- কৃষকের দুঃখ ঘোচালো হারভেস্টার মেশিন
শ্রমিক সংকট ও খরচ কমে আসায় চলতি মৌসুমে কৃষক এসব মেশিনে ধান কাটতে ঝুঁকছে। এতে সময় ও অর্থ দুটোই সাশ্রয় হচ্ছে
এবারের বোরো মৌসুমে ধানকাটার শুরুটা ছিলো কৃষকের হতাশার মধ্য দিয়ে। সারাদেশে প্রায় একযোগে ধানকাটা শুরু হওয়ায় সারাদেশই শ্রমিক সংকট দেখা দেয়। এতে মৌসুমের শুরুতে ধানকাটা শ্রমিকের মুজুরি দাঁড়ায় হাজার টাকায়। শ্রমবাজারের লাগামহীন উর্ধ্বগতিতে হতাশায় পড়ে যায় কৃষক। জমির সোনালি ধান ঝুঁকিতে থাকলেও শ্রমিক সংকটে ধানকাটা শুরু করতে পারেনি কৃষকেরা। টাঙ্গাইলে কৃষকদের মাঝে এর ব্যতিক্রম ঘটেনি। বিশেষ করে জেলার নদীতীরবর্তী এলাকার নিম্নাঞ্চলের বোরোকাটা নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়ে যায় স্থানীয় বোরো চাষিরা।
এরই মধ্যে ঘুর্ণিঝড় আশনির প্রভাবে নিম্নচাপে সারাদেশে শুরু হয় অঝোরে বৃষ্টি। একদিকে শ্রমসংকট অন্যদিকে বোরো জমিতে পানি আটকে থাকায় নতুন করে বিপাকে পড়ে চাষি। টানা কয়েকদিনের হালকা বৃষ্টিতে উত্তরবঙ্গ থেকে আসা অধিকাংশ শ্রমিক বাড়ি ফিরে যায়। এ সময় হাজার টাকায়ও ধানকাটার শ্রমিক মেলেনি শ্রমবাজারে। টাঙ্গাইলের সবচেয়ে বড় শ্রমবাজার করটিয়া। যেখানে প্রত্যেক মৌসুমে সারাদেশ থেকে আসা শ্রমিক জড়ো হয়ে জেলার বিভিন্ন কৃষকের কাজে যায়। সেই শ্রমিকের হাটও শ্রমিক শূণ্য হয়ে পড়ে।
জমিতে পাকা বোরোকাটা নিয়ে চাষি যখন দিশেহারা তখন শ্রমিকের অভাব পূরণ করে অত্যাধুনিক ধানকাটা মেশিন কম্ভাইন্ড হারভেস্টার। কম্ভাইন্ড হারভেস্টার মেশিনের মাধ্যমে গত ৪ থেকে ৫ দিনে জেলার অর্ধেকের বেশি বোরো ধান ঘরে তুলেছে কৃষক। এতে অল্পসময়ে অধিক ধানকাটা সম্ভব হয়েছে। খরচও কমে এসেছে চল্লিশ শতাংশের বেশি।
বোরো আবাদি কৃষকরা জানান, বোরোকাটার শুরুতে শ্রমিক সংকটে পরে জেলার কৃষকরা। এ সময় কম্বাইন্ড হারভেস্টার মেশিনের মাধ্যমে ধানকাটা শুরু হওয়ায় লোকাসানের হাত থেকে রেহাই পান বোরো আবাদিরা। এতে অল্প সময়ে ঘরে ধান তোলা সম্ভব হয়েছে। ধানকাটা খরচও কমে এসেছে।
তারা আরও জানান, একজন শ্রমিক প্রতিদিন সর্বোচ্চ ৫ শতাংশ জমির ধান কেটে মাড়াই করতে পারেন। এ হারে একজন শ্রমিকের মুজুরি ১ হাজার টাকা। একজন শ্রমিকের প্রতিদিনের খাবারের খরচ নূন্যতম ২০০ টাকা। এতে একজন শ্রমিকের জন্য প্রতিদিন গুণতে হয় প্রায় ১২০০ টাকা। এ হিসেবে ১০০ শতাংশ জমির ধান কাটতে শ্রমিক লাগে প্রায় ২০ জন। ২০ জন শ্রমিকে মুজুরি ২০০০০ টাকা। খাবার খরচ ৪০০০ টাকা। মোট খরচ দাঁড়ায় ২৪০০০ টাকা। অন্যদিকে ধানকাটা মেশিনে প্রতি শতাংশে ৭০ টাকা হারে ১০০ শতাংশ জমির ধান কাটতে খরচ হয় ১৭০০০ টাকা। এতে প্রতি ১০০০ শতাংশ জমিতে খরচ কমে ৭০০০ টাকা। শ্রমিক সংকট ও খরচ কমে আসায় চলতি মৌসুমে কৃষক এসব মেশিনে ধান কাটতে ঝুঁকছে। এতে সময় ও অর্থ দুটোই সাশ্রয় হচ্ছে বলে জানান, স্থানীয় কৃষকেরা।
