের শিক্ষা কোর্সের একমুখী শিক্ষা ব্যবস্থা অর্থাৎ গোটা শিক্ষা ব্যবস্থাকে জাতীয়করণ করতে হবে। শিক্ষা ব্যবস্থাকে জাতীয়করণ করা হলে ‘সবার জন্য শিক্ষা’ ‘অধিকার’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করবে। অন্তত একটা পর্যায় পর্যন্ত সবার জন্য বেসিক (নাগরিক স্ট্যাটাস) শিক্ষাব্যবস্থা নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব।
লেখক: কবি কথাসাহিত্যিক, বিটিভির গীতিকার ও প্রাবন্ধিক।









