তিস্তা, যমুনা ও ব্রহ্মপুত্রসহ নদীবিধৌত গাইবান্ধা জেলার কৃষকেরা এখন আগাম জাতের ভুট্টা চাষে ব্যস্ত সময় পার করছেন। ভাঙ্গন কবলিত জনপদের এ জেলায় প্রতিবছর হাজার হাজার আবাদি জমির ফসল বন্যার পানিতে তলিয়ে যায়। এতে কৃষকরা দিশেহারা হয়ে পড়েন। সর্বস্ব হারিয়ে এক সময়ের জোতদার হয়ে পড়েন দিনমজুর। মহাজনের পাওনা পরিশোধে বিক্রি করেন হালের বলদ। এ অবস্থা থেকে উত্তরণে জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সহযোগিতায় পাল্টে যাচ্ছে কৃষকের জীবন-জীবিকা ও চাষাবাদের ধরণ। নদী শাসন করে তারা উর্বর পলিমাটিতে চলছে সনাতনী পদ্ধতির পরিবর্তে আধুনিক পদ্ধতির চাষাবাদ। উন্নয়ন পরিকল্পনার অংশ হিসেবে বিশাল চরাঞ্চালে ভুট্টা ফসলকে টার্গেট করে চাষাবাদে ব্যাপক সফলতা অর্জন করছেন কৃষকরা।
কৃষি বিভাগ জানান, কৃষকরা এনকে ৪০, সুপার, সুপারগোল্ড, হাইব্রিড ৫২, কনক-৫১ এবং সিনজেনটার ৭৭২০ জাতের ভুট্টার বীজ রোপণ করেছেন। গাইবান্ধা জেলায় ১৬ হাজার ৬৬০ হেক্টর জমিতে ভুট্টাচাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর ফলে এবার আগাম জাতের ৮ হাজার ৬শ হেক্টর জমিতে ভুট্টা চাষে শুরু হয়েছে। প্রতিহেক্টরে উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৪০০ থেকে সাড়ে চারশ মণ। দুর্গম চরাঞ্চলে ভুট্টাচাষি কৃষকদের উৎপাদিত ভুট্টা সঠিক মূল্যে বিক্রয়ের জন্য স্থানীয় পর্যায়ে কৃষক কন্ট্রাক্টর তৈরি, নতুন জাতের ভুট্টার প্রদর্শনী প্লাট স্থাপন, দলভুক্ত কৃষক ও কন্ট্রাক্টরদের আধুনিক চাষাবাদ পদ্ধতি ও সুষম সারের ব্যবহার সম্পর্কে প্রশিক্ষণ প্রদান, বালাই দমনে কোয়ালিটি সমৃদ্ধ বালাইনাশক এবং হাইব্রিড জাতের বীজের সরবরাহ নিশ্চিতকরণের মতো কাজ করে যাচ্ছে কৃষিবিভাগ।
গাইবান্ধার তিস্তা, যমুনা, ব্রহ্মপুত্রর নদীর ৬৫ বর্গ কিমি জুড়ে বালুচরে এখন সবুজের সমরোহ। চোখ জুড়ানো ভুট্টার ক্ষেত। গত বছরের লোকসান পুষিয়ে নিতে চাষিরা নানা সমস্যা সংকটেও স্বপ্ন দেখছেন। ঋণের দায় থেকে এখনো মুক্ত হতে পারেনি। তারপর আবারও অনেকেই দাদন ব্যবসায়ীদের কাছে সুদের উপর টাকা নিয়েছেন। তবে সরকারি সহায়তা পেলে ভুট্টা চাষিদের আর পেছনে ফিরে তাকাতে হতো না। পরপর তিন দফা বন্যায় ধান ভুট্টাসহ ও অন্যান্য ফসলে লোকসানের পর এবার গাইবান্ধার চরাঞ্চলের কৃষকরা আগাম ভুট্টার ফলন নিয়ে আশায় বুক বেঁধেছেন। তবে তেল, সার, কীটনাশক, সেচের খরচ দিতে হচ্ছে বেশি। দুঃশ্চিন্তাগ্রস্ত কৃষক দাদন ব্যাবসায়ীদের কাছে জিম্মি হচ্ছেন। কৃষকদের দুরাবস্থা দেখে দাদন ব্যবসায়ীরাও সুযোগ নিচ্ছে। তারপরও এবার ৮ হাজার ৬শ হেক্টর জমিতে আগাম জাতের ভুট্টার আবাদ হয়েছে। যার বর্তমান বাজার মূল্য ভুট্টার প্রতিমণ ৮ শ থেকে ৯ টাকা।
গাইবান্ধা সদর উপজেলার খারজানি চরের ভুট্টাচাষি রফিক মিয়া জানান, ফলন ভালো হয়েছে। ধানসহ অন্যান্য ফসলের উৎপাদন খরচের চেয়ে ভুট্টা চাষে খরচ কম, লাভ বেশি। প্রতিবিঘায় জমি চাষ, বীজ রোপন, সার, পানি, নিড়ানী, তোলা মাড়াইসহ ১২ থেকে ১৩ হাজার টাকা খরচ হয়। এতে ৫০ মণ ভুট্টা পাওয়া যায়। সদর উপজেলার কামারজানি ইউনিয়নের ব্যবসায়ী টিপু মিয়া জানান, দাদন ব্যবসায়ীরা এক হাজার টাকার বিপরীতে প্রতিমাসে ১০০ টাকা অথবা ফসল ওঠার পর ১ মণ ভুট্টা দাবি করছে। গেলবছর ভুট্টার ন্যায্য দাম না পেয়ে কৃষি ব্যাংকের ঋণশোধ করতে না পারায় নতুন করে আবারও বিপদে পড়েছেন তারা। নতুন করে কৃষিঋণের পরিবর্তে ঋণ পরিশোধে চাপ দেয়া হচ্ছে।
গাইবান্ধা কৃষি বিভাগের উপ-পরিচালক বেলাল উদ্দিন জানান, ভৌগলিক অবস্থায় গাইবান্ধা অঞ্চলের জমিগুলো ভুট্টা চাষের জন্য খুবই উপযোগি। তবে মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তারা ভুট্টাচাষিদের সময়মতো সঠিক পরামর্শ এরং চাষীদের আন্তরিক প্রচেষ্টায় এ এলাকায় ভুট্টার বাম্পার ফলন হচ্ছে। চলতি মৌসুমে ভুট্টাচাষে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ১৬ হাজার ৬৬০ হেক্টর। এখন পর্যন্ত আগাম জাতের ভুট্টা চাষ হয়েছে ৮ হাজার ৬০০ হেক্টর জমিতে।
আনন্দবাজার/শহক









