শীত নিবারণে চাই গরম কাপড়। শীতের শুরুতেই সব বয়সি মানুষ শীতবস্ত্র ক্রয় করেন। শীতের তীব্রতা বাড়ার সাথে সাথে শীতবস্ত্রের কদরও বাড়তে থাকে। বর্তমানে তাপমাত্রা কমে যাওয়ায় সারাদেশে শীতবস্ত্রের কদর বেড়েছে। আর সেই শীতবস্ত্র বিক্রি করতে টাঙ্গাইল জেলা সদরের কোর্টচত্ত¡র মাঠে একটি ও পাশ্ববর্তী হেলিপ্যাড মাঠে দুটি পুরাতন কাপড়ের মার্কেট গড়ে উঠেছে। খোলা আকাশের নিচে প্রায় তিন শতাধিক শীতবস্ত্রের দোকান রয়েছে। এসব দোকানের সঙ্গে প্রায় পাঁচ শতাধিক পরিবার প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত। একটা সময় এসব খোলা বাজারে কেনাকাটা করতেন সমাজের নিম্ন আয়ের মানুষেরা।
বর্তমানে এসব দোকানগুলোতে সব শ্রেণির মানুষের উপচে পড়া ভিড় লক্ষ্য করা যায়। স্কুল-কলেজ পড়ুয়া শিক্ষার্থীরাও এসব দোকান থেকে নিয়মিত কেনাকাটা করছে। এই তিনটি মার্কেটে স্বাভাবিকভাবে প্রতিদিন ১০ থেকে ১৫ লাখ টাকার শীতবস্ত্র বিক্রি হয়। শীতের তীব্রতা বাড়লে অথবা শৈত প্রবাহ শুরু হলে শীতবস্ত্র বিক্রি দাঁড়ায় প্রতিদিন ৩০ থেকে ৩৫ লাখ টাকায়।
সরেজমিনে দেখা যায়, জেলা সদরের কোর্ট এলাকায় তিনটি মাঠে তিন শতাধিক পুরাতন কাপড়ের দোকান বসেছে। অনেক আগে থেকে পুরান কাপড়ের মার্কেট (ডিসট্রিক মার্কেট) নামে পরিচিত। ব্যবসায়ীরা জানান, চট্টগ্রাম থেকে এসব কাপড়ের বেল কিনে আনেন মহাজনরা। মহাজনদের কাছ থেকে মার্কেটের পাইকাররা কাপড় কিনে নেন। এসব কাপড় থেকে বাছাই করে প্রথম শ্রেণির কাপড়গুলো আলাদা করা হয়। এগুলো ৪০০ থেকে এক হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়ে থাকে। দ্বিতীয় বাছাইকৃত কাপড়গুলো ২য় সারির দোকানে তোলা হয়। এসব কাপড় সাধারণত ২০০ থেকে ৪০০ টাকায় বিক্রি হয়। তৃতীয় বাছাইকৃত কাপড়গুলো ১০ বা ২০ টাকা মূল্যে একদরে বিক্রি করা হয়। ১০ টাকার দোকান বা ২০ টাকার দোকান আলাদা করা রয়েছে। এসব দোকানের কাপড় বিক্রেতারা ১০-২০টাকা বলে ক্রেতাদের ডেকে ডেকে আকৃষ্ট করেন। তৃতীয় বাছাইয়ের পরও যেসব কাপড় অবিক্রিত থেকে যায় সেগুলো ১০ টাকা কেজি দরে বিক্রি করা হয়। যা দিয়ে গার্মেন্টেসের তুলা বানানো হয়। কেউ নিজেই দোকানে কাপড় বিক্রি করেন। আবার মহাজনরা কর্মচারি রেখে একাধিক দোকান চালিয়ে থাকেন। ৩০০ দোকান থাকলেও মহাজন থেকে শুরু করে কর্মচারি পর্যন্ত প্রায় পাঁচ শতাধিক পরিবার এর সঙ্গে জড়িত।
