সঙ্গীতশিল্পী মিলার সাবেক স্বামী পাইলট এস এম পারভেজ সানজারির ওপর এসিড নিক্ষেপের ঘটনায় জড়িত ছিলেন কিম জন পিটার হালদার। তিনি দীর্ঘদিন মিলার দেহরক্ষী হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন। উত্তরার যে বাসার সামনে এসিড নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে, সেখানকার সিসিটিভির ফুটেজে প্রথমে পিটারকে দেখা যায়। সেই সূত্র ধরে পরে বুধবার রাজধানীর একটি এলাকা থেকে তাকে গ্রেফতার করে ডিবি পুলিশ। এরপর তাকে তিন দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।
সিসিটিভির ফুটেজ ও পিটারের দেওয়া তথ্যে তদন্তে যে নতুন মোড় নিয়েছে, তাতে জড়িয়ে যাচ্ছেন মিলাও। আরও তথ্য যাচাইয়ের পরই এসিড নিক্ষেপের মতো বর্বরোচিত এ ঘটনায় দায়ের মামলায় মিলা ও তার দেহরক্ষীকে আসামি করে চার্জশিট তৈরি করবে ডিবি। আগের দাম্পত্য কলহের জেরে কীভাবে একটি পৈশাচিক ঘটনা ঘটতে পারে, সে তথ্য উঠে আসছে।
পুলিশের কাছে দেওয়া ১৬১ ধারার জবানবন্দিতে পিটার স্বীকার করেছেন, পূর্বপরিকল্পিতভাবে সানজারির ওপর এসিড ছুড়েছিলেন তিনি। এর আগে আরও কয়েক দফা হামলা চালানোর চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন। মিলা এ হামলার কথা জানতেন।
তদন্ত-সংশ্নিষ্ট একাধিক সূত্র বলছে, পিটার পুলিশকে জানিয়েছেন, তিনি অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেছেন। ছোট থেকে নেশার জগতে পা রাখায় পড়াশোনা বেশিদূর এগোয়নি। একসময় পিটারের এক মামাতো ভাই মিলার ব্যান্ড 'মিউজিক রোবটের' কি-বোর্ড বাজাতেন। তার মাধ্যমে মিলার সঙ্গে পরিচয় হয়। পরিচয়ের পর পাঁচ বছর ধরে মিলার ব্যান্ডের মালামাল বহনের কাজে যুক্ত ছিলেন তিনি। এরপর ধীরে ধীরে তার ওপর আস্থা বাড়ে মিলার। একসময় পিটারকে দেহরক্ষী হিসেবে নিয়োগ দেন মিলা।
জিজ্ঞাসাবাদে পিটার জানান, চলতি বছরের মে মাসে মিলা কান্না করতে করতে পিটারকে বলেন- সানজারি তার জীবনটা নষ্ট করে দিয়েছে। তাকে 'দেখে নিতে' পারবে কি-না জানতে চান মিলা। তখন পিটার তাকে আশ্বস্ত করেন, 'যা করার করব।' এরপর ২৫ মে সন্ধ্যায় মিরপুর ডিওএইচএসের সরকার মার্কেটের একটি হার্ডওয়্যারের দোকান থেকে এসিড কিনে কাচের কৌটায় ঢুকিয়ে ব্যাগে রাখেন পিটার।
হামলার টার্গেট নিয়ে ২৬ ও ২৭ মে উত্তরার ৩ নম্বর সেক্টরে সানজারির বাসার সামনে ইফতারির আগে থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত অবস্থান করেন তিনি। তবে সানজারিকে না পেয়ে ফেরত আসেন। ২ জুলাই আবার সানজারির বাসার সামনে যান। বাসার আড়াল থেকে দেখেন, ইফতারের আগে সানজারি মোটরসাইকেল নিয়ে বাসা থেকে বের হচ্ছেন।
সানজারি তার বাসা থেকে ৫০ গজের মতো সামনে আসার পর পিটার ডেকে বলেন, 'ভাইয়া, দাঁড়ান।' এরপর মোটরসাইকেলের গতিরোধ করে পিটার দাঁড়ানোর পর সানজারি তাকে বলেন, 'তোর সঙ্গে কোনো কথা নেই। তুই আমার সামনে থেকে চলে যা।' এরই মধ্যে হঠাৎ এসিডের কৌটা বের করে সানজারির দিকে ছুড়ে মারেন পিটার। এরপর দৌড়ে রেলস্টেশনের দিকে পালিয়ে যান।
