- ২৭৫ কোটি টাকার ভ্যাট ফাঁকি
- নাহিদ এন্টারপ্রাইজের বিরুদ্ধে মামলা
মেসার্স নাহিদ এন্টারপ্রাইজ বন্ড সুবিধায় আনা পণ্য খোলা বাজারে বিক্রি করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এমন অভিযোগ আমলে নিয়ে প্রতিষ্ঠানটিতে অভিযান চালায় ভ্যাট গোয়েন্দা অধিদপ্তর। অভিযানে বন্ড পণ্য খোলা বাজারে বিক্রি করার মাধ্যমে ২৭৫ কোটি ৩২ লাখ টাকা ভ্যাট ফাঁকির প্রমাণ পাওয়ায় প্রতিষ্ঠানটি বিরুদ্ধে মামলা করেছে সরকারি এই সংস্থাটি।
মামলা দায়েরের এ তথ্য সোমবার নিশ্চিত করেছেন ভ্যাট নিরীক্ষা, গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. মইনুল খান এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। নাহিদ এন্টারপ্রাইজ রাজধানীর লালবাগের বকশি বাজারের ৩৬-৩৭ উমেশ দত্ত রোডে অবস্থিত। স্বত্ত্বাধিকারী আলহাজ্ব আনোয়ার হোসেন।
মইনুল খান বলেন, নাহিদ এন্টারপ্রাইজের ব্যবসায়িক কার্যক্রম তদন্ত করে ভ্যাট ফাঁকির এ প্রমাণ মেলে। ওই তদন্তে, প্রতিষ্ঠানটির জুলাই ২০১৫ সাল থেকে ২০২০ সালের জুন পর্যন্ত ভ্যাট সংক্রান্ত দলিলপত্র চেয়ে কয়েকবার চিঠি পাঠানো হয়েছিল। তবে প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ ওই অনুসন্ধানের জন্য দলিলাদি না পাঠিয়ে বার বার সময় চেয়ে কালক্ষেপণ করে। এ কারণে চলতি বছরের গত ১৭ জুন ভ্যাট গোয়ন্দার উপ-পরিচালক তানভীর আহমেদের নেতৃত্বে নিবারক কার্যক্রম চালিয়ে ভ্যাট সংক্রান্ত বাণিজ্যিক দলিলপত্র জব্দ করা হয়।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, নাহিদ এন্টারপ্রাইজ অন্যান্য বন্ডেড প্রতিষ্ঠান থেকেও বন্ড সুবিধার অপব্যবহারের পণ্য ক্রয়-বিক্রয়ের সঙ্গে জড়িত ছিল। ফলে চোরাচালান ও শুল্ক ফাঁকি সংশ্লিষ্ট মানি লন্ডারিং অপরাধ সংঘটনের প্রমাণ পাওয়া যায়।
আরও দেখা গেছে, প্রতিষ্ঠানটি মূসক-৬.৩ চালান ছাড়াই সেবা প্রদান করে যথাযথ রাজস্ব পরিশোধ না করে এবং প্রকৃত বিক্রয় তথ্য গোপন করে দলিলে সংরক্ষণের মাধ্যমে রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে সরকারের আর্থিক ক্ষতি করেছে। তদন্ত মেয়াদে ২০১৬ সাল জুলাই থেকে ২০২১ সালের মে পর্যন্ত (পাঁচ বছর) প্রতিষ্ঠানটি দাখিলপত্রে বিক্রয়মূল্য প্রদর্শন করে ২৯১ কোটি ৮৯ লাখ ৬৬ টাকা।
