- নজরুল জন্মজয়ন্তী
- নজরুল দেশ মাতৃকাকে যেমন
ভালোবেসেছেন তেমনি ভালোবেসেছেন আপমর জনসাধারণকে। নজরুল ছিলেন ধর্ম-বর্ণ গোত্র তথা সাম্প্রদায়িকতার ঊর্ধ্বে উঠা এক মানব প্রেমিক মানুষ। সনাতন (হিন্দু) ধর্মাবলম্বী প্রমিলা দেবীকে তিনি বিয়ে করেছিলেন কিন্তু ধর্মান্তরিত করেন নি। মুসলিম সমাজ থেকে যখন প্রমিলা দেবীকে ধর্মান্তরিত করার দাবি উঠেছিল তখন নজরুল সে মতকে সমর্থন করেন নি। এমন কি পরবর্তীতে তার সন্তানদের নাম রেখেছিলেন দুই ধর্মের মিলিত ঐতিহ্যকে ধারন করে। তার প্রথম সন্তানের নাম রেখেছিলেন- কৃষ্ণ মুহাম্মদ। পর্যায়ক্রমে নাম রেখেছিলেন অরিন্দম খালেদ, কাজী সব্যসাচী, কাজী অনিরুদ্ধ।
এস ডি সুব্রত
বর্তমান সভ্য পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি অভাব যে চেতনার সেটা হলো মানবতা। বর্তমান বিশ্বের অন্যতম সমস্যা দেশে দেশে বিরাজমান ধর্মীয় কূপমণ্ডকতা, সংকীর্ণতা। নিজ ধর্ম রক্ষার নামে অন্য ধর্মের প্রতি বিদ্বেষ ছড়ানো এক বড় প্রবণতা হয়ে দেখা দিয়েছে দেশে দেশে। এ থেকে উত্তরণের যে উপায় সেটা হচ্ছে অসাম্প্রদায়িক চেতনা। বাংলা সাহিত্যে যিনি সর্ব প্রথম সর্বমানবিক ও অসাম্প্রদায়িক মানসের প্রয়াস ও প্রকাশ ঘটিয়েছেন তিনি হলেন আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম।
ভারতের পশ্চিমবঙ্গের আসানসোলের চুরুলিয়া গ্রামে বেড়ে উঠা দুখু মিয়া অসাম্প্রদায়িক চেতনায় বিশ্বাসী আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম। যার শিক্ষাজীবন শুরু হয়েছিল মাদ্রাসায় এবং জীবিকার তাগিদে মুয়াজ্জিনের কাজ করেছিলেন অল্প বয়সে। সেই নজরুল আমাদের কাছে অসাম্প্রদায়িক চেতনার প্রতীক হয়ে দেখা দিয়েছিল কাজে কর্মে ও সাহিত্য সাধনায়।
রুদ্ধ পরিবেশে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক যুগে প্রগতিশীল চিন্তাধারার কবি নজরুল মানস গড়ে উঠেছিল নানামুখী সৃজনশীলতায় বহুমুখী কর্মযজ্ঞের মাধ্যমে। যেখানে ছিল মানবপ্রেম, দেশপ্রেম আর অসাম্প্রদায়িক চেতনা। তার দ্রোহের অগ্নিশিখায় জ্বলে উঠেছিল বঞ্চিত মানুষ বজ্রশপথে। নিজেকে সর্বদা রেখেছেন জাতি ধর্ম বর্ণ ও সম্প্রদায়ের উর্ধ্বে।
কাজী নজরুল ইসলামের আগে ও পরে কোনো সাহিত্যিক সুষ্পষ্টভাবে অসাম্প্রদায়িক চেতনার কথা উচ্চারণ করেন নি। তার কণ্ঠে ধ্বনিত হয়-
‘এক রক্ত বুকের তলে
এক সে নাড়ীর টান
এক সে দেশের খাই গো হাওয়া
এক সে দেশের জল
এক সে মায়ের বক্ষে ফলাই
একই ফুল ও ফল।’ (সুর সাকী)
প্রবলভাবে মানবতাবাদ আর অসাম্প্রদায়িক চেতনায় বিশ্বাসী নজরুলকে প্রতিভাষণে উচ্চারণ করতে শুনি-
‘সুন্দরের ধ্যান, তার স্তব গানই আমার উপাসনা, আমার ধর্ম। যে ধর্মে যে দেশেই জন্মগ্রহণ করি সে আমার দৈব। আর আমি তাকে ছাড়িয়ে উঠতে পেরেছি বলেই আমি কবি।’
কবির বেড়ে উঠার সময়টাতে বেশ উত্থান পতন চলছিল। ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলন, ভারতে কমিউনিস্ট পার্টির আত্মপ্রকাশ, সোভিয়েত ইউনিয়নের সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব কবিকে কখনো করেছে বিদ্রোহী, কখন সঙ্গীত প্রেমিক কখনো মানবপ্রেমিক। কবি বড় হওয়ার সময়টাতে দেখেছেন সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প কীভাবে ছড়িয়ে পড়েছিল, রূপ নিয়েছিল সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায়। কবি কণ্ঠে ধ্বনিত হয়-