এসিড নিক্ষেপের পর মিলাকে ফোন করে জানান তিনি। পরে মিলার পরামর্শে চট্টগ্রাম পালিয়ে যান পিটার। কিছুদিন পর আবার ঢাকায় এসে মিলার সঙ্গে যোগাযোগ করলে পূর্বপরিচিত রহিমের সঙ্গে পিটারের যোগাযোগ করিয়ে দেওয়া হয়। এরপর রহিম তাকে মিলার বন্ধু টুকোন খানের ক্যান্টনমেন্ট থানাধীন একটি বাসায় থাকার ব্যবস্থা করেন।
পুলিশের দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, মিলা পিটারকে এও শিখিয়ে দেন, পুলিশের হাতে ধরা পড়লে যেন এসিড নিক্ষেপের ঘটনায় তার নাম না জড়ান তিনি। পিটার নিজের ইচ্ছায় সানজারির গায়ে এসিড ছুড়েছেন- এটা যেন স্বীকার করেন। পরে তাকে আইনি ব্যবস্থার মাধ্যমে ছাড়ানোর ব্যবস্থা করবেন মিলা।
পুলিশের উচ্চপদস্থ একাধিক কর্মকর্তা জানান, টার্গেট করে পাইলট সানজারির শরীরের নিম্নাংশে এসিড ছোড়া হয়েছে, যাতে তার গোপনাঙ্গ ঝলসে যায়। ওই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে সক্ষম হয় পিটার। এসিড নিক্ষেপে সানজারির গোপনাঙ্গসহ শরীরের ১০ শতাংশ দগ্ধ হয়।
সানজারি জানান, তার বাবা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপপরীক্ষা নিয়ন্ত্রক এস এম নাসির উদ্দিন। একসময় তিনি বিমানবাহিনীতে চাকরি করতেন। সর্বশেষ ইউএস-বাংলার পাইলট হিসেবে কর্মরত ছিলেন সানজারি। ২০১৭ সালের ১২ মে মিলাকে বিয়ে করেন তিনি। বিয়ের কিছুদিন পরই তাদের মধ্যে মনোমালিন্য দেখা দেয়। গত বছরের ৩১ জানুয়ারি মিলাকে তালাকের নোটিশ দেন তিনি। ওই বছরের ২২ মে তালাক কার্যকর হয়।
সানজারি আরও বলেন, ডিভোর্সের পরও মিলা তার পিছু ছাড়েননি। নানাভাবে ভয়ভীতি ও হুমকি দিতে থাকেন। প্রায় এক হাজার ৮০০ এসএমএস মোবাইলে পাঠিয়েছেন। কেন তাকে তালাক দিয়েছে- এটাই তার ক্ষোভ। এর থেকে প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে ওঠেন মিলা। ২০১৭ সালের অক্টোবরে সানজারির বিরুদ্ধে উত্তরা-পশ্চিম থানায় মামলা করেন মিলা। যৌতুক ও নির্যাতন চালানোর অভিযোগে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলাটি করা হয়। মামলার পর ২০১৭ সালের ৬ অক্টোবর গ্রেফতার হন তিনি।
সানজারির ভাষ্য, ওই মামলার চার্জশিট দাখিলের পর দীর্ঘদিন আদালতে হাজিরা দিচ্ছেন না মিলা। সানজারির আশা, তিনি যেন দ্রুত আদালতের মাধ্যমে ন্যায়বিচার পান। এ ছাড়া বিবাহবিচ্ছেদের বিরুদ্ধে পারিবারিক আদালতেও সানজারির বিরুদ্ধে আরও দুটি মামলা করেছেন মিলা।
সানজারি জানান, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও তাকে নিয়ে নানা কুৎসা রটাতে থাকেন মিলা। এর প্রতিকার চেয়ে তিনি ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মিলার বিরুদ্ধে মামলা করেছেন। মামলাটি পুলিশের সাইবার ক্রাইম ইউনিট তদন্ত করছে।
মামলার তদন্ত তদারক কর্মকর্তা ডিবির উত্তর বিভাগের ডিসি মশিউর রহমান বলেন, সানজারির ওপর এসিড নিক্ষেপের ঘটনায় মিলার দেহরক্ষীর সংশ্নিষ্টতার সব তথ্য-প্রমাণ পাওয়া গেছে। এর সঙ্গে মিলার যোগসূত্রের বিষয়গুলো বিশ্নেষণ করে দ্রুত চার্জশিট দেওয়া হবে। এ ঘটনায় মিলার যোগসূত্র পাওয়া যাচ্ছে।