কম্বাইন্ড হারভেস্টার মেশিন দিন রাত ধান কাটার সুবিধা দেওয়ায় অল্প সময়ে অতিবৃষ্টির ক্ষয়ক্ষতির হাত থেকে কৃষক সহজেই রক্ষা পেয়েছে। এছাড়া মেশিনটি অত্যাধুনিক পদ্ধতিতে যৌথভাবে ধান কাটা ও মাড়াই করতে পারে। শুধু রোদে শুকিয়ে ধান ঘরে তুলতে হয়। এ সুযোগে অবশেষে হারভেস্টার মেশিনের সাহায্যে এ অঞ্চলের কৃষকরা রাত-দিনে ধান কেটে ঘরে তুলছেন। এতে শ্রমিক সংকট মেটানোর পাশাপাশি ধান কাটার খরচও কমে এসেছে। এদিকে যেসব জমিতে কয়েকদিনের বৃষ্টিতে পানি জমেছে সেখানে শ্রমিক নামতেও চায় না। অথচ অনায়েশে ওইসব জমির ধান কাটছে হারভেস্টার মেশিন। এবং শুকনো অবস্থায় জমির মাড়াইকৃত ধান সড়কে ঢেলে দিচ্ছে ওই মেশিনগুলো। এতে দ্বিতীয়বার ধানগুলো পানিতে ভিজছে না।
স্থানীয় কৃষক শওকত আলী জানান, আমি এতোদিন শ্রমিক দিয়ে ধান কাটাতাম। এবারও শুরুতে শ্রমিক দিয়ে ধান কাটাই। এরপর হারভেস্টার মেশিন আসায় পরবর্তী সব জমির ধান মেশিন দিয়ে কাটাচ্ছি। এতে খরচ অনেকটা কমে এসেছে।
কম্বাইন্ড হারভেস্টার মালিক অপু বলেন, এ মেশিনের দাম ৩২ লাখ ৫০ হাজার টাকা। তবে সরকার এসব মেশিনে ১৬ লাখ টাকা ভর্তুকি দি”েছ। ফলে একটি মেশিন কিনতে কৃষককে গুনতে হয় সাড়ে ষোলো লাখ টাকা। এ মেশিন দিয়ে খুব সহজেই এখন ধান ঘরে তুলতে পারছেন কৃষকরা। প্রতি ঘণ্টায় দুই থেকে তিন বিঘা জমির ধান কাটা সম্ভব। এতে ঘণ্টায় ৮ থেকে ১০ লিটার জালানি খরচ হ”েছ। মেশিনগুলোতে মুলত জালানি হিসেবে ডিজেল ব্যবহার করা হয় । তিনি আরও বলেন, মেশিনগুলো মুলত মৌসুম ভিত্তিক কাজে লাগে। বোরো ও রোপা আমন এই দুই সময়ের ধান কাটতে কম্বাইন্ড হারভেস্টার মেশিন ব্যবহার করা হয়। এছাড়া হাওর এলাকায় আগে ধান কাটা শুরু হলে হাওর এলাকার মেশিং এই অঞ্চলেল ভাড়ায় আসে। আমাদের এলাকায় কাজ কম থাকলে এই এলাকার মেশিন হাওড় অঞ্চলে ধান কাটতে ভাড়ায় যায়।
প্রতিবছরই বোরো ধান কাটার সময় শ্রমিক সংকট তীব্র আকার ধারণ করে। এ কারণে সময় মতো ধান ঘরে তুলতে না পেরে বৃষ্টি ও অকাল বন্যাতে কৃষকের ধান নষ্ট হয়ে যায়। এখন কম্বাইন্ড হারভেস্টার মেশিন দিয়ে স্বল্প খরচে ধান ঘরে তোলা যাচ্ছে। ফলে ধানকাটা মৌসুমে শ্রমসংকট কাটিয়ে তুলতে কম্বাইন্ড হারভেস্টার মেশিন সর্বোচ্চে উপকারে আসবে বলে মনে করেন ¯’মাননীয় কৃষিবিদ শাকিল আহম্মেদ।
টাঙ্গাইল জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ পরিচালক কৃষিবিদ মো. আহসানুল বাসার বলেন, ধানাকাটা মৌসুমে অনেক সময় শ্রমিক সংকটে পড়ে কৃষক। শ্রমবাজারও থাকে উর্ধ্বগতিতে। ফলে কৃষকদের বিপাকে পড়তে হয়। তবে সরকার কম্বাইন্ড হারভেস্টার মেশিনে বড় অংকের ভর্তুকি দেওয়ায় মেশিনগুলো অনেক বেড়েছে। ফলে কৃষকদের এখন আর আগের মতো শুধু শ্রমিকের ওপর নির্ভর করতে হয় না। চলতি মৌসুমেও শ্রমিক সংকট দেখে অধিকাংশ কৃষক তাদের জমির ধান কম্বাইন্ড হারভেস্টার মেশিন দিয়ে কাটিয়েছে।