‘মিথ্যা শূনিনি ভাই
এই হৃদয়ের চেয়ে বড় কোন
মন্দির কাবা নাই।’ ( মানুষ)
নজরুল বিদ্রোহ করেছেন ধর্ম ব্যবসায়ী দের বিরুদ্ধে, ধর্মের বিরুদ্ধে কখনো নয়। তিনি বার বার মানব ধর্মের উপর জোর দিয়েছেন। হিন্দু মুসলমান কবিতায় তাকে বলতে শুনি-
‘মোরা একই বৃন্তে দুটি কুসূম হিন্দু মুসলমান
মুসলিম তার নয়নমণি হিন্দু তাহার প্রাণ’।
নজরুলের সত্তা জুড়েছিল অসাম্প্রদায়িক চেতনা। তার সংগ্রাম ছিল সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে, ধর্মীয় মৌলবাদের বিরুদ্ধে। তিনি বিশ্বাস করতেন সকল ধর্মমতকে বিশ্বাস করা ধর্মহীনতা নয়। তার কণ্ঠে তাই আমরা শুনতে পাই--
‘মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই
নহে কিছু মহীয়ান।’
দুই ভিন্ন সংস্কৃতির মধ্যে নজরুলের বেড়ে উঠা। ছোটবেলায় মোয়াজ্জিনের কাজ করে, মক্তবে পড়াশুনা করে যেমন ইসলাম ধর্ম সম্পর্কে জেনেছেন, তেমনি লেটো গানের দলে যোগ দিয়ে জেনেছেন রামায়ন, মহাভারত, ভাগবত, পূরাণ সম্পর্কে। প্রমিলা দেবীকে বিয়ে করার পর তিনি হিন্দু (সনাতন) ধর্মের খুঁটিনাটি জেনেছেন। এজন্যই তিনি একহাতে লিখেছেন গজল আর ইসলামী সংগীত, অন্য হাতে লিখেছেন ভজন আর শ্যামা সংগীত।
ইসলামী গান বা গজল-
‘তোরা দেখে যা মা আমিনার কোলে
মধু পূর্ণিমার চাঁদ সেথা দুলে
যেন উষার কোলে রাঙা রবি দোলে।’
ঈদের সময় যে গানটি না শুনলে এক অপূর্ণতা যেন থেকে যায়-
‘ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এল খুশির ঈদ….’
‘ফিরে এল আজ মুহররম মাহিনা
ত্যাগ চাই, মার্সিয়া ক্রন্দন চাই না।’
ভজন বা শ্যামা সঙ্গীত লিখেছেন অত্যন্ত সুনিপুণ হাতে-
‘কালো মায়ের পায়ের তলায় দেখে যা আলোর নাচন
রূপ দেখে দেয় বুক পেতে শিব যার হাতে মরণ বাচন’।
নজরুল দেশ মাতৃকাকে যেমন ভালোবেসেছেন তেমনি ভালোবেসেছেন আপমর জনসাধারণকে। নজরুল ছিলেন ধর্ম-বর্ণ গোত্র তথা সাম্প্রদায়িকতার ঊর্ধ্বে উঠা এক মানব প্রেমিক মানুষ। সনাতন (হিন্দু) ধর্মাবলম্বী প্রমিলা দেবীকে তিনি বিয়ে করেছিলেন কিন্তু ধর্মান্তরিত করেন নি। মুসলিম সমাজ থেকে যখন প্রমিলা দেবীকে ধর্মান্তরিত করার দাবি উঠেছিল তখন নজরুল সে মতকে সমর্থন করেন নি। এমন কি পরবর্তীতে তার সন্তানদের নাম রেখেছিলেন দুই ধর্মের মিলিত ঐতিহ্যকে ধারন করে। তার প্রথম সন্তানের নাম রেখেছিলেন- কৃষ্ণ মুহাম্মদ। পর্যায়ক্রমে নাম রেখেছিলেন অরিন্দম খালেদ, কাজী সব্যসাচী, কাজী অনিরুদ্ধ।
সাম্প্রদায়িকতার ঊর্ধ্বে উঠে নজরুল মানবতাকে স্থান দিয়েছেন সবার ওপরে। তার আগে কেউ তার মতো দ্ব্যর্থহীন ভাষায় মানবতার জয়গান করতে পারেনি। তার অসাম্প্রদায়িক চেতনা এবং মাধবপ্রীতি তাকে হিন্দু নয়, মুসলমান নয়, পরিণত করেছিল খাঁটি বাঙালিতে। নজরুল বিশ্বাস করতেন আনুষ্ঠানিক ধর্মে প্রবল বিশ্বাসী হয়ে সকল মানুষ কে সমান চোখে দেখা যায় না, সাম্প্রদায়িকতার উর্ধ্বে উঠা যায় না। এ কারণেই তিনি জাতিভেদের মানবতাবিরোধী ভয়ংকর ভণ্ডামির স্বরূপ আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিতে পেরেছিলেন---
‘বলতে পারিস বিশ্বপিতা ভগবান কোন সে জাত
কোন ছেলের তার লাগলে ছোঁয়া অশুচি হন জগন্নাথ?’ (চলবে)
লেখক: কবি ও প্রাবন্ধিক, সুনামগঞ্জ








