৬০০ মাইলের বিশাল গ্যাসলাইন
সরবরাহ হবে ৫০ বিলিয়ন ঘনমিটার
সংকটে পড়বে ইউরোপ
- রুম হিটার বন্ধে কাবু হবে ঠাণ্ডায়
- কমে যাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন
ইউরোপের প্রায় অর্ধেক গ্যাস সরবরাহ করে থাকে রাশিয়া। তবে চলমান ইউক্রেন যুদ্ধে গ্যাস সরবরাহের ভবিষ্যৎ নিয়ে দেখা দিয়েছে অনিশ্চয়তা। একের পর পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞায় সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে ইউরোপের দেশগুলো। তাছাড়া যুক্তরাষ্ট্র রাশিয়ার গ্যাসখাতের ওপরও অবরোধ দিতে চাচ্ছে। যদিও এতে সায় দেয়নি ইইউ। কিন্তু নিজেদের ব্যবসায়িক অনিশ্চয়তার কথা চিন্তা করে বিকল্প পথ করে নিচ্ছে রাশিয়া।
এমন অবস্থায় অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও রাশিয়ান গ্যাস ইন্ডাস্ট্রি কোম্পানি গ্যাজপ্রম চীনে ৫০ বিলিয়ন ঘনমিটার গ্যাস সরবরাহের জন্য পাইপলাইন নির্মাণের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।
রাশিয়ার অর্থনীতির একটি বড় অংশ জুড়ে আছে গ্যাস এবং তেল রপ্তানি। এর প্রধান গ্রাহক ইউরোপীয় দেশগুলো। ইউক্রেনে আগ্রাসনের প্রতিবাদে ইউরোপীয় দেশগুলো রাশিয়ার ওপর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা জারি করলেও তারা জ্বালানি আমদানি বন্ধ করেনি। তবে সামনে এ ব্যবসা অব্যাহত থাকবে কিনা তা এখনই বলা যাচ্ছে না।
ইউরোপে মোট ব্যবহৃত প্রধান জ্বালানি পণ্যের এক-পঞ্চমাংশ হলো প্রাকৃতিক গ্যাস। মহাদেশের ২০ শতাংশ বিদ্যুৎ উৎপাদন হয় গ্যাস পুড়িয়ে। শীতকালে ঘর উষ্ণ রাখতে গ্যাস চালিত হিটারসহ শিল্প উৎপাদনেও লাগে জ্বালানিটি। বিশেষজ্ঞদের মতে, গোটা ইউরোপে যে পরিমাণ গ্যাসের ব্যবহার হয়, তার ৪৩ শতাংশ রাশিয়ান প্রতিষ্ঠান গ্যাসপ্রমের এবং জ্বালানি তেলের ৩০ শতাংশ রাশিয়ার। রাশিয়া থেকে পাইপলাইনের সাহায্যে যা গোটা ইউরোপে ছড়িয়ে পড়ে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে রাশিয়া যদি ইউরোপে গ্যাস সাপ্লাই একদিনের জন্যও বন্ধ করে দেয়, তাহলে প্রবল সমস্যায় পড়বে ইউরোপ। রাশিয়া জানে, যা-ই ঘটুক না কেন, ইউরোপকে তার কাছ থেকে প্রাকৃতিক সম্পদ নিতেই হবে। কারণ এই মুহূর্তে গ্যাস বিশ্ব ব্যবস্থায় এর ভালো কোনো বিকল্প হাতে নেই ইউরোপের। তাই রাশিয়া গ্যাস সরবরাহ বন্ধ করে দিলে শীতে ঘর উষ্ণ রাখার ব্যবস্থাও থাকবে না ইউরোপের।
রাশিয়ান পাইপলাইন
এদিকে যুদ্ধ চলাকালীন নর্ড স্ট্রিম ২ পাইপলাইনের পরিকল্পনা স্থগিত করেছে জার্মানি। ইউরোপের মূল ভূখণ্ডে গ্যাস বহন করার জন্য ডিজাইন করা হয়েছে এই লাইন। তবে ইউরোপে গ্যাস সরবরাহকারী নর্ড স্ট্রিম ১ এখনও কার্যকর রয়েছে। শেল এবং বিপি-এর মতো জ্বালানির প্রধান সংস্থাগুলো রাশিয়ান জ্বালানি ব্যবসা থেকে সংযোগ ছিন্ন করার ইঙ্গিত দেওয়ায় এখন গ্যাজপ্রম তাদের গ্যাস সরবরাহ বিস্তৃত করার উপায় খুঁজছে।
বিশ্বের দ্রুত বর্ধনশীল গ্যাসের বাজার হিসেবে চীন তাদের জন্য একটি আকর্ষণীয় গন্তব্য। এছাড়া চীন রাশিয়ার সাম্প্রতিক সামরিক পদক্ষেপকে ‘আগ্রাসন’ বলা থেকে বিরত থাকাও এর কারণ হতে পারে। ২০১৪ সালে ৩৮ বিলিয়ন ঘনমিটার গ্যাস সরবরাহের জন্য চীনের সঙ্গে ৩০ বছরের চুক্তি করে গ্যাজপ্রম। ব্লুমবার্গের প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, সেই চুক্তির অংশ হিসেবে ২০১৯ সালে পাওয়ার অব সাইবেরিয়া পাইপলাইনের কাজ শেষ হলে সেবছরই সরবরাহ শুরু হয়।