জব্দ করা দলিলাদির ভিত্তিতে দেখা যায়, প্রতিষ্ঠানটির প্রকৃত বিক্রয়মূল্য এক হাজার ৫৪০ কোটি ২৬ লাখ ৬৩ হাজার ২২ টাকা। যার মধ্যে মূসক আরোপযোগ্য বিক্রয়মূল্য ছিল এক হাজার ৩৩৯ কোটি ৩৬ লাখ ২০ হাজার ১৯ টাকা। এক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানটি এক হাজার ৪৭ কোটি ৪৭ লাখ ১৯ হাজার ৯৫৪ টাকার প্রকৃত বিক্রয়মূল্য গোপন করেছে। বিক্রয়মূল্য কম প্রদর্শন করায় অপরিশোধিত ভ্যাট বাবদ ১৫৭ কোটি ১২ লাখ ৭ হাজার ৯৯৩ টাকা উদঘাটন করা হয়। যার ওপর মাস ভিত্তিক ২ শতাংশ হারে ১১৮ কোটি ১৯ লাখ ৯৪ হাজার ২৪২ টাকা সুদসহ মোট ভ্যাট ফাঁকির পরিমাণ ২৭৫ কোটি ৩২ লাখ ২ হাজার ২৩৫ টাকা।
উল্লেখ্য, নাহিদ এন্টারপ্রাইজের ওই পাঁচ বছরে দাখিল করা পত্রের মাধ্যমে ভ্যাট পরিশোধ করেছে ৪৩ কোটি ৭৮ লাখ ৩৫ হাজার ১০ টাকা। তবে ভ্যাট গোয়েন্দার তদন্তে একই সময়ে ভ্যাট ফাঁকির পরিমাণ পাওয়া যায় ১৫৭ কোটি ১২ কোটি টাকা। ওই বিপুল পরিমাণ রাজস্ব ফাঁকি হওয়ায় স্পষ্ট হয়, প্রতিষ্ঠানটি নানা ধরণের অবৈধ লেনদেনের সঙ্গে জড়িত হয়েছে। তদন্তে প্রতিষ্ঠানের দুটো ব্যাংক এ্যাকাউন্টে মোট এক হাজার ৫৪০ কোটি ২৬ লাখ ৬৩ হাজার ২২ টাকার লেনদেনের তথ্য পাওয়া যায়।
অবৈধ বন্ডেড পণ্য ক্রয়-বিক্রয়ের অর্থ ওইসব লেনদেনে সংঘটিত হয়েছে মর্মে তদন্তে উঠে এসেছে। প্রতিষ্ঠানের নামে প্রাইম ব্যাংকের মৌলভিবাজার শাখা ও উত্তরা ব্যাংকের চকবাজার শাখায় দুটো ব্যাংক এ্যাকাউন্ট রয়েছে। বন্ড সুবিধার অপব্যবহারের পণ্য যথাযথভাবে ঘোষণা না দিয়ে খোলাবাজারে ক্রয়-বিক্রয় করা ভ্যাট ও কাস্টমস আইন অনুসারে অপরাধ। ভ্যাট আইনের পাশাপাশি কাস্টমস আইনের অপরাধ যথাযথভাবে তদন্ত ও প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নিতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর এখতিয়ার সম্পন্ন হওয়ায় শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরকে এবিষয়ে অনুরোধ করা হয়েছে ।
অন্যদিক, ভ্যাট গোয়েন্দার অনুসন্ধানে প্রাপ্ত ভ্যাট ফাঁকির সংশ্লেষে আয়কর ফাঁকির অভিযোগটি আরো গভীরভাবে তদন্ত ও ব্যবস্থা নেয়ার জন্য জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স সেলকে (সিআইসি) অনুরোধ করা হয়েছে। তদন্তে উদঘাটিত পরিহারকৃত ভ্যাট আদায়ের আইনানুগ পরবর্তী কার্যক্রম গ্রহণের লক্ষ্যে মামলাটি সংশ্লিষ্ট ভ্যাট কমিশনারেটে প্রেরণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম আরো মনিটরিং করার জন্যও সংশ্লিষ্ট ভ্যাট কমিশনারকে অনুরোধ করা হয়েছে। অন্যদিক বন্ড সুবিধার অপব্যবহার রোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেয়ার জন্য ঢাকা বন্ড কমিশনারকেও অনুরোধ করা হয়েছে।
আনন্দবাজার/শহক