খোলা আকাশের নিচেই এদের কর্মসংস্থান। তবে লাভের বড় অংশ চলে যায় মহাজনদের হাতে। এখানে দুস্থ মানুষেরা কর্মচারি হিসেবে কাজ করেন। কাপড় বিক্রি করে প্রতিদিন দেড়শ’ থেকে দুইশ’ টাকা উপার্জন করে থাকেন তারা। সরকারি জায়গা হওয়াতে এসব দোকানের জন্য কোন ভাড়া গুণতে হয় না এসব ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের। পুরান কাপড়ের ব্যবসায় পাঁচ শতাধিক পরিবারের কর্মসংস্থানের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের ক্রয় ক্ষমতার ভেতরে চলে এসেছে শীতবস্ত্র।
আব্দুল হাফিজ নামে এক শীতবস্ত্র বিক্রেতা জানান, প্রতিদিন তিন থেকে চার হাজার টাকার কাপড় বিক্রি করা যায়। এতে যা লাভ হয় তাতে তার সংসার খরচ চলে যায়। তবে শীত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিক্রিও বেড়ে যায়। অসুস্থ আসর উদ্দিন, বিধবা রুবি, দুস্থ সুলতানা। তাদের মুলধন নেই। এজন্য তারা অন্যের দোকানে কর্মচারি হিসেবে কাপড় বিক্রি করেন। প্রতিদিন দেড় থেকে দুইশ টাকা পান তারা। তবে বিক্রি বাড়াতে পারলে আরেকটু বেশি টাকা দেওয়া হয় তাদেরকে।
কাপড় বিক্রেতা রমজান আলী জানান, এসব শীতবস্ত্র চট্টগ্রাম থেকে মহাজনরা আনেন। মহাজনের কাছ থেকে কিনে দোকানে বিক্রি করেন তারা। তার দোকানে তিন শ্রেণির শীতবস্ত্রই রয়েছে। হাজার টাকা থেকে ১০ টাকা পর্যন্ত কাপড় বিক্রি হয়। শিশু থেকে বৃদ্ধ পর্যন্ত সবার কাপড়ই এসব দোকানে পাওয়া যায়। দোকানের ভাড়া দিতে হয় না। তবে এসব দোকানে রাতেও খোলা আকাশের নিচেই কাপড়গুলো রেখে যায় ব্যবসায়ীরা। দোকানের নিরাপত্তার জন্য রয়েছে পর্যাপ্ত নৈশ্যপ্রহরী। শুধু এদের বেতন দিতে হয়।
মিলন, আজগর, জাহাঙ্গীর, জুলহাস ও শমসেরের মতো তিন শতাধিক ব্যবসায়ী ও এর সঙ্গে সম্পৃক্ত আরও দুই শতাধিক মানুষের জীবন চলছে খোলা আকাশের নীচে উপার্জন করে। তবে এ ব্যবসা চলে বছরের তিনমাস। শীত শেষ হলেই বন্ধ হয়ে যায় ব্যবসা। তখন বেকার হয়ে পড়েন সবাই। কেউ কেউ অন্য পেশায় চলে গেলেও অনেকেই বেকার হয়েই থাকেন। তখন তাদের জীবনযাপন কষ্টকর হয়ে পড়ে।
শীতবস্ত্র কিনতে আসা সাধারণ ক্রেতারা বলেন, এখানকার পণ্য ক্রয় ক্ষমতার ভেতরে থাকে। এজন্য তারা এসব দোকান থেকে নিয়মিত কেনাকাটা করেন। আবার কেউ কেউ বলেন, হাজারটা দেখে বাছাই করার সুযোগ আছে বলেই তারা এসব দোকানে কেনাকাটা করতে আসেন। স্কুল-কলেজ পড়ুয়া শিক্ষার্থীরা জানান, এসব কাপড় অধিকাংশই বিদেশি। ফ্যাশনও বটে। আধুনিক ও ব্যতিক্রমী কাপড় কিনতে শিক্ষার্থীরা এসব দোকানে চলে আসেন।