সয়ুজ ভস্টক পাইপলাইন
সয়ুজ ভস্টক নামে পরিচিত পাওয়ার অফ সাইবেরিয়া-২ গ্যাস পাইপলাইন নির্মাণের মাধ্যমে এখন চীনের সাথে তার সম্পর্ক আরও জোরদার করতে চাইছে গ্যাজপ্রম। সম্প্রতি কোম্পানিটি জানায়, চেয়ারম্যান অ্যালেক্সি মিলার সম্প্রতি মঙ্গোলিয়া দিয়ে পাইপলাইনটি সম্প্রসারণের বিষয়ে আলোচনা করতে মঙ্গোলিয়ার উপ-প্রধানমন্ত্রী সাইনবুয়ান আমরসাইখানের সঙ্গে বৈঠক করেছেন।
বৈঠকের সময় পাইপলাইন নির্মাণের জন্য একটি নকশা এবং জরিপের চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। মঙ্গোলিয়ান কোম্পানিগুলোকে ভূমি ও প্রত্নতাত্ত্বিক জরিপ চালাতে এবং পরিবেশের উপর এই প্রকল্পের প্রভাব মূল্যায়ন করার জন্য এই চুক্তি সাক্ষরিত হয় বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
গত মাসে প্রকল্পের সম্ভাব্যতা প্রতিবেদনটি অনুমোদিত হয়। প্রতিবেদন অনুযায়ী, পাইপলাইনটি মঙ্গোলিয়ান অঞ্চলের মধ্য দিয়ে ৫৯৮ মাইল প্রসারিত হবে। এ প্রকল্পে ব্যবহৃত পাইপের ব্যাস হবে ১.৪২ মিটার বা প্রায় ৫৬ ইঞ্চি। এছাড়া, চীনে ৫০ বিলিয়ন ঘনমিটার বা ১.৮ ট্রিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পাঠানোর জন্য রুট বরাবর পাঁচটি কম্প্রেসার স্টেশন স্থাপন করা হবে এ প্রকল্পের আওতায়।
চুক্তিটি কার্যকর হলে, চীনে গ্যাস সরবরাহের জন্য রাশিয়া তার পশ্চিম এবং পূর্বগামী পাইপলাইনগুলোর মধ্যে একটি আন্তঃসংযোগকারী পথ তৈরি করবে বলেও উল্লেখ করা হয়। এতে করে ইউরোপীয় আমদানির উপর রাশিয়ার নির্ভরতা কমে আসবে।
অ্যালেক্সি মিলার বলেন, ‘সয়ুজ ভস্টক গ্যাস পাইপলাইন প্রকল্পের কাজ সক্রিয়ভাবে এবং সফলভাবে এগিয়ে চলেছে। এক মাস আগে সম্ভাব্যতা স্টাডির ফলাফল অনুমোদিত হয় এবং আজ এর একটি নকশা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। অর্থাৎ, প্রকল্পটি এখন বাস্তব পর্যায়ে আছে।’
অন্যদিকে ইউরোপীয় ইউনিয়ন একটি খসড়া পরিকল্পনা তৈরি করেছে, যার মাধ্যমে তারা রাশিয়ার জ্বালানির ওপর থেকে নির্ভরশীলতা কমিয়ে আনার চেষ্টা করবে। ২০৩০ সালের মধ্যে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ওপর নির্ভরশীলতা বাড়ানোর পাশাপাশি জ্বালানির জন্য রাশিয়ার বদলে অন্য বিকল্প খোঁজার প্রতি গুরুত্ব দেয়া হয়েছে ওই পরিকল্পনায়।
পাল্টাপাল্টি অভিযোগ
ইউক্রেনে রাসায়নিক কিংবা জৈব অস্ত্র ব্যবহার করে রাশিয়া হামলার পরিকল্পনা করতে পারে বলে সতর্ক করেছে হোয়াইট হাউজ। এর আগে বুধবার ব্রিটিশ প্রতিরক্ষামন্ত্রী দাবি করেন, রাশিয়া ইউক্রেনে থার্মোবারিক রকেট ব্যবহার করেছে। এসব রকেট ভ্যাকুয়াম বোমা নামেও পরিচিত।
পশ্চিমা কর্মকর্তারা রাশিয়ার বিরুদ্ধে জৈব ও রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহারের অভিযোগ তুললেও পাল্টা অভিযোগ তুলেছে মস্কো। যুক্তরাজ্যের রুশ দূতাবাসের এক বিবৃতিতে দাবি করা হয়, ইউক্রেনীয় ল্যাবরেটরিতে জৈব অস্ত্র তৈরির উপাদান তৈরি হওয়ার ‘সাম্প্রতিক নথি পেয়েছে’ তারা। এসব অস্ত্র তৈরিতে মার্কিন প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় অর্থায়ন করছে বলে দাবি করে রুশ দূতাবাস।
তবে রাশিয়ার ওই অভিযোগ অস্বীকার করেছে যুক্তরাষ্ট্র। ওয়াশিংটন বলেছে, বহু বছর ধরে ইউক্রেন এবং অন্য দেশগুলো নিয়ে এই একই ধরনের ভুয়া তথ্যের প্রচারণা চালিয়ে আসছে রাশিয়া।









