- ক্ষতিগ্রস্ত ৩০ হাজার মানুষ
- এমপি বললেন পাউবোর গাফিলতি
- কারণ উদঘাটনে তদন্ত শুরু
গত ১৯ অক্টোবর রাতে ভারত থেকে আসা পাহাড়ি ঢলে বৃদ্ধি পায় তিস্তা নদীর পানি। এসময় ব্যারেজের ৪০টি গেট খুলে দেওয়া জরুরি হয়ে পড়লেও তা ভুলে যান সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীগণ। এতে অস্বাভাবিক স্রোতে তিস্তা ব্যারেজের রক্ষাকবচ হিসেবে পরিচিত ফ্লাড বাইপাস সড়ক লন্ডভন্ড হয়ে যায়। ক্ষতিগ্রস্ত হয় হাজার হাজার ঘরবাড়ি, ব্রিজ-কালভার্ট। নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে শতশত হেক্টর ফসলি জমি। আর পলি পড়ে নষ্ট হয়েছে হাজার হাজার একর জমির ফসল। খোদ পানি উন্নয়ন বোর্ডের হিসাব বলছে, এতে ক্ষতি হয়েছে প্রায় ২০০ কোটি টাকার সম্পদ।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের গাফিলতিতে এমন ক্ষতি হয়েছে অভিযোগে তুলে পানি উন্নয়ন বোর্ডের সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীদের দায়ী করে মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়েছেন স্থানীয় সংসদ সদস্য মো. মোতাহার হোসেন। চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে মন্ত্রণালয় বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (পরিকল্পনা) ড. মো. মিজানুর রহমানকে প্রধান করে তিন সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করে। কমিটি গতকাল শনিবার সরেজমিন তদন্ত শুরু করে। আগামী সাত দিনের মধ্যে কমিটির তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার কথা। দুই সফরসঙ্গীসহ তদন্ত কমিটি গত শুক্রবার নীলফামারী পৌঁছায়। শনিবার সরেজমিনে তদন্ত শুরু করে।
ওই দিনের ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী, স্থানীয় জনগণ, জনপ্রতিনিধি এবং পানি উন্নয়ন বোর্ডের সংশ্লিষ্ট কর্মীরা আজ কমিটির সামনে উপস্থিত হয়ে ঘটনার বর্ণনা দিয়েছেন। ব্যারাজে সংলগ্ন হাতীবান্ধা উপজেলার গুড্ডিমারী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান শ্যামল বলেন, বেশির ভাগ গেট বন্ধ থাকায় অতিরিক্ত পানির চাপে ফ্লাড বাইপাসটি ভেঙে যায়।
তিস্তা ব্যারাজের ধারণক্ষমতা সাড়ে চার লাখ কিউসেক পানিপ্রবাহ। আর ফ্লাড বাইপাসের রয়েছে দুই লাখ কিউসেক পানিপ্রবাহের সক্ষমতা। কিন্তু গত ২০ অক্টোবর তিস্তা নদীতে পানির প্রবাহ ছিল ছয় লাখ কিউসেক। এত বিপুল পরিমাণ পানি দ্রুত অপসারণের জন্য দরকার ছিল ৪৪টি গেট একসঙ্গে খুলে দেওয়া। কিন্তু বাস্তবে খোলা ছিল মাত্র চারটি। এতে প্রচন্ড পানির চাপে লন্ডভন্ড হয় ফ্লাড বাইপাস সড়ক।
সূত্রমতে, গত ১৯ অক্টোবর উজানে ভারী বর্ষণের কারণে ভারত গজলডোবা ব্যারাজের গেট খুলে দেয়। এর ফলে তিস্তা নদীতে পানি বাড়তে থাকলে রাত ১২টায় তিস্তা ব্যারাজে নদীর পানিপ্রবাহ বিপৎসীমা অতিক্রম করে। পানির চাপ সামলাতে না পেরে পরদিন সকাল ১০টার দিকে ব্যারাজের ফ্লাড বাইপাস সড়কটি ভেঙে যায়। তিস্তা ব্যারাজসংলগ্ন লালমনিরহাটের হাতীবান্ধা উপজেলার গুড্ডিমারী ইউনিয়ন পরিষদের ২ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য (মেম্বার) নজরুল ইসলাম বলেন, বন্যা না-থাকায় আগে থেকে ব্যারাজের সব গেট বন্ধ ছিল। ওই দিন সন্ধ্যার পর থেকে আকস্মিকভাবে নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে উজানে বন্যা দেখা দেয়। সে সময় স্থানীয় লোকজন ব্যারাজে উপস্থিত হয়ে কর্তৃপক্ষকে গেট খুলে দেওয়ার কথা বলেন। রাত আনুমানিক ২টার দিকে গেট খোলার ব্যবস্থা হয়। কিন্তু তার আগেই অতিরিক্ত পানিপ্রবাহে লন্ডভন্ড হয় ফ্লাড বাইপাস।
এ রাতের ক্ষয়ক্ষতির বিবরণ দিয়ে ডিমলা উপজেলার টেপাখড়িবাড়ি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ময়নুল হক বলেন, ব্যারাজের উজানে ও ভাটির দিকে প্রায় ৩০ হাজার মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে ৪০০ পরিবারের ভিটেমাটি। বালু পড়ে নষ্ট হয়ে গেছে দুই হাজার একর ভুট্টা, মরিচ, চীনাবাদাম ও আমন ধানের ফসল। এত বিপুল ক্ষয়ক্ষতির জন্য পানি উন্নয়ন বোর্ড কর্তৃপক্ষের গাফিলতিকে দায়ী করেন স্থানীয় সাংসদ মো. মোতাহার হোসেন। তবে ডালিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আসফাউদৌলা প্রিন্স সাংসদের অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ওইদিন ব্যারাজের সবগুলো গেট খোলা ছিল। অতিরিক্ত পানির চাপেই ফ্লাড বাইপাসটি ভেঙ্গে যায়।
অতিরিক্ত মহাপরিচালক ড. মিজানুর রহমান সরেজমিনে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে স্থানীয় জনগণ, জনপ্রতিনিধি, সাংবাদিক এবং পানি উন্নয়ন বোর্ডের সংশ্লিষ্ট কর্মীদের সঙ্গে এ বিষয়ে মতবিনিময় করেন। তিনি বলেন ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে খুব শিগগিরই একটি প্রতিবেদন দাখিল করা হবে।









